শনিবার, ১১:০৭ পূর্বাহ্ন, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬, ১৭ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।
শিরোনাম :
গৌরনদী ক্যাথলিক চার্চ পরিদর্শনে ভ্যাটিকান সিটির রাষ্ট্রদূত জনগণের অধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ধানের শীষই একমাত্র ভরসা-জহির উদ্দিন স্বপন  গৌরনদীতে সেনা তল্লাশিতে তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তির কাছ থেকে ১৪ কেজি গাঁজা উদ্ধার মেয়েদের পাশে বসে সেলফি তোলে মুরুব্বি মানুষটা: চরমোনাই পীর শেরপুরে জামায়াত নেতা নিহত, ইউএনও-ওসি প্রত্যাহার ক্ষমতায় গেলে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের ঘোষণা তারেক রহমানের মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের আদর্শ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় তার উত্তরাধীকার হিসাবে কাজ করতে চাই -জহির উদ্দিন স্বপন রুমিনের ফারহানার প্রচারণায় অংশ নেওয়ায় বিএনপির ৭১ সদস্যের কমিটি স্থগিত গণসম্মতি ও গণভোট পালং শাক খাওয়ার ৫ উপকারিতা

ট্রাম্পের নব্য-রক্ষণশীল অবস্থান

বেলেন ফের্নান্দেজ
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬
  • ১৭ বার পঠিত

ইরানে চলমান বিক্ষোভ শুরু হওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহের মাথায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার পছন্দের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বার্তা দিয়েছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘ইরান এখন স্বাধীনতার দিকে তাকিয়ে আছে, সম্ভবত আগের যে কোনো সময়ের চেয়েও বেশি। যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে প্রস্তুত! প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প।’

বরাবরের মতোই, ট্রাম্পের এলোমেলোভাবে বড় হাতের অক্ষর ব্যবহার আর অতিরিক্ত বিস্ময়চিহ্ন দেখে মনে হয় যেন কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র লিখেছে, বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশের নেতার লেখা নয়। তবে এর চেয়েও বেশি সমস্যা হলো, তার দেওয়া ‘সহায়তা’র প্রতিশ্রুতি। কারণ, বাস্তবতা হলো, ‘সহায়তা’ দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দক্ষতার জায়গা নয়। বিশেষ করে এমন একজন নেতার অধীনে, যিনি ক্ষমতায় ফিরে এসে বিদেশি যুদ্ধে জড়াবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও গত গ্রীষ্মে ইরানে বোমা হামলা চালিয়েছিলেন। এর পাশাপাশি, ট্রাম্পই ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর ও পঙ্গু করে দেওয়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছেন। এ নিষেধাজ্ঞার কারণেই ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়েছে, যা বর্তমান বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ। এ ধরনের অর্থনৈতিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে যা সাধারণত দেখা যায়, এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ইরানের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তরা, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে এ অবস্থান যেমন সাংঘর্ষিক, তেমনি ইরান সম্পর্কে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ‘সহায়তা’র প্রস্তাব তার আগের বক্তব্য থেকে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনও নির্দেশ করে। আগে ট্রাম্পের বক্তব্যে ইরানকে মূলত অভিযুক্ত করা হতো। ইরান নাকি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় এবং রাসায়নিক ও জৈবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন করছে। এসব অভিযোগকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হতো, যেন ইরান শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং বর্তমানে গণহত্যায় জড়িত আঞ্চলিক মিত্র ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্যও মারাত্মক হুমকি।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। ট্রাম্প বর্তমানে নিজেকে যেন ‘উদ্ধারকর্তা’র ভূমিকায় উপস্থাপন করছেন। চলতি মাসেই তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘যদি ইরান গুলি চালায় এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সহিংসভাবে হত্যা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসবে।’

গত মঙ্গলবার ট্রাম্প আবারও ইরানি বিক্ষোভকারীদের আশ্বস্ত করে বলেন যে, ‘সহায়তা আসছে’, তবে এ সহায়তা ঠিক কী ধরনের হবে, সে বিষয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থি গণমাধ্যমগুলোও এ বক্তব্যকে উসকে দিতে পিছপা হয়নি। তারা এমন সব উৎসাহব্যঞ্জক শিরোনাম ছাপিয়েছে, যেমন—‘আমেরিকাবিরোধী ইরান সরকারকে উৎখাতে ট্রাম্পের সামনে রয়েছে ঐতিহাসিক সুযোগ’।

এ আলোচনায় যোগ দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানি বিক্ষোভকারীদের ‘স্বাধীনতার সংগ্রামের’ প্রতি ইসরায়েলের সমর্থন রয়েছে এবং তিনি ‘নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের গণহত্যার তীব্র নিন্দা’ জানান। এ বক্তব্য বিশেষভাবে বিস্ময়কর। কারণ, একই ব্যক্তি গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান গণহত্যার নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এ ‘সহায়তা’র প্রতিশ্রুতি শুনে সহজেই প্রশ্ন জাগে যে, তিনি কি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের পুরোনো নীতির বই থেকেই পাতা উল্টে নিচ্ছেন না? সেই বুশ, যিনি তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ মুখপাত্র ছিলেন এবং যার প্রশাসন নব্য-রক্ষণশীল বা নিও-কন আদর্শ ছড়িয়ে দিতে ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যে আদর্শের বিরোধিতা করার দাবি ট্রাম্প বহুদিন ধরেই করে আসছিলেন।

