বিদেশে উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশিদের ভিসা পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও যোগ্যতা থাকার পরও অনেক আবেদনকারী ভিসা প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়ছেন, যার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যাও অনেক ক্ষেত্রে দেওয়া হচ্ছে না। এতে হতাশা বাড়ছে বিদেশে যেতে আগ্রহী শিক্ষার্থী, পর্যটক ও কর্মপ্রত্যাশীদের মধ্যে।
ভিসা না পাওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কাঠামোগত ও বাস্তব কারণ চিহ্নিত করেছেন অভিবাসন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, ভিসা আবেদনের সময় ভুয়া শিক্ষাগত সনদ, জাল অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ সনদ এবং ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট জমা দেওয়ার প্রবণতা বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে বড় একটি নেতিবাচক ইমেজ তৈরি করেছে। পাশাপাশি অনেকেই ভ্রমণ বা শিক্ষার্থী ভিসায় কোনো দেশে গিয়ে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে অবস্থান করছেন, আবার কেউ কেউ এক দেশে গিয়ে অন্য দেশে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করছেন।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অনেক নাগরিককে ফেরত পাঠাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে গিয়ে আবেদন করা আশ্রয়ের আবেদনও সম্প্রতি অনেক বেশি বাতিল হচ্ছে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন সেন্টারের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে যারা বিদেশ যেতে চায় তাদের অন্তত ৮০ শতাংশই দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীনির্ভর।
ভিসা সংকটের সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অনেক দেশ এমনিতেই বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থানে ছিল। তার ওপর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, সুশাসনের ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, ভিসা না পাওয়ার ক্ষেত্রে যেমন ব্যক্তির দায় রয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের গলদ আছে। কেউ ভুল তথ্য দিচ্ছেন, আবার কেউ বিদেশে গিয়ে এমন কর্মকাণ্ড করছেন, যা সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে পরবর্তীতে তারাও বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসা দিতে দ্বিধায় পড়ছে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর গড়ে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশিকে বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত পাঠানো হয়। ইউরোপ থেকেই গত আট বছরে ফেরত পাঠানো হয়েছে অন্তত চার হাজার বাংলাদেশিকে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর গত এক বছরে ফেরত পাঠানো হয়েছে অন্তত তিনশ জনকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দালালনির্ভরতা, ভিসা শর্ত লঙ্ঘন, অবৈধ অবস্থান এবং জালিয়াতি বন্ধ না হলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। একই সঙ্গে সুশাসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ ছাড়া আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার কঠিন হবে।
তাদের আশঙ্কা, এসব ক্ষেত্রে কার্যকর সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশিদের জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ আরও সংকুচিত হতে পারে।
সূত্র : বিবিসি বাংলা