দেশে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং এবং মাদক কারবারের মতো সংঘবদ্ধ অপরাধগুলো প্রত্যাশিত মাত্রায় দমন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মানুষের দৈনন্দিন জীবন বিষিয়ে উঠছে। বাড়ছে শঙ্কা ও উদ্বেগ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বৃহস্পতিবার এসব অপরাধ দমনে বিদ্যমান আইনের দুর্বলতা দূর করে নতুন আইন প্রণয়ন কিংবা কঠোর সংশোধনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে, চাঁদাবাজির শিকার ব্যক্তি ভয়ে মামলা করতে না চাইলেও পুলিশের স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদী হওয়ার বিধান এবং অপরাধী ও গডফাদারদের শনাক্তে বডিক্যামেরা ব্যবহারের পরিকল্পনা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের দেশের বাস্তবতায় শুধু কঠোর আইন করে এর পূর্ণ ফল পাওয়া কঠিন যদি না রাজনৈতিক দলগুলো এসব ব্যাপারে কঠোর না হয়।
দেশে পুলিশের দীর্ঘদিনের জনবল সংকট, যানবাহনের ঘাটতি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা স্বীকার্য। এসব জায়গায় উন্নতির দরকার বা সীমাবদ্ধতাগুলো দ্রুত দূর করা প্রয়োজন। বিশেষ করে, মাদক মামলার তদন্তে অসংগতি বা নথিপত্রের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা যাতে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যেতে না পারে, সে জন্য তদন্ত কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা সার্থক করতে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতর ও বাইরে যে কোনো ধরনের অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের অবসান ঘটাতে হবে, এটা নিঃসন্দেহ।
কিন্তু একথাও সবার জানা যে, আমাদের দেশে চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধগুলো সমাজ থেকে না কমার পেছনে রাজনৈতিক ছত্রছায়া বা দলীয় নমনীয় নীতি একটি অন্যতম প্রধান বাধা। এটি হরহামেশা দেখা যায়, মাঠপর্যায়ে যতই কঠোর আইন থাকুক না কেন, অপরাধীরা যদি কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের ছায়া বা প্রভাবে থাকে, তবে প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীনভাবে ব্যবস্থা নিতে বা আইনি প্রক্রিয়া পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে বাধাগ্রস্ত হয়। মাঠের চাঁদাবাজরা গ্রেপ্তার হলেও তাদের মূল নিয়ন্ত্রক বা ‘গডফাদাররা’ পর্দার অন্তরালে নিরাপদ থেকে যায়। সুতরাং, শুধু আইনি সংস্কার বা পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ালেই এ ব্যাধির পুরোপুরি উপশম সম্ভব নয়। এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও কঠোর অবস্থান। সব রাজনৈতিক দলকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিতে হবে, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ছিনতাই কিংবা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কোনো অপরাধীর দলের ভেতর কোনো স্থান নেই। দলীয় পদধারী বা প্রভাবশালী ব্যক্তি যেই হোক না কেন, অপরাধে জড়ালে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যখন রাজনৈতিক দলগুলো অপরাধীদের আড়াল করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রশাসনকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে, শুধু তখনই আইন তার পূর্ণ শক্তি নিয়ে অপরাধীদের দমন করতে পারবে।