আগামীকাল বেনিনের বিপক্ষে বিদায়ী ম্যাচ; মনুমেন্টালে ৮৫ হাজার দর্শকের অপেক্ষা, ‘ধন্যবাদ, লিও’ ফ্যান ফেস্ট, সম্মানসূচক ডক্টরেট- বিদায়ের আগে শহরজুড়ে এক কিংবদন্তিকে ঘিরে আবেগ আর মাত্র এক দিন। ৬ অক্টোবর, মঙ্গলবার, বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্টালে আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামবেন লিওনেল মেসি। প্রতিপক্ষ বেনিন। ম্যাচটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ, কিন্তু আর্জেন্টিনার কাছে এর অর্থ কোনো সাধারণ প্রীতি ম্যাচের নয়। এটি তাদের অধিনায়ক, তাদের সবচেয়ে বড় ফুটবল-প্রতীক এবং দুই দশকের এক জাতীয় দলের যুগের আনুষ্ঠানিক বিদায়।
৩৯ বছর বয়সী মেসি গত আগস্টেই জানিয়ে দিয়েছেন, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সঙ্গে তার পথচলা শেষ করার সময় এসেছে। তবে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হারের পরও তার জন্য একটি শেষ ম্যাচের দরজা খোলা রেখেছিল আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (AFA)। সেই ম্যাচই কাল। মেসির জাতীয় দলের ২০৮তম এবং শেষ উপস্থিতি হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি। AFA সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া তাকে বিদায় জানাতে গিয়ে বলেছেন, মেসি ‘বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়’, জাতীয় দলের প্রতীক এবং অধিনায়ক- তার প্রাপ্য বিদায়টা তাকে দিতেই হবে।
বিদায়ের আগে আর্জেন্টিনায় এখন একটাই নাম- মেসি।বিস্তারিত জানাচ্ছেন শামস বিশ্বাস
২০৮ ম্যাচের শেষ অধ্যায়
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির আন্তর্জাতিক পথচলা শুরু ২০০৫ সালে। শুরুটা ছিল অল্প বয়সের এক প্রতিভাবান ছেলের; শেষটা হচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে।
কাল মাঠে নামার আগ পর্যন্ত মেসির জাতীয় দলের পরিসংখ্যান- ২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোল। তিনিই আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার। ছয়টি বিশ্বকাপেও খেলেছেন তিনি- ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬।
একসময় জাতীয় দলের জার্সিতে তার গল্পটা যেন অসম্পূর্ণই মনে হতো। প্রতিভা ছিল, ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল, ক্লাব ফুটবলে একের পর এক শিরোপা ছিল; কিন্তু আর্জেন্টিনার হয়ে বড় ট্রফি ছিল না। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়- সব মিলিয়ে মেসির জাতীয় দলের অধ্যায় ঘিরে হতাশার গল্পও কম ছিল না।
২০১৬ সালে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। পরে ফিরেছেন। আর সেই ফেরার পর বদলে গেছে গল্পের শেষাংশ।
২০২১ কোপা আমেরিকা দিয়ে শুরু। এরপর ২০২২ ফাইনালিসিমা, কাতার বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকা। চার বছরে চারটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা- মেসির আর্জেন্টিনা-অধ্যায় তখন পূর্ণতা পায়।
কাতারের বিশ্বকাপ জয়ের পর অনেকের কাছেই মনে হয়েছিল, এর চেয়ে পরিপূর্ণ সমাপ্তি আর কী হতে পারে? কিন্তু মেসি আরও একবার বিশ্বকাপে খেলেছেন। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে আবার ফাইনালে তুলেছেন। শেষ ম্যাচে স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হেরে রানার্সআপ হয় আর্জেন্টিনা। মেসি পুরো ১২০ মিনিট খেলেছেন।
সেই বিশ্বকাপে আট ম্যাচে তার গোল আটটি, অ্যাসিস্ট চারটি। শেষ পর্যন্ত ট্রফি হাতে ওঠেনি, কিন্তু ৩৯ বছর বয়সেও টুর্নামেন্টের অন্যতম প্রধান চরিত্র ছিলেন তিনি।
