ছাব্বিশের বাংলাদেশ শুধু একটি সময়কাল নয়; এটি ইতিহাসে এক আত্মপর্যালোচনার মুহূর্ত। এ সময় রাষ্ট্র প্রথমবারের মতো নিজেকে প্রশ্ন করছে আমরা কোথায় ভুল করেছি, কেন ক্ষমতা জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, কেন জনগণের নামে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রই তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। এই প্রশ্নগুলো শুধু রাজনৈতিক নয়; এগুলো রাষ্ট্রীয় দর্শনের মূল ভিত্তি। নয়া বাংলাদেশের ইশতেহার এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করার প্রয়াস আর সেই প্রয়াসের কেন্দ্রে রয়েছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যার নাম গণভোট। গণভোট কেবল একটি ভোটের প্রক্রিয়া নয়; এটি এক ধরনের রাষ্ট্রদর্শন। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, যেখানে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নেই, সেখানে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে যায়। কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে স্বৈরাচারকে পুষ্ট করে। চব্বিশের বাংলাদেশ ছিল সেই বাস্তবতার প্রতিফলন। জনগণ বারবার ভোট দিয়েছে, কিন্তু তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ছিল সীমিত। নির্বাচিত প্রতিনিধি ও শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে গোপন সমঝোতা, স্বার্থান্বেষী নীতি ও প্রশাসনিক ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা রাষ্ট্রকে জনগণের চোখে বৈধতা হারিয়ে দিতে বাধ্য করেছে। এই ঘাটতি পূরণ করতে পারে এবারের গণভোট। যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের বড় সিদ্ধান্তগুলো জনগণের হাতে ফিরিয়ে আনা যায়। এটি মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, তারা কেবল ভোটার নয় রাষ্ট্রের প্রকৃত অংশীদার। সংবিধান সংশোধন, ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ, নীতি ও কাঠামোগত পরিবর্তন এসব ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ রাষ্ট্রকে টেকসই বৈধতা দেয়। এতে সিদ্ধান্তের নৈতিক ভিত্তিও শক্তিশালী হয়। মানুষ তখন সিদ্ধান্তকে নিজেরও অংশ মনে করে, এমনকি সেটি প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলেও। এই গণসম্মতি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককে দৃঢ় করে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
চব্বিশের আগস্ট পূর্ববর্তী বাংলাদেশ দেখিয়েছে, ক্ষমতার ওপর জনগণের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে এককেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। আইনসভা, আদালত কিংবা প্রশাসন সবই নির্বাহী ক্ষমতার ছায়ায় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। এর ফলে জন্ম নেয় স্বৈরাচারী শাসন। গণভোট সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে স্বৈরাচার রোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এটি শুধুই গণতান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সংস্কার, যা ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার দিকেও গুরুত্বপূর্ণ। গণভোট সমাজের প্রতিটি স্তরকে রাজনৈতিক চেতনার সঙ্গে যুক্ত করে। গ্রামাঞ্চল থেকে শহর, শ্রমজীবী থেকে বুদ্ধিজীবী প্রত্যেকের ভোটের সমান গুরুত্ব থাকে। এর ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ করতে পারে। এটি সাম্য ও ইনসাফের ভিত্তি তৈরি করে। অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, যেখানে ক্ষমতা ও সুযোগের ভারসাম্য নেই, সেখানে রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। গণভোট এই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে, যাতে রাষ্ট্র আর শুধুমাত্র এক দলের বা এক ব্যক্তির স্বার্থে কাজ না করে, বরং দেশের সব নাগরিকের কল্যাণে পরিচালিত হয়। চব্বিশের গণআন্দোলন ছিল নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক চেতনার প্রতিফলন। তারা পুরনো রাজনৈতিক ভাষা মানতে রাজি নয়। তারা স্বচ্ছতা চায়, জবাবদিহি চায়, অংশগ্রহণ চায়। গণভোট সেই চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি নতুন প্রজন্মকে বলে দেয়, রাজনীতি মানে শুধু মিছিল বা ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থাকা নয়; রাজনীতি মানে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা।
