বরিশালের গৌরনদীর পুত্রবধূ ও আগৈলঝাড়া উপজেলার উত্তর শিহিপাশা গ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থী ঝুমুর খানম সেতুর (২৬) অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, প্রবাসী স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির স্বজনদের দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতনের কারণে তিনি বিষপান করেন। পরে ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
ময়নাতদন্ত শেষে মঙ্গলবার রাতে ঝুমুরের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রাত ১০টার দিকে জানাজা শেষে আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের উত্তর শিহিপাশা গ্রামে বাবার বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।
এর আগে রাত ৯টার দিকে ঝুমুরের মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স বাবার বাড়িতে পৌঁছালে সেখানে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে গ্রামের পরিবেশ। শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েন এলাকাবাসী।
জানাজায় অংশ নেওয়া স্বজন ও এলাকাবাসী ঝুমুরের মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং এর সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
যেভাবে ঝুমুরের মৃত্যু
নিহত ঝুমুর খানম সেতু আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের উত্তর শিহিপাশা গ্রামের আব্দুল করিম খানের মেয়ে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী ঝুমুর বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণায় বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।
পরে সামাজিকভাবে গৌরনদী পৌর এলাকার চরগাধাতলী এলাকার মৃত হারুন কাজীর ছেলে শাহারিয়া কাজী ওরফে শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
ঝুমুরের বাবা আব্দুল করিম খানের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই তাঁর মেয়েকে স্বামী শাহারিয়া, শাশুড়ি রুনু বেগম, নাজমিন বেগম, শারমিন ও রিয়া খানম এবং নাজমিনের স্বামী সাইদুল হাওলাদার বিভিন্নভাবে মানসিক নির্যাতন করতেন।
করিম খানের দাবি, তাঁর জামাতা শাহারিয়া বর্তমানে কুয়েতে অবস্থান করছেন। দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের প্ররোচনায় তিনি মুঠোফোন ও ভিডিও কলের মাধ্যমে ঝুমুরকে মানসিকভাবে চাপ দিতেন। একপর্যায়ে ঝুমুরকে তাঁর একমাত্র মেয়েসহ শ্বশুরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে বসবাস করছিলেন তিনি।
ঝুমুরের পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের সময় পর্যাপ্ত মালামাল না দেওয়া, প্রায় ৫০০ বরযাত্রী না আনা এবং ঝুমুর দেখতে সুন্দরী নন, এমন নানা অজুহাতে তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছিল।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর দিবাগত রাতে স্বামী শাহারিয়া ভিডিও কলের মাধ্যমে ঝুমুরকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। একপর্যায়ে তাঁকে বিষপান করে মারা যেতে বলেন বলেও অভিযোগ করেছে পরিবার। এরপর পরিবারের অজান্তে ঝুমুর বিষপান করেন।
মুমূর্ষু অবস্থায় প্রথমে তাঁকে আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে ওই রাতেই বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে সোমবার (৫ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। স্বজনেরা অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে ঢাকায় নিয়ে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই দিন বিকেল ৫টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
স্বজনদের ক্ষোভ
নিহত ঝুমুরের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, বিষপানের পর আগৈলঝাড়া ও বরিশালের হাসপাতালে চিকিৎসা এবং পরে ঢাকায় নেওয়া থেকে শুরু করে মৃত্যু ও দাফন পর্যন্ত তাঁর স্বামীর পরিবারের কেউ পাশে ছিলেন না।
তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে ঝুমুরের মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
তবে ঝুমুরের পরিবারের এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর স্বামী শাহারিয়া কাজী ওরফে শাহাবুদ্দিনের পরিবারের কোনো সদস্য বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
তদন্ত করছে পুলিশ
আগৈলঝাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মাসুদ খান বলেন, “পুরো বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পুলিশ জানিয়েছে, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে কয়েক মাস আগে ঝুমুরের ২০ বছর বয়সী একমাত্র ভাই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ভাইয়ের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই ঝুমুরের অস্বাভাবিক মৃত্যুতে পরিবারটিতে আবারও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একই সঙ্গে পুরো উত্তর শিহিপাশা গ্রামেও বিরাজ করছে শোকের পরিবেশ।
এ জাতীয় আরো খবর..