বিশ্বকাপ ফাইনালের পরই যেন বিদায়ের সিদ্ধান্তটি আরও দৃঢ় হয়ে যায়।
আর কিছু দেওয়ার নেই
৩১ আগস্ট জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিতে গিয়ে মেসি লিখেছিলেন, ‘সময় কমে আসছে, অধ্যায়গুলো বন্ধ হচ্ছে। এই অধ্যায়টি আমাকে খুব কষ্ট দেয়। আমি জাতীয় দলকে ভালোবাসি, ভালোবেসেছি এবং সব সময় ভালোবাসব।’
আরও লিখেছিলেন- ‘আমি নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়েছি, দেওয়ার মতো আর কিছু নেই।’
এই কথাগুলোতেই ছিল সিদ্ধান্তের গভীরতা। এটি কোনো হঠাৎ অভিমান নয়, কোনো এক ম্যাচের পর নেওয়া আবেগী সিদ্ধান্তও নয়। মেসি বুঝেছেন, জাতীয় দলের জন্য তার দীর্ঘ পথচলার শেষ প্রান্ত এসে গেছে।
আর সেই কারণেই কালকের ম্যাচটি কেবল তার শেষ ম্যাচ নয়; এটি তার নিজের সিদ্ধান্তকে আর্জেন্টিনার মানুষের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণ করার রাত।
শেষ ম্যাচের আগে ৭-০
মেসির বিদায়ের মঞ্চ প্রস্তুত করতে গিয়ে আর্জেন্টিনা ইতোমধ্যে তিন ম্যাচের আন্তর্জাতিক সূচির দুটি শেষ করেছে। ৩০ সেপ্টেম্বর বলিভিয়াকে ৪-০ গোলে হারানোর পর ৩ অক্টোবর মনুমেন্টালেই বুরকিনা ফাসোকে ৭-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে তারা।
সেই ম্যাচে মেসি খেলেননি। বরং তাকে তুলে রাখা হয়েছিল কালকের জন্য। বুরকিনা ফাসোর বিপক্ষে লাওতারো মার্তিনেজ, জুলিয়ান আলভারেজ, নিকো পাজ, জিয়ানলুকা প্রেতিয়ানি, ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুওনো ও জুলিয়ানো সিমিওনে গোল করেছেন। ম্যাচটি ছিল মেসিবিহীন আর্জেন্টিনার শক্তিরও একটি প্রদর্শন। অর্থাৎ জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আর্জেন্টিনার শিবিরে অন্ধকার নেই। কিন্তু কালকের রাতে ভবিষ্যতের কথা নয়। রাতটি বর্তমানের এক কিংবদন্তিকে ঘিরে।
৮৫ হাজারের শহর
মেসির শেষ ম্যাচের টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার পর চাহিদা এতটাই ছিল যে প্রায় ৯০ মিনিটের মধ্যে টিকিট শেষ হয়ে যায়। বুয়েনস এইরেসের ঐতিহাসিক মনুমেন্টালে প্রায় ৮৫ হাজার দর্শকের সামনে মেসির শেষ ম্যাচ হওয়ার কথা।
এমন ম্যাচে টিকিটের চাহিদা যে আকাশছোঁয়া হবে, তা অনুমান করা কঠিন ছিল না। কিন্তু বিক্রির গতি দেখিয়েছে, আর্জেন্টিনার মানুষ শুধু একটি ম্যাচ দেখতে চায়নি- তারা ইতিহাসের অংশ হতে চেয়েছে।
মেসি ২ অক্টোবর আর্জেন্টিনায় ফিরেছেন। রোজারিওতে পৌঁছানোর পর এখন তার গন্তব্য বুয়েনস এইরেস। জন্মশহর থেকে জাতীয় দলের শেষ অধ্যায়ের শহরে- যাত্রাটিও যেন তার ক্যারিয়ারের এক প্রতীকী রেখা।
কাল মনুমেন্টালে যখন তিনি মাঠে নামবেন, গ্যালারিতে শুধু আর্জেন্টিনার পতাকা থাকবে না; থাকবে ১০ নম্বরের অসংখ্য জার্সি, ব্যানার, ছবি আর বহু বছরের স্মৃতি।
মাঠের বাইরেও ধন্যবাদ লিও
মেসির বিদায়কে শুধু ৯০ মিনিটের ম্যাচে আটকে রাখেনি AFA। ৬ অক্টোবর বুয়েনস এইরেসের UBA সিটি ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে আয়োজন করা হয়েছে ‘Gracias, Leo’ Fan Fest।
দুপুর ১২টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলবে আয়োজন। থাকবে গান, বিনোদন, খাবার, বিভিন্ন ইন্টার্যাকটিভ আয়োজন, শিল্পী, অতিথি, ইনফ্লুয়েন্সার ও স্ট্রিমারদের উপস্থিতি। মনুমেন্টালের ম্যাচটি বড় পর্দায় দেখার ব্যবস্থাও থাকবে।
Kapanga ও La T y La M-সহ শিল্পীদের পরিবেশনা রয়েছে সূচিতে। সাবেক আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক সার্জিও গোয়কোচেয়াও থাকবেন অনুষ্ঠানে। দর্শকদের জন্য বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও ফাইনালিসিমার ট্রফির সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগও রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ মেসির বিদায় এখানে একটি ম্যাচের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে- এটি একটি জনসম্মিলিত উদ্?যাপন।