গণভোটের প্রয়োজনীয়তা শুধু রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কাঠামোর প্রশ্ন নয়; এটি সামাজিক সংস্কৃতির একটি দিক। গণভোট মানুষকে দায়িত্ববান নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। মানুষ যখন উপলব্ধি করে ভোট কেবল প্রতিনিধি নির্বাচন নয়, এটি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে সরাসরি প্রভাব ফেলে, তখন সে নিজ দায়িত্বকে উপেক্ষা করতে পারে না। এই দায়িত্ববোধই দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী নাগরিক সমাজ গড়ে তোলে। অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, যেখানে নাগরিকরা রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, সেখানে শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়ন বৃদ্ধি পায়। চব্বিশ-পূর্ববর্তী সময়ে জনগণ প্রায়ই শুধু ‘সহ্যকারী’ হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। গণভোট এই পরিস্থিতিকে উল্টে দেবে। এটি নাগরিকদের বলবে তুমি রাষ্ট্রের অংশ, তোমার মতামতই শেষ কথা। এই প্রত্যয়ের ফলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে বিশ্বাসের সংস্কার তৈরি হয়, যা স্থিতিশীল ও শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের জন্য অপরিহার্য। গণভোট ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যম হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। যখন জনগণ জানে যে বড় সিদ্ধান্তে তাদের সম্মতি প্রয়োজন, তখন ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসে। শাসকগোষ্ঠী জানে, জনগণের অনুমতি ছাড়া তারা দীর্ঘমেয়াদে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে না। এটি ভবিষ্যতে স্বৈরাচারী প্রবণতার বিরুদ্ধে একটি কার্যকর বাধা। নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক চেতনার সঙ্গে গণভোট সামঞ্জস্যপূর্ণ। তরুণরা যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণ চায়, গণভোট তা নিশ্চিত করে। এটি তরুণদের বলে দেয়, রাজনীতি মানে শুধু রাজনৈতিক দলের অংশ হওয়া নয়; রাজনীতি মানে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা। এভাবে গণভোট শুধুই রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, এটি শিক্ষার এক ধারা যেখানে নাগরিকরা দায়িত্ব, যুক্তি ও বিশ্লেষণ শেখে। তবে গণভোটের কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য, অবশ্যই কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। প্রশাসন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকতে হবে। গণমাধ্যম স্বাধীন ও তথ্যভিত্তিক থাকতে হবে। তবে এসব শর্তের অনুপস্থিতিকে গণভোটের অকার্যকরতার কারণ হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না। বরং গণভোটই এসব সংস্কারগুলোকে জরুরি করে তোলে। কারণ একটি রাষ্ট্র যেখানে জনগণের অংশগ্রহণ নেই, সেখানে নয়া বাংলাদেশের স্বপ্ন কখনো পূর্ণ হতে পারে না। গণভোট রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিক শক্তি হিসেবে কাজ করে। এটি বলে দেয়, রাষ্ট্র কেবল আইন ও প্রক্রিয়া দ্বারা নয়, জনগণের সমর্থন ও অংশগ্রহণ দ্বারা শক্তিশালী হয়। রাষ্ট্র যদি জনগণের সঙ্গে বৈঠক না করে সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সেটি কেবল শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থ পূরণের জন্য কাজ করে। গণভোট এই চক্র ভাঙে এবং রাষ্ট্রকে জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেয়। চব্বিশ-পূর্ববর্তী সময়ে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। জনগণ ভাবত, রাষ্ট্র তাদের কথা শোনে না, তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণও বৈধ নয়। গণভোট এই আস্থা পুনঃস্থাপন করে। মানুষ তখন বুঝতে পারে