বৃহস্পতিবার, ০২:৪৮ অপরাহ্ন, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

গণতন্ত্রের উত্তরণ, সামাজিক সংহতি ও জাতীয় অঙ্গীকার

মোহাম্মদ শাহী নেওয়াজ
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬
  • ৩ বার পঠিত

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন গত ১১ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণের মাধ্যমে তপশিল ঘোষণা করেন। ঘোষিত তপশিল অনুসারে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫-এর আলোকে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এখন দেশব্যাপী চলছে নির্বাচনী হাওয়া। শহর, নগর, গ্রাম, পাড়া ও মহল্লায় চলছে এক এবং অভিন্ন আলোচনা।

নির্বাচনী মৌসুমে সব দলীয় প্রার্থী এবং জাতীয় নেতারা অতি সাধারণ বেশে জনতার কাতারে নেমে আসে। সাধারণ ভোটাররা প্রার্থীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে, বুক মিলিয়ে ও কুশল বিনিময়ে প্রশান্তি লাভ করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একটি দলনিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা হয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সরকার গঠন করে। তাই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচিত সরকার গঠনের লক্ষ্যে ভোটার হিসেবে ভোট প্রদান নাগরিকের অন্যতম দায়িত্ব।

আধুনিক সমাজে রাষ্ট্র নাগরিকের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ। জনগণের এ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রায়নের মাধ্যমে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার বা প্রহসনমূলক পন্থায় নির্বাচিত সরকার অনেক সময় নাগরিক অধিকার হনন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন, মানবাধিকার খর্ব করা, জনমত উপেক্ষা করা ও কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালায়। এতে দেশে শান্তি, স্বস্তি, স্থিতিশীলতা, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক সংহতি বিঘ্নিত হয়।

স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্ত গণতান্ত্রিক চর্চায় সফলতা কতটুকু? এখন মূল্যায়নের সময় এসেছে। গণতন্ত্র মানে জনগণের শাসন। যেখানে শাসন ক্ষমতা জনগণের হাতে থাকে। নাগরিকরা সরাসরি ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন করে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে অংশ নেয়, যা মূলত জনগণের ইচ্ছা ও মতামতের প্রতিফলন। যার মূলভিত্তি নাগরিকের অধিকার, স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও সব নাগরিকের সমান অংশগ্রহণের সুযোগ। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশ অদ্যাবধি পূর্ণরূপে অর্জন করতে পারেনি। ১৯৭৫ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করা, যা পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহে ১৯৭৮ সালে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তিত হয়। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে আবারও গণতন্ত্র প্রত্যাবর্তন করে। আশির দশকের গোড়ায় গণতন্ত্র আবারও হারিয়ে যায় এবং গড়ে ওঠে স্বৈরাচারী শাসন কাঠামো। ১৯৯০ সালের সালের ৬ ডিসেম্বর দেশে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে একটি গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের সফল সমাপ্তি ঘটে ছাত্র সংগঠনগুলোর দৃঢ়তায়। এ আন্দোলনে সাতদলীয় জোট, আটদলীয় জোট ও পাঁচদলীয় রাজনৈতিক জোটগুলো প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে এবং স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটায়। ১৯৯০ সালে সামরিক সরকারের পতন বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের সূচনাবিন্দু হিসেবে পরিচিত। আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী তিনদলীয় জোটের রূপরেখা অনুসারে নির্দলীয় নিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসেবে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে শুরু হয় গণতন্ত্রের অভিযাত্রা এবং গণতন্ত্রের উত্তরণ। এ ধারাবাহিকতায় পঞ্চম থেকে নবম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত দেশে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকে। পরে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ অনুষ্ঠিত দশম থেকে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে সর্বদলীয় ও সর্বসাধনের অংশগ্রহণ সীমিত করা হয়। দেশে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক চর্চা ব্যাহত হয়। উত্থান ঘটে স্বৈরতন্ত্রের।

জুলাই গণআন্দোলন দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সূচনা করে, যা ছিল ২০২৪ সালে ৫ জুন থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণতান্ত্রিক আন্দোলন। যার মাধ্যমে বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের পতন হয়। এ আন্দোলেনে তারুণ্যের শক্তির উদ্ভব ঘটে। তারা সরকারি চাকরি ক্ষেত্রে কোটামুক্ত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখে। অঙ্গীকারবদ্ধ হয় একটি নতুন বাংলাদেশ গঠনে। জুলাই আন্দোলন একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কার আন্দোলন হিসেবেও বিবেচিত। এ আন্দোলনের মূল লক্ষ্যগুলো—পূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, মৌলিক মানবাধিকার ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ, বৈষম্যহীন সমাজ, সুবিচার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং সম্মানজনক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

এখন সময় হয়েছে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং সমাজের শান্তি ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনা। সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যতীত দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করা মোটেই সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন সামাজিক সংহতি। সামাজিক সংহতি হচ্ছে সমাজের সদস্যদের মধ্যকার মানসিক ঐক্য, পারস্পরিক সম্প্রীতি, বিশ্বাস ও বন্ধনের অনুভূতি, যা একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে ও সম্মিলিতভাবে কাজ করতে শক্তি জোগায়। সামাজিক সংহতি প্রতিষ্ঠায় সামাজিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজ অনন্য ভূমিকা পালন করে। সামাজিক সংহতি সমাজে শান্তি, সহযোগিতা ও স্থিতিশীলতা আনয়ন করে। এ ক্ষেত্রে পারস্পরিক বিশ্বাস বোঝাপড়া বাড়ায় ও কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়ক।

শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র হুমকির মুখে। বিশ্ব মুক্ত গণতন্ত্র চর্চায় ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছে। এতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সম্পদ কুক্ষিগত হচ্ছে সীমিত মানুষের হাতে। গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের দুশ্চিন্তা অন্তহীন। সুইডেনভিত্তিক একটি সংস্থা ভি ডেম (ভ্যারাইটিস অব ডেমোক্রেসি) বিশ্বব্যাপী চলমান গণতন্ত্রায়ন ও স্বৈরতন্ত্রীকরণ নিয়ে জরিপ পরিচালনা করে। এ জরিপের প্রকাশিত তথ্যমতে, বিশ্বের জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ স্বৈরতন্ত্রীকরণের শিকার। বর্তমানে পৃথিবীর ৮৭টি দেশে নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র চালু আছে। ২০০৮ সালে উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংখ্যা যেখানে ৪৪ ছিল, ২০১৮ সালে সেই সংখ্যা ২৯টিতে নেমে আসে। জার্মানভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বেরটেলসম্যান স্টিফটুং’ বিশ্বের ১২৯ দেশে গণতন্ত্র, বাজার অর্থনীতি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করে।

গণতন্ত্রের উত্তরণ ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন জাতীয় অঙ্গীকার। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এ রাষ্ট্র আমাদের, এ রাষ্ট্র সবার। এ রাষ্ট্র আমরা স্বাধীন করেছি সংগ্রামের মাধ্যমে। বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি। একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনে চাই স্থিতিশীল সমাজ, যা গণতন্ত্রের উত্তরণের মাধ্যমে সম্ভব। সামাজিক সংহতি সুপ্রতিষ্ঠিত হোক। জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় হোক।

লেখক: অধ্যক্ষ, জাতীয় সমাজসেবা একাডেমি, ঢাকা

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com