সম্মাননা ম্যাচের আগেই
মাঠে নামার আগেই মেসি পাবেন আরেকটি বিরল সম্মান।
বুয়েনস এইরেস বিশ্ববিদ্যালয় (UBA) তার সর্বোচ্চ সম্মান ‘Doctor Honoris Causa’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপিরিয়র কাউন্সিল সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্তটি নিয়েছে। ৬ অক্টোবর তার বিদায়ী ম্যাচের আগে এই সম্মাননা দেওয়ার কথা।
UBA মেসির শুধু ফুটবলীয় সাফল্য নয়, তার অধ্যবসায়, বিনয়, নৈতিক আচরণ এবং আর্জেন্টিনার প্রতিনিধিত্বের প্রতিশ্রুতিকেও স্বীকৃতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। কারণ মেসির বিদায় এখন শুধু ফুটবলের পরিসরে নেই। একজন খেলোয়াড় কীভাবে একটি দেশের ক্রীড়া-পরিচয়, জনপ্রিয় সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির অংশ হয়ে ওঠেন- মেসির ক্ষেত্রে তার একটি বড় উদাহরণ তৈরি হয়েছে।
এর আগে ২০২৬ সালের Princess of Asturias Award for Sports-ও পেয়েছেন মেসি। পুরস্কারটির বিচারকমণ্ডলী তার দীর্ঘ ক্যারিয়ার, দাতব্য কাজ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য তার ভূমিকা, ধারাবাহিকতা, বিনয় এবং দলীয় দায়বদ্ধতার কথা তুলে ধরেছে।
জার্সিটাও আলাদা
বিদায়ের রাতের জন্য আর্জেন্টিনার জার্সিতেও থাকছে বিশেষত্ব।
Adidas মেসির জাতীয় দলের ক্যারিয়ার উদযাপনে বিশেষ সংস্করণের জার্সি তৈরি করেছে। আর্জেন্টিনার পতাকা থেকে অনুপ্রাণিত নকশায় থাকছে সোনালি অলংকরণ, মেসির সিগনেচার লোগো এবং স্মারকধর্মী বিশেষ চিহ্ন। ৬ অক্টোবরের বিদায়ী ম্যাচে এই বিশেষ জার্সি পরবে আর্জেন্টিনা।
একজন খেলোয়াড়ের বিদায়ের সঙ্গে জার্সির এমন স্মারক সংস্করণও দেখিয়ে দেয়- মেসির জাতীয় দল-পর্ব এখন শুধু একটি ক্রীড়া অধ্যায় নয়, একটি সাংস্কৃতিক পণ্যে পরিণত হওয়া স্মৃতিও।
চলে গেলে কী হবে
এই প্রশ্নটি শুধু আবেগের নয়, অর্থনীতিরও।
AFA জানিয়েছে, তাদের সঙ্গে ১২০টির বেশি ব্র্যান্ড যুক্ত। জুলাইয়ে আয়োজিত Sponsor Day-তে সংস্থাটি সেই বাণিজ্যিক অংশীদারদের নিয়ে আয়োজন করেছিল বিশেষ অনুষ্ঠান। AFA-র পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই অংশীদারত্ব জাতীয় দলগুলোর উন্নয়ন ও শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মেসির বিদায়ের ফলে স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় পরিবর্তন আসবে। বহু বছর ধরে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের বিপণন, প্রচারণা এবং বিশ্বজুড়ে দর্শক-আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিলেন মেসি। তাকে সামনে রেখে তৈরি করা বিজ্ঞাপন, পণ্য, সামাজিক মাধ্যমের প্রচারণা কিংবা ম্যাচ-দিবসের বাণিজ্যিক আয়োজন- সবকিছুতেই ছিল বাড়তি আকর্ষণ।
তবে এখানেই একটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। মেসির ব্যক্তিগত বাজারমূল্য আর AFA-র জাতীয় দলের বাণিজ্যিক মূল্য এক জিনিস নয়। ইতোমধ্যে তারা বহু আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে। ফলে মেসির অবসরে ‘মেসি-প্রভাব’ কমতে পারে, কিন্তু আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্র্যান্ড হিসেবে মূল্য যে সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়বে- এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো তথ্য নেই।
বরং এখন সামনে নতুন প্রশ্ন: মেসির পর জাতীয় দলের ব্র্যান্ডের পরবর্তী মুখ কারা?