যে, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে তার অংশগ্রহণ প্রকৃত অর্থে মূল্যবান। এই স্বীকৃতি রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্ককে পুনর্নির্মাণ করে। গণভোটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক সমতা। গ্রাম থেকে শহর, প্রান্তিক থেকে কেন্দ্র প্রত্যেকের ভোটের ওজন সমান। এটি রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে। সাম্য ও ন্যায়ের ভিত্তি এই সমান অংশগ্রহণে তৈরি হয়। গণভোট না থাকলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থ উপেক্ষিত থাকে এবং সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি পায়।
গণভোট রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিকে নতুন দিক দেখায়। এটি নাগরিকদের বলে, রাষ্ট্রের নীতি শুধু শাসকগোষ্ঠীর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে না; জনগণের মতামত ও সম্মতিই মূল ভিত্তি। এটি রাজনৈতিক দায়িত্ববোধের সংস্কার তৈরি করে। মানুষ বোঝে যে, তার ভোট শুধু প্রতিনিধির জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রের মূল কাঠামো ও নীতিনির্ধারণে প্রভাব রাখে। গণভোট রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল ও টেকসই করে। যখন জনগণ অংশগ্রহণ করে, তারা রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধ হয়। রাষ্ট্রের নিয়ম ও সিদ্ধান্তকে মান্য করার মনোবৃত্তি তৈরি হয়। এতে রাজনৈতিক সহিংসতা, অসন্তোষ ও অস্থিরতার ঝুঁকি কমে। গণভোট কেবল একটি প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে আস্থা, অংশগ্রহণ ও দায়িত্বের সংস্কার। গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি হয়। মানুষ বুঝতে পারে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার অংশগ্রহণ মূল্যবান। এই আস্থা রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখে এবং নাগরিকদের মধ্যে দায়বোধের সংস্কার তৈরি করে। চব্বিশের আন্দোলন দেখিয়েছে, জনগণ কেবল পরিবর্তনের দাবিকর্তা নয়; তারা রাষ্ট্রের নীতি ও কাঠামো গঠনের অংশীদার। নয়া বাংলাদেশের ইশতেহার গণভোটকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখে। এটি রাষ্ট্রকে বলে দেয়, জনগণই শেষ কথার মালিক। সংবিধান সংশোধন, নীতি পরিবর্তন, ক্ষমতার পুনর্বণ্টন এসব ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো পরিবর্তন টেকসই বা নৈতিকভাবে বৈধ হতে পারে না। গণভোট এই অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করে। গণভোট শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাতিয়ার নয়; এটি সামাজিক, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মাধ্যম। এটি নাগরিকদের দায়িত্ব, জবাবদিহি, বিশ্লেষণ ও অংশগ্রহণ শেখায়। এটি রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে বিশ্বাসের সেতু তৈরি করে। গণভোটের মাধ্যমে একটি অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা হয়, যা নয়া বাংলাদেশের মূল ভিত্তি।
সবশেষে বলা যায়, গণভোট ছাড়া নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন পূর্ণতা পাবে না। এটি শুধু এক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের দর্শন, যা নিশ্চিত করে যে, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ক্ষমতার দিকে নয়, অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের দিকে এগোবে। জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার, সাম্য ও স্থিতিশীলতা কল্পনাই করা যায় না। গণভোটই নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদর্শনের মূল ভিত্তি যেখানে জনগণের কথাই রাষ্ট্রের কথা। নয়া বাংলাদেশে গণভোটের অন্তর্ভুক্তি মানে, এক ধরনের ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি। এটি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র জনগণের ওপর ভরসা রাখে, জনগণকে ভয় পায় না, বরং তাদের শক্তি ও অংশগ্রহণের মধ্যেই নিজের স্থিতি খুঁজে পায়। গণভোট এমন ভিত্তি স্থাপন করে, যার ওপর দাঁড়িয়ে সত্যিকারের নতুন বাংলাদেশ গড়ে উঠতে পারে।
এ জাতীয় আরো খবর..