পেছনে ফিরে ভাবতে গেলে বিস্মিত হতে হয়, গত বছর জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেছিলেন– ‘অভ্যুত্থানের পর যা এই মুহূর্তে চলছে, তার নাম মবোক্রেসি’। তিনি ‘মবোক্রেসি’ বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন ‘অজানাতন্ত্র’ হিসেবে। বলেছিলেন– ‘বাংলাদেশ এখন স্বৈরতন্ত্রের খোলা থেকে অজানাতন্ত্রের আগুনে পড়েছে’ (পরিস্থিতি এখন খোলা থেকে আগুনে, আগুন থেকে খোলায়, সাক্ষাৎকার, ১১ আগস্ট ২০২৪)।
অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের সঙ্গে তাঁর পশ্চিম রাজাবাজারের বইভরা বাসাটায় ৮ আগস্ট (২০২৪) দুপুরে যখন কথাগুলো হচ্ছিল, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তখনও শপথ গ্রহণ করেনি। সেই তখনই তিনি মবোক্রেসির বিপদ সম্পর্কে সচেতন করার বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব ভোলেননি। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা এক বছর পার করেও মব সন্ত্রাসের বিপদ সম্পর্কে ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃতভাবে বেখবর। ওদিকে মব সন্ত্রাসের চারাগাছ গত ছয় ঋতুতে পত্রপল্লবে বিকশিত হয়ে যেভাবে মহীরুহে পরিণত হয়েছে, তাতে করে ‘মবোক্রেসি’ এখন ‘মবতন্ত্র’ হিসেবে অনূদিত হতে পারে অনায়াসেই।
কেবল স্থাপনা ভাঙচুর নয়; মব সন্ত্রাসে গত এক বছরে নাগরিকের প্রাণহানি যেভাবে ঘটেছে সেটি আগের চেয়ে অনেক বেশি। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৯৬ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। এ বছর জানুয়ারি থেকে গত ১০ আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ১১১ জন মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। আসকের হিসাব মতে, ২০২৪ সালে এসে উচ্ছৃঙ্খল জনতার পিটুনিতে নিহতের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেড়ে গিয়েছিল। বলা বাহুল্য, আহতের সংখ্যা আরও বেশি। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই ২৬৬ জন আহত হয়েছেন।
প্রাণ বা অঙ্গহানি নিশ্চিয়ই গুরুতর বিষয়; কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী মব সহিংসতাকে কেবল হতাহতের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা উচিত হবে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে বরং একটি সমীক্ষা হতে পারতো যে, গত এক বছরে দেশে কত ধরনের মব সন্ত্রাস ঘটেছে। মাজারে হামলা থেকে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে পিটুনি; ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল থেকে সাবেক এমপির বাসায় গিয়ে ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায়। বস্তুত চলমান মব সহিংসতাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে একটি প্রায় অভিন্ন নকশা স্পষ্ট হয়। প্রথমে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে চাঁদাবাজির ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়। তাতে কার্যসিদ্ধি না হলে, দ্বিতীয়ত, তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে তার অর্থ, সম্পত্তি বা পদ দখল করা হয়। তাতেও কাজ না হলে, তৃতীয়ত, গণপিটুনি দিয়ে হতাহত করা হয়।
প্রথম আলো চলতি আগস্ট মাসের প্রথম ১০ দিনের ১৩টি গণপিটুনির ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, ৮টিতেই চোর সন্দেহে মারধর করা হয়েছে। বাকি পাঁচটি ঘটনার কোনোটি চাঁদাবাজি, কোনোটি পূর্বশত্রুতার কারণে, কোনোটি বিরোধ থেকে ঘটানো হয়েছে (১২ আগস্ট ২০২৫)।
পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, দৃশ্যত গণঅভ্যুত্থানের সমর্থক একজন সাংবাদিক ২৮ আগস্ট তাঁর ভ্যারিফায়েড ফেসবুকে লিখেছেন–“সমন্বয়ক পরিচয়ে ঘিরে ধরে আলাপ শুরু করছে ছিনতাইকারীরা। …আমার পরিচিত একজনকে গত পরশু এভাবে হেনস্থা করেছে তারা। সঙ্গে ছিল বৃদ্ধ মা, স্ত্রী, দুই শিশু সন্তান ও মালপত্র। ব্যাগ খোলার জন্য চাপ দিচ্ছিল আর বলছিল ‘তুই স্বৈরাচারের দোসর। ব্যাগ খোল’!”