জুলিয়ান আলভারেজ, লাওতারো মার্তিনেজ, নিকো পাজ, এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার কিংবা নতুন প্রজন্মের অন্যরা সেই শূন্যতা কতটা পূরণ করতে পারবেন, তার উত্তর দেবে আগামী কয়েক বছর।
সতীর্থদের কঠিন রাত
মেসির বিদায় শুধু দর্শকের জন্য আবেগের নয়, তার সতীর্থদের জন্যও। লাওতারো মার্তিনেজ এরই মধ্যে বলেছেন, মেসির শেষ ম্যাচটি আবেগঘন হতে যাচ্ছে এবং সবাই খুব বেশি কাঁদবে না- এমন আশা করা কঠিন।
এই প্রজন্মের আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের বড় অংশ মেসিকে শুধু অধিনায়ক হিসেবে দেখেনি। কেউ তার সঙ্গে বিশ্বকাপ জিতেছে, কেউ কোপা আমেরিকা; কেউ জাতীয় দলের ড্রেসিংরুমে তার পাশে বসেছে, কেউ ছোটবেলা থেকে তাকে আদর্শ হিসেবে দেখে বড় হয়েছে।
লিওনেল স্কালোনির দলও তাই কাল একটি যুগের শেষ দেখবে।
স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফাইনালিসিমা, ২০২২ বিশ্বকাপ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা জিতেছে। মেসি ছিলেন সেই দলের কেন্দ্রবিন্দু। তার বিদায় মানে শুধু একজন খেলোয়াড়ের বিদায় নয়; স্কালোনি-যুগের সবচেয়ে বড় প্রতীকটিরও বিদায়।
১০ কি কখনও ফাঁকা থাকবে
মেসির সঙ্গে ‘১০’ সংখ্যাটির সম্পর্ক এতটাই গভীর যে তার বিদায়ের পর জার্সি নম্বরটি নিয়েও আলোচনা স্বাভাবিক।
আর্জেন্টিনার হয়ে ১০ নম্বর জার্সি মেসির আগে দিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এখন মেসি সেই নম্বরকে নিজের করে নিয়েছেন। ফলে জাতীয় দলের ভবিষ্যতে ১০ নম্বর কে পরবেন, সেটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়- এটি প্রতীকী প্রশ্নও।
আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়মের কারণে বিশ্বকাপ বা কোপা আমেরিকার মতো প্রতিযোগিতায় কোনো নম্বর স্থায়ীভাবে অবসর দেওয়ার বিষয়টি সহজ নয়। তাই মেসির ১০ নম্বরকে ঘিরে আবেগ থাকলেও ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতায় সেটি কীভাবে ব্যবহৃত হবে, তা নিয়ম ও দলের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
কাল অবশ্য এ প্রশ্নের কোনো উত্তর খোঁজার দরকার নেই। ১০ নম্বরটি থাকবে মেসিরই।
এক মিনিটের শ্রদ্ধা
মেসির অবসরের ঘোষণা আসার পর আর্জেন্টিনার ফুটবলে তাকে সম্মান জানাতে একটি প্রতীকী উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। দেশের ফুটবল, নারী ফুটবল ও অন্যান্য স্বীকৃত ফুটবল ডিসিপ্লিনের ম্যাচে প্রথমার্ধের দশম মিনিটে এক মিনিটের করতালির নির্দেশ দিয়েছিল AFA। স্টেডিয়ামে স্ক্রিন থাকলে মেসিকে নিয়ে বিশেষ ভিডিও দেখানোর কথাও বলা হয়েছিল।
‘১০’ আর মেসির সম্পর্ককে ব্যবহার করে তৈরি এই প্রতীকী শ্রদ্ধা আসলে দেখিয়েছে, তার বিদায়কে আর্জেন্টিনার ফুটবল কতটা বড় ঘটনা হিসেবে দেখছে।
একটি লাল টেলিফোন
মেসিকে ঘিরে আবেগের আরেকটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেছে বুয়েনস এইরেসের রাস্তায়।
একটি লাল টেলিফোন স্থাপন করা হয়েছে, পাশে লেখা- ‘What would you say to Messi?’ অর্থাৎ, ‘মেসিকে কী বলতেন?’
