মঙ্গলবার, ১২:২৯ অপরাহ্ন, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, [bangla_date] , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

জেলা শহরে চালু হচ্ছে স্কুলবাস

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার পঠিত

শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য পরিবহন নিশ্চিত করতে জেলা শহরে স্কুলবাস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ উদ্যোগের ফলে শহরগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়ি বা রিকশা নির্ভরতা কমে আসবে। ফলে কমবে যানজটও। একই সঙ্গে পরিবহন ভাড়া সাশ্রয়ী ও নির্ধারিত হওয়ায় অভিভাবকদের আর্থিক চাপ কমে আসবে। এ প্রকল্পটি চালুর জন্য ১ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকার ‘বৃহৎ জেলা শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণপরিবহনভিত্তিক যাতায়াত ব্যবস্থা প্রকল্প’ শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য সারসংক্ষেপ পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ উদ্যোগ খুবই চমৎকার। এটি যদি আসলেই বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে জেলা শহরগুলো যানজট কমার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা নিরাপদে স্কুল-মাদ্রাসায় আসা-যাওয়া করতে পারবে। তবে এর আগে ২০১০ সালে রাজধানীতে বিআরটিসির স্কুলবাস চালু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা বন্ধ হয়ে যায়। ওই প্রকল্পের ব্যর্থতার কারণে নতুন এ বৃহৎ উদ্যোগ কতটা সফল হবে তা নিয়ে কিছু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকার এই প্রকল্পটির মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। মেয়াদকাল ধরা হয়েছে আগামী ১ জুলাই থেকে ২০৩২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। প্রকল্পের খরচের মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা ও প্রশাসনিক ব্যয় হবে ১৫৯ কোটি টাকা, অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণে ব্যয় হবে ২০ কোটি টাকা, মোটরযান ক্রয়ে ব্যয় হবে এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা, কম্পিউটার সরঞ্জাম ক্রয় করতে খরচ হবে ৫১ কোটি টাকা এবং বিবিধ খাতে ব্যয় হবে ৭৬ কোটি টাকা।

প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে পাইলটিং হিসেবে প্রথম পর্যায়ে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশন এলাকায় এ সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ ধাপে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর, ময়মনসিংহ ও বগুড়া সিটি করপোরেশন এলাকায় এ সেবা চালুর কথা ভাবা হচ্ছে।

মাউশি সূত্র জানায়, সম্প্রতি এই মেগা প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা ও সুবিধাসমূহ যাচাইয়ের জন্য আরও ৩৩ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প পাঠানো হয়েছে।

এই সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যমান গণপরিবহন পরিকাঠামো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিষেবা প্রদানের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ছাড়া শিক্ষার্থী ও কর্মীদের সম্মুখীন হওয়া প্রধান সমস্যাগুলো, যেমন—অতিরিক্ত ভিড়, বিলম্ব, উচ্চ ব্যয় এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ চিহ্নিত করা হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত যাতায়াতের চাহিদা, রুট এবং ব্যস্ততম যাতায়াতের সময় বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি পরিবহন পরিষেবা সম্প্রসারণের বিভিন্ন বিকল্প, যেমন—নতুন রুট, পরিষেবার পুনরাবৃত্তি বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থা মূল্যায়ন করা হবে জানিয়েছেন তারা। সম্ভাব্যতা ও সুবিধা যাচাইয়ে যদি কার্যকর ফল উঠে আসে, তাহলে নতুন প্রকল্পটি অনুমোদন পাবে।

প্রকল্পটির গুরুত্ব প্রসঙ্গে মাউশি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ ও দ্রুত নগরায়ণশীল দেশ। ফলে জেলা শহরগুলোতে গত এক দশকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও শিক্ষার্থী ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বেশিরভাগ বৃহৎ জেলা শহরে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত প্রধানত অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে অটোরিকশা, ভ্যান, রিকশা ও অনিরাপদ যানবাহন। এগুলো একদিকে যেমন যানজট বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরিবহন সুবিধার অভাব আরও প্রকট উল্লেখ করে এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, সরকার এরই মধ্যে শিক্ষা ও টেকসই নগর পরিবহন উন্নয়নে বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করেছে। তা অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীদের নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সময়নির্ভর যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে বৃহৎ জেলা শহর যেমন—গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, বগুড়া প্রভৃতিতে শিক্ষার্থী পরিবহনের জন্য পরিকল্পিত গপরিবহন ব্যবস্থা চালু করা হলে তা শিক্ষা খাত ও নগর ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

প্রকল্পের নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এ ব্যবস্থায় ইলেকট্রিক স্কুলবাস ব্যবহারের পাশাপাশি নির্ধারিত রুট ও সময়সূচি, জিপিএস ট্র্যাকিং, স্মার্টকার্ড ও অনলাইন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পরিবহন ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় বৃহৎ জেলা শহরগুলোতে শিক্ষার্থীদের ঘনত্ব ও যাতায়াতের ধরন বিশ্লেষণ করা হবে। শিক্ষার্থীদের বসবাসের স্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থান এবং ব্যস্ত সময়ে যানবাহনের চাপ বিবেচনায় নিয়ে জিআইএসভিত্তিক রুট নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে পিক আওয়ার বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোন এলাকায় কতসংখ্যক বাস প্রয়োজন এবং কোন সময়ে বাস চলাচল করবে, তা নির্ধারণ করা হবে।

শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যাংক ঋণভিত্তিক ব্যবস্থায় ইলেকট্রিক স্কুলবাস দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বাস পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় চার্জিং অবকাঠামোও স্থাপন করা হবে। পরিবেশবান্ধব যানবাহন ব্যবহারের ফলে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি শহরের বায়ুর মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখার কথা বলা হয়েছে প্রকল্পে।

আরও দেখা যায়, স্কুলভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে চালু করা হবে ডিজিটাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম। এতে স্মার্টকার্ড, জিপিএস ট্র্যাকিং ও অনলাইন মনিটরিংয়ের মতো সুবিধা যুক্ত থাকবে। এর মাধ্যমে বাসের অবস্থান, চলাচল ও ব্যবহারের তথ্য পর্যবেক্ষণ এবং পরিবহন সেবার ওপর নজরদারি করা সম্ভব হবে।

প্রকল্পের আওতায় পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স (ওঅ্যান্ডএম) মডেলও তৈরি করা হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের চাপ কমাতে এবং যানজট নিয়ন্ত্রণে স্কুলের সময়সূচিতে সমন্বয় বা ‘স্কুল টাইম স্ট্যাগারিং’ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের অংশগ্রহণে স্থানীয় পর্যায়ে ট্রাফিক ও পরিবহন ব্যবস্থাপনাকেও আরও সুশৃঙ্খল করার পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে স্কুল পরিবহন ব্যবস্থার ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থা চালু হলে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি বাড়বে এবং শিক্ষা গ্রহণে যাতায়াতজনিত প্রতিবন্ধকতা কমবে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের পরিবহনজনিত সময় ও ব্যয় কমবে। নির্ধারিত রুট ও সময়সূচিতে পরিবহন চলাচল করায় যানজট ও যাতায়াতের অনিশ্চয়তাও কমবে। পরিকল্পিত স্কুল পরিবহন ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার কমানোরও লক্ষ্য রয়েছে। এতে শহরের পরিবহন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানোর পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে বলে প্রকল্পে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগেও নেওয়া হয়েছিল এমন উদ্যোগ: ঢাকা সিটি করপোরেশনসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে স্কুলবাস চালুর জন্য আগেও একাধিকবার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ২০১০ সালে রাজধানীতে শিক্ষার্থীদের জন্য বিআরটিসির স্কুলবাস সার্ভিস চালু করা হয়েছিল। তবে চালুর অল্প সময়ের মধ্যেই মুখ থুবড়ে পড়ে এ উদ্যোগ। তৎকালীন বিআরটিসি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি বাস কিনতে সরকারের ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৩২ লাখ টাকা। বিপরীতে একটি বাস থেকে দৈনিক গড়ে আয় হতো মাত্র ২০০ টাকার মতো। অথচ প্রতিদিন বাস পরিচালনায় ব্যয় হতো প্রায় ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা। পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষার্থী না পাওয়ায় আয়-ব্যয়ের বড় ঘাটতি তৈরি হয়। একপর্যায়ে লোকসানের বোঝায় বন্ধ হয়ে যায় বিআরটিসির স্কুলবাস সেবা। এ ছাড়া সম্প্রতি নারীদের জন্য বিশেষ বাসসেবা চালু করেও পরিচালন ব্যয় মেটাতে পারছে না বিআরটিসি। যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা ভাড়ায় জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও চালক-শ্রমিকদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ মেটানো যাচ্ছে না। ফলে নারী বাসসেবায় সরকারকে নিয়মিত দিতে হচ্ছে ভর্তুকি। বিআরটিসির একটি সূত্র জানিয়েছে, সারা দেশে নারী বাসসেবার বাসগুলো পরিচালনা করে প্রতিদিন অন্তত ৫০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তা ছাড়া গত বছর মাউশি রাজধানীর স্কুলবাস চালুর জন্য ফের আরেকটি উদ্যোগ নিয়েছিল। এর জন্য তিনটি রুট চূড়ান্তের পাশাপাশি বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বৈঠকও করা হয়েছিল। কিন্তু সে উদ্যোগও আলোর মুখ দেখেনি। এর কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, স্কুল চালুর প্রধান বাধা ক্লাস রুটিন। কারণ প্রতিটি স্কুলের কাল প্রায় একই সময়ে শুরু হয়। ফলে একজন যাত্রী বাসে করে এসে ক্লাস ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই যাত্রী পাওয়া নিয়ে সংকট দেখা দেয়। তাই রুটিন পরিবর্তনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রাজি না হওয়ায় এ উদ্যোগ সফল হয়নি।

মাউশির সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ আজাদ খান বলেন, রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে স্কুলবাস চালু করা যেতে পারে। পরিকল্পনামতো চালু করলে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব। তবে জেলা শহরগুলোতে চালু করতে গেলে নানা বেগ পেতে হতে পারে। কারণ যানজট, সরু রাস্তা, ট্রাফিক অব্যবস্থা, যাত্রীসহ নানা সংকট ভোগাতে পারে। তাই বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

মাউশির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন বলেন, ‘বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে কি না, সেটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।’

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com