আমার মতে, পরিস্থিতির চেয়ে বেশি উদ্বেগজনক মব সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে সরকারের নির্লিপ্ততা। এমন নয় যে, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্তারা প্রতিক্রিয়ায় পিছিয়ে রয়েছেন। যেমন, খোদ প্রধান উপদেষ্টা গত বছর সেপ্টেম্বরে জাতির উদ্দেশে ভাষণে বলেছিলেন, কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। ওই মাসেই আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছিলেন, ‘মব জাস্টিস’ ঘটলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাও গত জুন মাসে বলেছিলেন, মব জাস্টিস কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। লক্ষণীয়, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান রাষ্ট্রীয় কর্তা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রথম এই সন্ত্রাসকে ‘মব ভায়োলেন্স’ আখ্যা দিয়ে একই মাসে বলেছিলেন, এর বিরুদ্ধে কঠোর থাকবে সেনাবাহিনী। আর ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেছিলেন, কোনো ধরনের মবকেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। কিন্তু সবই যে কেবল বাগাড়ম্বর, গত কয়েক মাসে সেটি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
সেই সুযোগে এখন অন-ক্যামেরা মব সন্ত্রাস ঘটছে। বৃহস্পতিবার ডিআরইউতে ‘মঞ্চ ৭১’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম ‘আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের সংবিধান’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে। একদল ব্যক্তি সেখানে ঢুকে আলোচকদের অবরুদ্ধ ও হেনস্তা করতে থাকে। সেই ভিডিও ততক্ষণে ‘ভাইরাল’ হয়ে গেলেও পুলিশের একটি দল আক্রান্তদেরই আটক করে এবং ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ আইনে মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।
অথচ, দেশের যে কোনো নাগরিকের সভা-সমাবেশ ও মতপ্রকাশ করার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। বরং মব সন্ত্রাস যেকোনো বিবেচনাতেই ফৌজদারি অপরাধ। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার প্রমাণসহ ফৌজদারি অপরাধীদের ছেড়ে দিয়ে আক্রান্তদেরই কারাগারে পাঠিয়ে দিয়েছে! মব সন্ত্রাসকে আস্কারা দেওয়ার এর চেয়ে বড় নজির আর কী হতে পারে?
ওদিকে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) ‘পালস সার্ভে ৩’ শিরোনামের সাম্প্রতিক জরিপে উঠে এসেছে, মব সহিংসতা নিয়ে উদ্বিগ্ন মানুষের হার ৮০ শতাংশ। একটি দেশের ৮০ ভাগ নাগরিকের মব সন্ত্রাসের ভয় সরকারকে স্পর্শ করছে না, ভাবা যায়!
সর্বশেষ, গণঅধিকার পরিষদ নেতা নুরুল হক নুরের দলকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পিটুনি মব সন্ত্রাসের এপিঠ-ওপিঠ দেখিয়ে দিয়েছে। আগের দিন তিনটি মব সহিংসতায় হাত গুটিয়ে থাকলেও এদিন দেখিয়ে দিয়েছে, মবতন্ত্রের ঘোলা জলে কার মাছ কে ধরবে, সেই নিশ্চয়তা নেই। সেখানে লাল টিশার্ট পরা একজনের নিষ্ঠুর পিটুনির ভিডিও এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
মবতন্ত্র যে নিছক জনরোষ বা ‘প্রেশার গ্রুপ’ নয়; বরং গণতন্ত্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের কলকবজাও হতে পারে, সেটাও মনে রাখতে হবে। যেমন, মবের কলরবে দেশ অস্থিতিশীল হলে এবং সেটির জের ধরে নির্বাচনী প্রক্রিয়া পিছিয়ে গেলে কাদের লাভ? এটি বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। ফলে, যারা মব সন্ত্রাসকে হালকা করে দেখতে বা দেখাতে চান, তারা হয় বেকুব, না হয় গণতন্ত্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশীজন। মবতন্ত্র কাউকে অবারিত ক্ষমতার সাময়িক অনুভূতি দিতেই পারে; কিন্তু দিনশেষে দেখা যেতে পারে, তারা গণতন্ত্র লয়ে আনমনে খেলারত বিরাট শিশুর পুতুল ছাড়া কিছু নন।
অন্তর্বর্তী সরকার বলছে, আগামী বছর ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে পথনকশাও ঘোষণা করেছে। টানা তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে না পারা জনসাধারণ একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছে। কিন্তু গণতন্ত্রে উত্তরণের এই সরল পথে মবতন্ত্রের কাঁটা বেড়েই চলছে। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও সেই ঘাতক কাঁটা ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেই। আমরা কি কাঁটা সরিয়ে গণতন্ত্রের গোলাপ নিতে পারব?
শেখ রোকন: লেখক ও নদী গবেষক