সাধারণ মানুষ সেই ফোন তুলে মেসির উদ্দেশে নিজেদের কথা বলছেন। কেউ তার জন্য জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তগুলোর কথা বলেছেন, কেউ ছোটবেলার স্মৃতি মনে করেছেন, কেউ আবার আবেগ ধরে রাখতে পারেননি।
এক বৃদ্ধের কথায় ছিল বিদায়ের সুর- মেসিকে তিনি যেন নিজের পরিবারের একজনের মতোই সম্বোধন করেছেন। একটি শিশুর কান্নাও সেই আয়োজনের অংশ হয়ে উঠেছে।
ফুটবলাররা মাঠে গোল করেন, ট্রফি জেতেন, রেকর্ড গড়েন। কিন্তু কোনো কোনো খেলোয়াড়ের প্রভাব মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। মেসির ক্ষেত্রে সেই প্রভাবের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ হয়তো এই ছোট্ট লাল টেলিফোন- মানুষ তাকে কী বলবে, সেটিই যখন আলাদা করে জানতে চাওয়া হয়।
কাল কী হবে
কাল রাত ৮টায় মনুমেন্টালে আর্জেন্টিনা নামবে বেনিনের বিপক্ষে। মেসি খেলবেন কত মিনিট, গোল করবেন কি না, ম্যাচের ফল কী হবে- এসবের কোনো নিশ্চয়তা নেই।
নিশ্চয়তা শুধু একটিই- এটি আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার শেষ ম্যাচ। হয়তো শুরুতেই গ্যালারি থেকে ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনি উঠবে। হয়তো ১০ নম্বর জার্সির দিকে তাকিয়ে থাকবে হাজার হাজার চোখ। হয়তো ম্যাচের কোনো এক মুহূর্তে বল তার পায়ে এসে থামবে, আর মনুমেন্টাল একসঙ্গে নিশ্বাস আটকে রাখবে- যেন আরও একবার পুরনো মেসিকে দেখা যায়।
কিন্তু কালকের রাতকে শুধু গোল দিয়ে মাপা যাবে না। কারণ মেসির আর্জেন্টিনা-অধ্যায় ইতোমধ্যে পূর্ণ।
১২৫ গোল, ২০৭ ম্যাচ, ছয়টি বিশ্বকাপ, চারটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা, ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল- সবকিছুর পর তিনি বিদায় নিচ্ছেন। একসময় যে খেলোয়াড়কে জাতীয় দলের হয়ে ‘কিছুই জিততে পারেননি’ বলে প্রশ্ন করা হতো, তিনিই এখন আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ও প্রভাবশালী প্রজন্মের কেন্দ্রবিন্দু। এ কারণেই কালকের রাতটি ফলাফলের চেয়েও বড়।
মেসি হয়তো আর কখনও আর্জেন্টিনার হয়ে খেলবেন না। কিন্তু তার রেখে যাওয়া গল্পটি শেষ হওয়ার নয়। কারণ জাতীয় দলের জার্সিতে তার সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু চারটি ট্রফি নয়; তিনি একটি প্রজন্মকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন যে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও স্বপ্ন পূরণ হতে পারে।
কাল মনুমেন্টাল তাকে বিদায় জানাবে।
হয়তো শেষ বাঁশির পর মেসি গ্যালারির দিকে তাকাবেন, হাত তুলবেন, সতীর্থদের সঙ্গে দাঁড়াবেন। হয়তো চোখে পানি থাকবে। আর হাজার হাজার মানুষ একই কথা বলবে-
‘Gracias, Leo.’ ধন্যবাদ, লিও।