মঙ্গলবার, ০৬:৩৭ অপরাহ্ন, ২০ অক্টোবর ২০২৬, [bangla_date] , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

একই মাঠে মসজিদ-মন্দির, ৫৪ বছর ধরে সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত গৌরনদীতে

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২ বার পঠিত

একই মাঠে মসজিদ ও মন্দির। এক পাশে আতরের সুবাস মেখে সারিবদ্ধভাবে নামাজ আদায় করছেন মুসল্লিরা, অন্য পাশে ধূপের সুগন্ধে পূজার্চনায় ব্যস্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। মসজিদে আজান শুরু হলে থেমে যায় মন্দিরের ঢাকঢোল ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার্চনা। ধর্মীয় বিশ্বাস আলাদা হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতার এই চিত্র যেন নীরবে বলে দেয়—সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন একে অন্যের প্রতি সম্মানবোধ।

এমনই এক অনন্য দৃষ্টান্ত গড়ে উঠেছে বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের আধুনা এলাকার শেনেরহাট বাজারে। একই মাঠে মাত্র ১০ ফুট দূরত্বে অবস্থিত জামে মসজিদ ও সার্বজনীন দুর্গামন্দিরকে ঘিরে প্রায় ৫৪ বছর ধরে পাশাপাশি চলছে দুই ধর্মের মানুষের উপাসনা ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা। বিরোধ নয়, বরং পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতাই এ এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এখানে ধর্মীয় পরিচয় কখনো প্রতিবেশীর সঙ্গে দূরত্ব তৈরির কারণ হয়ে ওঠেনি। বরং মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ একে অন্যের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নিজ নিজ ধর্ম পালন করে আসছেন। দুর্গাপূজার আয়োজনেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন স্থানীয় মুসলমানরা। একইভাবে ঈদ, বিয়ে কিংবা সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিবেশীরাও।

আজানের সময় বিরতি, নামাজ শেষে পূজার্চনা

সরেজমিনে দেখা যায়, একই মাঠে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে মসজিদ ও মন্দির। দুর্গাপূজা উপলক্ষে মন্দির প্রাঙ্গণে চলছে পূজার আয়োজন। ঢাকঢোল, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। তবে মসজিদে আজান শুরু হলে পূজার আনুষ্ঠানিকতায় বিরতি দেওয়া হয়। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় ধর্মীয় কার্যক্রম।

মন্দিরের পূজারি স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, “মসজিদে আজান শুরু হলেই আমরা পুরো অনুষ্ঠানে বিরতি দিই। নামাজ শেষ হলে আবার আমাদের কার্যক্রম শুরু করি। আমাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এখানে কেউ কারও বিরক্তির কারণ হননি। বরং দুই ধর্মের মানুষই নিজেদের উপাসনালয়কে আগলে রেখেছেন।”

স্থানীয় সমাজসেবক মাকসুদ মৃধা বলেন, “এখানে সবাই মিলেমিশে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করেন। আমাদের পূর্বপুরুষেরাও এভাবেই চলেছেন। ছোটবেলা থেকেই আমরা পূজা দেখতে মণ্ডপে যাই। আবার ঈদ কিংবা বিয়ের অনুষ্ঠানে আমাদের হিন্দু প্রতিবেশীরাও আসেন। এটাই আমাদের এলাকার দীর্ঘদিনের সামাজিক বন্ধন।”

১৯৭২ সালে মন্দির, পরে নির্মিত হয় মসজিদ

মন্দির কমিটির সভাপতি শংকর চন্দ্র দাস জানান, ১৯৭২ সালে আধুনা শেনের বাড়ি সার্বজনীন দুর্গামন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তী সময়ে একই মাঠে নির্মিত হয় জামে মসজিদ। এরপর থেকে দুই ধর্মের মানুষ পাশাপাশি নিজ নিজ ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।

তিনি বলেন, “মন্দিরের মাত্র ১০ ফুট দূরত্বে মসজিদ। কিন্তু পাশাপাশি অবস্থানের কারণে আমাদের মধ্যে কোনো সমস্যা হয়নি। আমরা আমাদের ধর্ম পালন করি, মুসলমান ভাইয়েরা তাঁদের ধর্ম পালন করেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার মধ্য দিয়েই দীর্ঘদিন ধরে এখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়ে আসছে।”

সম্প্রীতির বন্ধন পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য

আধুনা শেনের বাড়ি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা কামরুল ইসলাম বলেন, “এখানে ধর্ম নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি নেই। মসজিদে আজান হলে হিন্দু ভাইয়েরা ঢাকঢোলের আওয়াজ বন্ধ রাখেন। আজান ও নামাজ শেষ হলে আবার তাঁদের কার্যক্রম শুরু করেন। বছরের পর বছর ধরে এখানে সবাই শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করছেন। কেউ কারও প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করেননি।”

স্থানীয়দের মতে, এই সহাবস্থান কেবল দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক বন্ধন ও পারস্পরিক আস্থার দীর্ঘ ইতিহাস। ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে সম্প্রীতির শিক্ষা।

সম্প্রীতির এমন দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে পড়ুক সর্বত্র

গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইব্রাহীম বলেন, “উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের আধুনা গ্রামের একই স্থানে মসজিদ ও মন্দির দীর্ঘদিন ধরে সম্প্রীতির শিক্ষা ছড়িয়ে যাচ্ছে। এটি আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা এমন একটি সমাজব্যবস্থা চাই, যেখানে সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ মিলেমিশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করবেন।”

আধুনা এলাকার এই চিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তা দেয়—ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ও অন্যের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা একে অন্যের পরিপূরক। নিজের বিশ্বাসে অবিচল থেকেও অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করা যায়; মত ও উপাসনার ভিন্নতা সত্ত্বেও গড়ে তোলা যায় প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক।

প্রায় ৫৪ বছরের এই সহাবস্থান তাই শুধু একটি এলাকার গল্প নয়, বরং সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ গঠনের এক বাস্তব শিক্ষা। যেখানে আজানের সময় বিরতি দেওয়া কিংবা পূজার সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়—এগুলো পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের প্রকাশ। এমন চর্চা আরও বিস্তৃত হলে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা বিভেদের কারণ না হয়ে বরং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com