‘ভূমি সেবার শুদ্ধতাই কমাতে পারে সামাজিক বিরোধ’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে সরকারি খাসজমির সঠিক ব্যবহার ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পুনর্বাসনে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে বরিশালের গৌরনদী উপজেলা ভূমি অফিস। সরকারি খাসজমির চান্দিনা ভিটিতে দোকানঘর নির্মাণ করে দীর্ঘদিন ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নির্ভরশীল দুই হতদরিদ্র মানুষকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে উপজেলার পিঙ্গলাকাঠী বাজারে নির্মিত দুটি দোকানঘর আনুষ্ঠানিকভাবে দুই সুবিধাভোগীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে নিজের শ্রমে জীবিকা নির্বাহের নতুন সুযোগ পেয়েছেন পিঙ্গলাকাঠী এলাকার মো. মনির সরদার ও কুতুপুর এলাকার মো. মজিবর সরদার।
দীর্ঘদিন ধরে চরম আর্থিক সংকটে থাকা মনির ও মজিবরের জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল ভিক্ষাবৃত্তি। অভাব-অনটনের কারণে নিজেদের কর্মসংস্থানের কোনো স্থায়ী পথও তৈরি করতে পারেননি তাঁরা। সরকারি উদ্যোগে দোকানঘর পাওয়ার পর এবার তাঁদের সামনে এসেছে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর নতুন সম্ভাবনা।
ভিক্ষার থালা থেকে কর্মের পথে
মনির ও মজিবরের জীবনের গল্প দারিদ্র্যের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের গল্প। জীবিকার তাগিদে একসময় তাঁদের মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পাততে হয়েছে। কিন্তু ভিক্ষাবৃত্তি তাঁদের পছন্দের জীবন ছিল না; পরিস্থিতিই তাঁদের সেখানে ঠেলে দিয়েছিল।
এখন সেই বাস্তবতা বদলানোর সুযোগ এসেছে। দোকানঘর পেয়ে তাঁরা নিজেদের শ্রম ও উদ্যোগে আয় করার সুযোগ পেয়েছেন। এতে শুধু তাঁদের পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির সম্ভাবনাই তৈরি হয়নি, বরং সামাজিকভাবে আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার পথও উন্মুক্ত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, একজন দরিদ্র মানুষকে সাময়িক সহায়তা দেওয়ার চেয়ে তাকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া অনেক বেশি কার্যকর। কাজের সুযোগ পেলে মানুষ নিজের পরিশ্রমে আয় করে পরিবার পরিচালনার পাশাপাশি সমাজেও সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারেন।
খাসজমির মানবিক ব্যবহার
সরকারি খাসজমির চান্দিনা ভিটিতে দোকান নির্মাণ করে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পুনর্বাসনের এই উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে প্রশংসিত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি এর একটি অংশ যদি প্রকৃত অসহায় মানুষের কর্মসংস্থানের কাজে ব্যবহার করা যায়, তাহলে তা সামাজিকভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সুবিধাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের মতামত ও সামাজিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত অসচ্ছল ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে চিহ্নিত করে তাঁদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে দোকান হস্তান্তর
দোকানঘর হস্তান্তর কার্যক্রমের সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. ইব্রাহিম। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নলচিড়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মো. জামাল ফকির, বিশিষ্ট সামাজিক ব্যক্তিত্ব মো. ফুয়াত হোসেন এ্যনি, পিঙ্গলাকাঠী বাজার কমিটির সভাপতি মো. হারুন অর রশিদসহ স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
দোকানঘর হস্তান্তরের সময় অতিথিরা মনির ও মজিবরের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের নতুন কর্মজীবনের সফলতা কামনা করেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান।
‘ভিক্ষাবৃত্তি থেকে কর্মমুখী জীবনে ফেরানোই লক্ষ্য’
গৌরনদী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. মেহেদী হাসান বলেন, ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নির্ভরশীল অসহায় মানুষকে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
তিনি বলেন, “সমাজ থেকে অবমাননাকর ভিক্ষাবৃত্তি নির্মূল করা এবং অসহায় মানুষগুলোকে কর্মমুখী ধারায় ফিরিয়ে এনে স্বাবলম্বী করাই আমাদের এই আয়োজনের প্রধান লক্ষ্য। সরকারি সম্পত্তি শুধু খাস হিসেবে ফেলে না রেখে তা যদি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যবহার করা যায়, তবেই প্রশাসনের প্রকৃত সাফল্য।”
মেহেদী হাসান আরও বলেন, জনস্বার্থে এবং অসহায় মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গৌরনদী ভূমি অফিসের এ ধরনের পুনর্বাসনমূলক কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
একটি দোকান, একটি নতুন স্বপ্ন
দুটি দোকানঘর হয়তো খুব বড় কোনো স্থাপনা নয়। কিন্তু মনির ও মজিবরের কাছে এগুলো একটি নতুন জীবনের দরজা। যে হাতে এতদিন জীবিকার জন্য মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে হয়েছে, সেই হাতেই এখন নিজের উপার্জনের পথ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই উদ্যোগ শুধু দুই পরিবারকে স্বাবলম্বী করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সমাজের অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত মানুষকেও কর্মমুখী জীবনে ফেরার অনুপ্রেরণা দেবে।
কারণ দারিদ্র্য একজন মানুষের শেষ পরিচয় নয়। প্রয়োজন শুধু একটি সুযোগ, একটু সহায়তা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটি পথ। পিঙ্গলাকাঠী বাজারের সরকারি খাসজমিতে নির্মিত দুটি দোকানঘর তাই মনির ও মজিবরের কাছে শুধু ব্যবসার জায়গা নয়, ভিক্ষার থালা ছেড়ে আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্নের প্রতীক।
এ জাতীয় আরো খবর..