মূলত নিও-কন আদর্শের লক্ষ্য হলো, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কিংবা মানবিক মূল্যবোধের মতো বাহ্যিকভাবে সুন্দর ধারণাকে অজুহাত বানিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সামরিক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো এবং সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব বিস্তার করা। ট্রাম্প একসময় বহু মার্কিন ভোটারকে আকৃষ্ট করেছিলেন এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে, তিনি দূরদেশে এমন আগ্রাসী হস্তক্ষেপ বন্ধ করবেন এবং নিজের দেশ নিয়েই ব্যস্ত থাকবেন। ‘আমেরিকাকে আবার মহান বানাবেন’; কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই নব্য-রক্ষণশীল মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা মোটেও সহজ নয়।

আসলে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি অনেক দিক থেকেই জর্জ বুশের সময়কে মনে করিয়ে দেয়। দুজনের মধ্যেই রয়েছে এক ধরনের ভাঁড়সুলভ আচরণ। ইংরেজি ব্যাকরণ ও বানানের সঙ্গে তাদের অদ্ভুত সম্পর্কের কথা তো বাদই দিলাম! এ ছাড়া, দুজনই নিজেদের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে ঈশ্বরকে এক ধরনের মিত্র হিসেবে টেনে আনতে অস্বাভাবিকভাবে আগ্রহী।

যদিও ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করে এসেছেন, তিনি সরকার উৎখাতের নীতির বিরোধী এবং বুশ-যুগের ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের সমালোচক। যে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ শেষ পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। তবু ক্ষমতায় ফেরার প্রথম বছরেই তিনি একাধিক দেশে বোমা হামলা চালিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করার মতো ঘটনাতেও জড়িয়েছেন।

এদিকে ফ্লোরিডার কংগ্রেসম্যান র‍্যান্ডি ফাইন সম্প্রতি ট্রাম্পকে গ্রিনল্যান্ড দখল করার অনুমতি দিতে একটি বিল উত্থাপন করেছেন। তিনিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “হয়তো আমাদের ‘মাদুরো’ করা উচিত খামেনিকে।” এখানে ‘খামেনি’ বলতে বোঝানো হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে, আর ‘মাদুরো’ শব্দটিকে ব্যবহার করা হয়েছে নতুন এক ক্রিয়া হিসেবে। যার অর্থ হলো, কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতাকে অপহরণ করা।

কিন্তু এখন যখন ট্রাম্প ঘোষণা দিচ্ছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সাহায্য করতে ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’, তখন ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের আগের তথাকথিত ‘সহায়তার’ ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানো অত্যন্ত জরুরি। উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে ১৯৫৩ সালের ঘটনাটি। সে বছর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ একটি ষড়যন্ত্রমূলক অভ্যুত্থান (কু দেতা) সংগঠিত করেছিল, যার মাধ্যমে ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা হয়। এ ঘটনার ফলেই ইরানে দীর্ঘদিন ধরে শাসন করার সুযোগ পান শাহ। যিনি নির্যাতন, দমন-পীড়ন ও ভয়ভীতির মাধ্যমে দেশ শাসন করতেন। অবশেষে ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের মাধ্যমে সেই শাহ শাসনের অবসান ঘটে।

এটি নিছক অতীতের ইতিহাস নয়। কাকতালীয়ভাবে, সেই প্রয়াত শাহের ছেলে বর্তমানে ওয়াশিংটন ডিসির বাইরে বিলাসবহুল নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন এবং সেখান থেকেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। অর্থাৎ, বাইরের শক্তির সহায়তায় আবারও ইরানের রাজনীতিতে পরিবর্তন আনার আকাঙ্ক্ষা এখনো সক্রিয় রয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে বলা যায়, ট্রাম্প হয়তো বুঝে ফেলেছেন যে, অন্য দেশের মানুষকে ‘সাহায্য করার’ কথা বলা কতটা কার্যকর একটি কৌশল হতে পারে। বিশেষ করে যখন নিজের দেশের ভেতরের অগণতান্ত্রিক বাস্তবতা থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে রাখতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বাস্তবতার দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। দেশটি কার্যত একটি পূর্ণাঙ্গ পুলিশ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে অভিবাসন সংস্থার সদস্যরা নির্বিঘ্নে মার্কিন নাগরিকদের হত্যা করেও পার পেয়ে যাচ্ছে।

এ অবস্থায় ট্রাম্প যখন ক্রমেই জর্জ ডব্লিউ বুশের নীতির প্রতিধ্বনি করছেন, তখন ইরানিদের জন্য সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় এবং বিপজ্জনক বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ‘উদ্ধার’ বা ‘সহায়তা’। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, এ ধরনের সহায়তা সাধারণত সংশ্লিষ্ট দেশের জনগণের জন্য আরও অস্থিরতা, সহিংসতা ও দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ বয়ে আনে।

লেখক: একজন খ্যাতনামা সাংবাদিক ও লেখক। তিনি দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, লন্ডন রিভিউ অব বুকস, দ্য ব্যাফলার, কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স, মিডল ইস্ট আইসহ বহু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে লিখে থাকেন। আল জাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com