ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ ও নির্বাচনী সংস্কারের দাবিতে রাজধানী দিল্লিতে মহাসমাবেশের আয়োজন করেছে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’।
আজ রোববার দুপুরে দিল্লির ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দানে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এতে কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ মানুষের সমাগম হতে পারে বলে ধারণা করছেন আয়োজকেরা। বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
‘ইন্ডিয়া’ (ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টাল ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্স) জোটের শীর্ষ নেতারা সমাবেশে যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তরুণদের নেতৃত্বাধীন প্রভাবশালী সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টিও (সিজেপি) এ কর্মসূচিতে সমর্থন জানিয়েছে। কংগ্রেসের দাবি, সমাবেশে ১০ লাখ মানুষের উপস্থিতি হতে পারে।
ভারতজুড়ে ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রম নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সমালোচনা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নামে পরিচিত এ কার্যক্রমের আওতায় দেশটির খসড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের দাবি, মৃত ব্যক্তি এবং নিবন্ধিত ঠিকানা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়া ব্যক্তিদের নাম বাদ দিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করাই এ কার্যক্রমের উদ্দেশ্য। তবে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক বৈধ ভোটারের নামও বাদ পড়তে পারে। এতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নির্বাচনী সুবিধা পেতে পারে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও বিজেপির বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরি’র অভিযোগও তুলেছে তারা। তবে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন উভয়েই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
গত সেপ্টেম্বরে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের সম্মতি ছাড়াই সংশোধন কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এ বিষয়ে অন্য দুই কমিশনার এক ডজনের বেশি ঘটনায় আপত্তি জানিয়েছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, যেকোনো প্রতিষ্ঠানে মতপার্থক্য স্বাভাবিক এবং এতে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হয় না।
এ বিতর্কের জেরে দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে বিরোধী দল, সিজেপি এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন। গত মাসে কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে হাজারো মানুষ দিল্লির কনট প্লেস থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত মিছিল করেন। তাদের প্রধান দাবি ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ।
রোববারের সমাবেশ সম্পর্কে রাহুল গান্ধী বলেছেন, তাদের আন্দোলন ভারতের গণতন্ত্র ধ্বংসের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সব পক্ষের মানুষের জন্যই এ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষায়, লাখ লাখ মানুষ ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। সংবিধান, ভারতের ধারণা এবং নাগরিকদের ভোটাধিকার রক্ষায় বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন।
দিল্লি পুলিশ সমাবেশের অনুমতি দিলেও কয়েকটি শর্ত আরোপ করেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিকেল ৫টার মধ্যে সমাবেশ শেষ করতে হবে, অনুষ্ঠানস্থলে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে এবং নির্ধারিত এলাকার বাইরে কোনো মিছিল করা যাবে না।
সমাবেশকে কেন্দ্র করে দিল্লির ব্যবসায়ীদের মধ্যেও মতবিভক্তি দেখা দিয়েছে। রামলীলা ময়দান থেকে এক কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থিত ঐতিহাসিক চান্দনি চক বাজারের একাংশের ব্যবসায়ীরা বলেছেন, দীপাবলির মাত্র এক সপ্তাহ আগে এ ধরনের সমাবেশ হলে উৎসবের মৌসুমে তাদের ব্যবসায় ক্ষতি হতে পারে। তবে অন্য একটি ব্যবসায়ী সংগঠন রাহুল গান্ধীর সমাবেশের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, বৃহস্পতিবার বাজারের মধ্য দিয়ে বিজেপির মিছিলই উৎসবের কেনাকাটায় বেশি বিঘ্ন ঘটিয়েছে।
সমাবেশ ঘিরে দিল্লির বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে রামলীলা ময়দানে যাওয়ার সড়কগুলোতে হাজারো পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করেছে কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, সমাবেশে যোগ দিতে মানুষ যাতে দিল্লিতে আসতে না পারেন, সে জন্য সরকার নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মানুষকে বিপুলসংখ্যায় সমাবেশে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পুলিশ বা লাঠিচার্জের ভয় না পাওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
এর আগে গত ১০ অক্টোবর প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সিজেপির ডাকা বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লিতে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল। শহরের বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল ও জনসমাগমে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ওই সময় সিজেপির শীর্ষ নেতাদের আটক করা হয় এবং অনেক বিক্ষোভকারীকে মারধর ও টেনেহিঁচড়ে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বিবিসির সাংবাদিকেরাও পুলিশকে বিক্ষোভকারীদের লাঠিপেটা ও আটক করতে দেখেছেন বলে জানিয়েছেন।
সিজেপি প্রকাশ্যে বিরোধী জোটের রোববারের সমাবেশের প্রতি সমর্থন জানালেও সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা এতে সরাসরি অংশ নেবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।