ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মিত্র থেকে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে শক্তির ব্যবধান চোখে পড়ার মতো হলেও কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলছে না।
ঐতিহ্যগতভাবেই এ দেশে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর ভোটারদের আচরণ ছোট শহরগুলোর সঙ্গে মেলে না। আবার শহর ও গ্রামের মধ্যে এ পার্থক্য আরও ব্যাপক। দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা গ্রামীণ ক্ষমতা কাঠামোই সাধারণত সেখানকার ভোট নিয়ন্ত্রণ করে। শহরগুলোর ভোটাররা যে ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত স্বাধীনতা ভোগ করেন। গ্রামীণ ক্ষমতা কাঠামোর প্রধান সাধারণত ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান-মেম্বাররা; তাদের সঙ্গে আছেন গ্রামে গ্রামে সালিশ-দরবার করা পরিবার ও ব্যক্তিরা। ভোটের ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব তাদের পরিবার বা বংশের ওপর তো থাকেই; ক্ষেত্রবিশেষে গোটা পাড়া বা গ্রামই তাদের কথায় একদিকে ছোটে। এ কারণে দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলে কোনো প্রতীকে সাধারণত ভোট পড়ে গুচ্ছ আকারে, যে প্রবণতা শহরাঞ্চলে কম। গ্রামীণ ক্ষমতা কাঠামো একটা শৃঙ্খলের মতো, যার গোড়ায় থাকেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যানরা, যাদের বিপুল অধিকাংশ ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে যুক্ত। এখানে জামায়াতের প্রবেশাধিকার নেই বললেই চলে।
প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নিষিদ্ধ থাকায় দলটির বিশেষত গ্রামাঞ্চলের ভোটাররা কী করবেন? গত সপ্তাহে আমার নিয়মিত কলামে মূলত এ নিয়েই আলোকপাত করেছিলাম। তবে সেখানে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী সমর্থক তথা নৌকার ভোটারদের নিজের পক্ষে টানার চেষ্টা করছেন; সে কথা বলা হয়েছিল। এবার দেখা যেতে পারে, নৌকার সমর্থকদের প্রবণতা কী।
এতে যে একেবারে কাজ হচ্ছে না, তা নয়। কিছু কিছু অতিসাম্প্রতিক জরিপ এবং মাঠের বাস্তবতাও বলছে, অনুকূল পরিবেশ পেলে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটা অংশ, বিশেষত যারা ঘোরতর জামায়াতবিরোধী তারা– এই প্রথমবারের মতো ধানের শীষে ভোট দিতে পারেন। এ কথা বলার আরেকটা কারণ হলো, আওয়ামী লীগ দলগতভাবে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিলেও অন্তত সামাজিক মাধ্যমে এর পক্ষের প্রচার খুব জোরালো নয়। দলটি আসন্ন নির্বাচনকে বৈধ বলে মনে করে না। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, তা প্রতিহতের ডাক দেওয়াই ছিল প্রত্যাশিত। বিশেষত গত ১৩ নভেম্বর দলটির ডাকে পালিত লকডাউনের সাফল্য দেখে এমনটাই ধারণা করেছিলেন তারা। কিন্তু সে পথে দলটি যায়নি। দলটির তৃণমূলও তাই নিজের মতো করে ভাবার সুযোগ পাচ্ছে।
সর্বোপরি সমগ্র জনগণের মধ্যে ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচনের মাধ্যমে অন্তত ক্ষমতার হাতবদলের যে আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়েছে, আওয়ামী লীগের নোতকর্মী-সমর্থকরা তার বাইরে নয়। এ প্রেক্ষাপটেই সুনামগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ঠাকুরগাঁও, চাঁদপুরসহ বিভিন্ন স্থানে লীগের নেতাকর্মী ধানের শীষের পক্ষে কাজ করছেন, এমন খবরও এসেছে। ডেইলি স্টারের একটি ফটোকার্ড ইতোমধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দেখা যায়– বিভিন্ন আক্রমণাত্মক পোস্ট ও মিমে জামায়াত বিএনপিকে টার্গেট করেছে, আর আওয়ামী লীগের টার্গেট ছিল জামায়াত। এখানেও নৌকার ভোটারদের ইঙ্গিত স্পষ্ট।
এটা সত্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এমনকি সমর্থকদের ওপর হামলা-মামলাসহ যে ভয়ংকর নির্যাতন নেমে এসেছে, তার সিংহভাগের সঙ্গে জড়িত বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা। ভুয়া মামলা দিয়ে লীগের লোকদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অসংখ্য অভিযোগ আছে বিএনপির লোকদের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন আসনে নৌকার সমর্থকদের কাছে টানতে জামায়াত নেতাকর্মী অবিরাম সে কথা প্রথমোক্তদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন।
এতৎসত্ত্বেও নৌকার সমর্থকরা জামায়াতের দিকে ঝুঁকেছেন, এমন খবর খুব একটা নেই। আসলে তা থাকারও কথা নয়। ঢাকাসহ দেশের পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংসদ দখলে নিয়ে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির মব সহিংসতাসহ যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে, তার প্রধান ভুক্তভোগী বিগত সরকার সমর্থক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এ থেকে শহরাঞ্চলে তো বটেই, অনেক গ্রামেও নৌকার সমর্থকদের মধ্যে এ আশঙ্কা দানা বেঁধেছে– একটা বিশ্ববিদ্যালয় দখলে নিয়ে জামায়াত যে চণ্ড রূপ দেখায়, রাষ্ট্র হাতে পেলে সর্বগ্রাসী রূপ নেবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সমাবেশ ও সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় জামায়াত নেতারা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী যে আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখাচ্ছেন, তার লক্ষ্য ৭১-এর ‘প্রতিশোধ’ নেওয়া– সেটাও এখন স্পষ্ট। আর এর প্রধান শিকার যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থকরা হবেন, সেটাও বলা বাহুল্য।
তবে আগেও যা বলেছি, সেটা এখনও গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো, বিএনপিকে এর অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নির্বাচন যদি মোটামুটিও সুষ্ঠু হয়, আর তা যদি হয় নৌকার সমর্থকদের বাইরে রেখে, তাহলে বিএনপিকে জামায়াতের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে, নিঃসন্দেহে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, জামায়াত যদি এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য আসন নিয়ে বিরোধী দলে যায়, তাহলেও বিএনপির রাজনীতি আরও বড় চ্যালেঞ্জে পড়বে। কারণ রক্ষণশীল ভোটারদের কাছে তখন একমাত্র বিকল্প দাঁড়াবে জামায়াত ও তার জোট।
বিএনপি যেচে এ বিপদ ডেকে আনবে, না রক্ষণশীলদের নেতৃত্ব আগের মতোই নিজের হাতে রেখে উদারপন্থিদেরও কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে– সে সিদ্ধান্ত এখন তাকেই নিতে হবে।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল