বুধবার, ১১:৫০ পূর্বাহ্ন, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, [bangla_date] , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।
শিরোনাম :
১২০ কোটি টাকা মূল্যের ৮ প্লটের নথি গায়েব ট্রাম্পের নৈশভোজে সস্ত্রীক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রী, দেবেন নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ গৌরনদীতে প্রশাসনের কাছে চার মাদক বিক্রেতার আত্মসমর্পণ স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অঙ্গীকার  মেসির জন্য আর্জেন্টিনার বিশেষ জার্সি তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক, কী আলোচনা হলো ইরানে ফের হামলা নাকি শান্তিচুক্তি, ‘বড় সিদ্ধান্তের’ ইঙ্গিত ট্রাম্পের আগৈলঝাড়ায় অপরাধ দমনে ভূমিকার জন্য ৫ পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রেসক্লাবের সম্মাননা বেশি ভাড়া আদায় করা হলে রুট পারমিট বাতিল: সড়ক মন্ত্রী

১২০ কোটি টাকা মূল্যের ৮ প্লটের নথি গায়েব

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার পঠিত

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা আটটি প্লটের নথির খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিটি প্লটে রয়েছে বিভিন্ন উচ্চতা বা তলার ভবন। টাকার অঙ্কে একেকটি জমিসহ ভবনের মূল্য ১২ থেকে ১৫ কোটি। সেই হিসাবে প্রায় ১২০ কোটি টাকা মূল্যের জমির নথি গায়েব হয়েছে।

গৃহায়নের তথ্য অনুযায়ী, মিরপুরস্থ সেকশন-১২, ব্লক-বি, রোড-১১, প্লট নম্বর ২০১; সেকশন-১২, ব্লক-বি, রোড-১২, প্লট নম্বর ২২৩; সেকশন-১২, ব্লক-বি, রোড-৭, প্লট নম্বর ১১৫; সেকশন-১২, ব্লক-বি, রোড-৬-এর ৯৩ নম্বর প্লট; সেকশন-১২, ব্লক-সি, লেন ১৬-এর প্লট নম্বর ১৭; সেকশন-১০, ব্লক-সি, রোড-১৪-এর ৮/১ নম্বর প্লট; সেকশন-১০, ব্লক-সি, রোড-১৪-এর ৮/২ নম্বর প্লট; সেকশন-১২, ব্লক-ডি, লেন ২৫-এর ১৭ ও ১৯ নম্বর প্লটের নথি খুঁজে পাচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি। এ প্লটের মধ্যে সেকশন-১০, ব্লক-সি, রোড-১৪-এর ৮/১ নম্বর প্লটটি পুনর্বাসনের, বাকিগুলো বাণিজ্যিক প্লট।

প্লটগুলোর আয়তন তিন, চার ও পাঁচ কাঠার। এসব প্লটে বিভিন্ন তলার ভবন রয়েছে। কোনোটিতে ১০ তলা, কোনোটিতে ৯ তলা, আবার কোনো কোনো প্লটে তিন ও চারতলা ভবন রয়েছে।

কালবেলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ভেতরেই জালজালিয়াতি ও দুর্নীতির একটি চক্র রয়েছে। এর আগেও চক্রটি সেখান থেকে এমন বহু নথি গায়েব করেছে। এ ছাড়া নথিপত্র নকল করে একজনের জমি বা প্লট অন্যের কাছে বিক্রি করে দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এ চক্রের নিত্যনতুন অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বপ্রাপ্তরা অসহায়। নথি গায়েব ও জালজালিয়াতি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে অসাধু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালালদের চক্রটি। এসব ঘটনায় তদন্ত কমিটি হয়। কিন্তু জড়িতরা যথাযথ শাস্তি পায় না। যে কারণে থামছে না অনিয়ম। এতে একদিকে যেমন প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে, অন্যদিকে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন প্লট ও ফ্ল্যাট গ্রহীতারা।

প্রসঙ্গত, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। দেশের আবাসনহীন মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে জমি ও পরিকল্পিত আবাসন নিশ্চিত করাই এ সংস্থার কাজ। একটি স্থায়ী মাথা গোঁজার ঠাঁই গড়ার স্বপ্ন ও সরকারি সংস্থার প্রতি আস্থা রেখে অনেকেই জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ থেকে ফ্ল্যাট ও প্লট কিনেছেন। নিয়ম অনুযায়ী নথির মূল অংশ জমা থাকে সংস্থার কাছে। কিন্তু সংস্থাটির ভেতরের ওই চক্র সেই নথি গায়েব করে দিচ্ছে।

গৃহায়নের নথি বলছে, ২০২০ সালে এ প্লটগুলোর নথি তৎকালীন অফিস সহকারী মালেকিন নাছির রেকর্ডরুম থেকে নেন। এ প্লটের আমমোক্তার দলিলে মালিক হয়ে ডেভেলপার কোম্পানি জেএমআই বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে। নির্মাণকালের প্রথম দিকে এসব প্লটের নথি থাকলেও ভবন নির্মাণ শেষে ফ্ল্যাট বিক্রির অনুমোদন নিতে গেলে এসব প্লটের নথির খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান সংস্থাটির দায়িত্বপ্রাপ্তরা। বিষয়টি তদন্তে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি একটি তদন্ত কমিটি করে সংস্থাটি। ১২ ফেব্রুয়ারি গৃহায়নের ভূমি উইংয়ের অরক্ষিত বা খুঁজে না পাওয়া নথিগুলোর নতুন নথি বা অংশ নথি খোলার অনুমতি ডিজিটাল নম্বর প্রদানের বিষয়ে গঠিত কমিটির সভায় বলা হয় প্লটগুলোর মূল নথি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মূল নথিটি খুঁজে দেখতে তল্লাশি করার জন্য নোটিশ জারি করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট রেকর্ড কিপার জানান, প্লটের নথি ২০২০ সালের ৭ অক্টোবর তৎকালীন সহকারী মালেকিন নাছির রেকর্ডরুম থেকে নেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্লটের নথিটি রেকর্ডরুমে তল্লাশি করেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে গতিবিধি রেজিস্ট্রার অনুযায়ী ২০২০ সালের ৭ অক্টোবর নথিটি ইস্যু শাখায় এন্ট্রির জন্য আসে এবং একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর পত্র জারি করা হয়। এতে বলা হয়, খোঁজা অব্যাহত আছে, মূল নথি পাওয়া গেলে অত্র নথির সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে।

অভিযোগ আছে, হিসাব সহকারী হিসেবে নিয়োগ পান নাছির। কিন্তু তিনি কাজ করতেন ভূমি ও ল্যান্ড শাখায়। এ সুযোগে তিনি নথি গায়েব, নথি জালজালিয়াতি সিন্ডিকেটের একজন হয়ে যান। নানা অনিয়মের কারণে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ে। সেই অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে এখনো তদন্ত চলছে। চুক্তিতে কাজ করা, নথি জালজালিয়াতিসহ নানা অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত করছে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষও। এরই মধ্যে তাকে ঢাকা থেকে বদলি করা হয়।

কয়েক মাস আগে মিরপুরস্থ রূপনগর আবাসিক এলাকার রোড-১৯/২-এর ৯/১ নম্বর পুনর্বাসন প্লটের নথিটি জালজালিয়াতির মাধ্যমে সৃষ্টি করা হয়। এতে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম ও ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা সদস্য এসএম সোহরাব হোসেন, ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফকির মুহাম্মদ মুনাওয়ার হোসেনসহ বেশ কয়েকজনের স্বাক্ষর জাল করে নথি তৈরি করে আমমোক্তার দলিল গ্রহণ করে চিঠি জারি করা হয়।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পেশার মানুষ প্লট ও ফ্ল্যাট কিনেছেন। কেউ তার সারাজীবনের সঞ্চয় থেকে, কেউ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে, কেউ আবার পেনশনের টাকা দিয়ে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে প্লট কেনেন। রাতের আঁধারে সেই নথি গায়েব করে এমন মানুষগুলোকে সর্বস্বান্ত করে দিচ্ছে অসাধু চক্রটি। এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ হচ্ছে না।

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের দাবি, দেশের ৯০ শতাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠান ডিজিটালাইজেশন করা হলেও সরকারের এ সংস্থাটিকে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনা হয়নি। ডিজিটালাইজেশন না হওয়া বহু বছরের পুরোনো নথি গায়েব করা হচ্ছে বা জাল নথি তৈরি করা হচ্ছে এবং একজনের প্লট অন্যজনের নামে জালজালিয়াতির মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। বেশ কয়েকবার ডিজিটালাইজেশন করার উদ্যোগ নিয়ে প্রকল্প ও বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। আর এ সুযোগে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালালচক্র মিলে হরহামেশা নথি চুরি বা গায়েব করছে। এসব ঘটনায় তদন্ত কমিটি করা হলেও জড়িত ব্যক্তিরা উপযুক্ত শাস্তি না পাওয়ায় কোনোভাবেই থামছে না এ অনিয়ম। আর এতে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন প্লট ও ফ্ল্যাট গ্রহীতারা। একই সঙ্গে এসব ঘটনায় বিপাকে পড়ছে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ।

মিরপুর-২-এ একইভাবে জালজালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে এভি:২-এর প্লট নম্বর ১-এ রোকেয়া খাতুন নামে একজন ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে ভুয়া বাস্তব দখলের স্মারক উল্লেখ করা হয়। প্রকৃত মালিক করিমা খাতুন গং। কিন্তু জালিয়াতির আশ্রয়ে ভুয়া নথি তৈরি করে রোকেয়া খাতুনকে মালিক বানানো হয়েছে।

২ নম্বর সেকশন, ব্লক-এফের ২ নম্বর প্লটটিতে ‘ফৌজি আলী’র নামে বাস্তব দখল দেখানো হয়। অথচ ফৌজি আলী একই সেকশনের ২-এফ/ এভি-১-এর ২৩ নম্বর প্লটের বরাদ্দ গ্রহীতা। ২ নম্বর সেকশন অ্যাভিনিউ-২, ব্লক এফের ২ নম্বর প্লটটি ১৯৭৮ সালে শহিদুল্লাহ গংদের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।

তবে প্লটটি বুঝে না পাওয়ায় ১৯৮৪ সালে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ডিসিএসের সুপারিশে তাদের মিরপুর সেকশন ১২-বি/ ৫-১৬৯ নম্বর প্লটি (৪.৫ কাঠা) বিকল্প বরাদ্দ দেওয়া হলে এ প্লট খালি থাকার সুযোগে জালিয়াতি করে ‘ফৌজি আলী’ নামে প্লটটি বরাদ্দ দেখানো হয়।

এসব বিষয়ে নিয়ে একাধিক ভুক্তভোগী গৃহায়নে লিখিত অভিযোগ দেন। এর মধ্যে একজন ভুক্তভোগী ইসলামা বেগম। তিনি গৃহায়নে চলতি বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর একটি লিখিত আবেদনে বলেন, আমি মোসা. ইসলামা বেগম জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন মিরপুরস্থ সম্প্রসারিত রূপনগর আবাসিক এলাকা সেকশন-০৮, ব্লক-ক, এভিঃ/রাস্তা নম্বর ০৭, প্লট নম্বর-৩০, আয়তন কমবেশী ২.৫ কাঠা বরাদ্দপ্রাপ্ত হই। বরাদ্দপত্রের শর্তানুযায়ী প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ কিস্তির সমুদয় অর্থ পরিশোধ করি। গত ৪ মে আমার নামে বরাদ্দকৃত প্লটের বাস্তব দখল হস্তান্তরের জন্য আপনার দপ্তরে আবেদন করি। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আমাকে ব্যক্তিগত শুনানির জন্য পত্র দেওয়া হয়। গত ৬ জুলাই উপপরিচালক, ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার কাছে সশরীরে উপস্থিত হয়ে শুনানি প্রদান করি। কিন্তু দুই মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গেলেও বাস্তব দখলের বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছি যে, গৃহায়নের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে একটি অসাধু চক্র জালজালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া কাগজপত্র সৃজন করে দপ্তরের অনুমোদন নিয়ে আমার নামে বরাদ্দকৃত প্লট তাদের দখলে নিয়েছে। বরাদ্দকৃত প্লটের বরাদ্দের জন্য আবেদন হতে শুরু করে বরাদ্দ পর্যন্ত যাবতীয় কাগজপত্র পর্যালোচনা করে বরাদ্দকৃত প্লটের বাস্তব দখল হস্তান্তরের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আপনার সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম কালবেলাকে বলেন, নথি গায়েবের বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হচ্ছে। যিনি নথি রেকর্ডরুম থেকে গ্রহণ করেছেন, তাকে শোকজ করা হয়েছে। যারাই এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, তাদের খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযোগের বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অফিস সহকারী মালেকিন নাছির কালবেলাকে বলেন, ‘আটটি নথি রেকর্ডরুম থেকে আমি নিইনি। নথি গায়েবের বিষয়ে আমি জানি না। অফিস থেকে আমাকে শোকজ করেছে। আমাকে একটি নথির কথা বলা হয়েছিল এবং রেকর্ডরুম থেকে আনছিলাম, তা বুঝিয়ে দিয়েছি। আটটি নথি গায়েবের বিষয়টি ভিত্তিহীন।’

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com