শনিবার, ০৩:৪৪ অপরাহ্ন, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, [bangla_date] , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

নির্মম পৃষ্ঠপোষক

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার পঠিত
ধর্মের সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার সম্পর্কটা কেমন? কেউ কেউ বলতে চাইবেন যে দুয়ের মধ্যে কোনো সম্পর্কই নেই। সেটা ঠিক নয়।

ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই রয়েছে, তবে সুস্থ সম্পর্ক নয়। কেননা ধর্ম হচ্ছে আধ্যাত্মিক, সাম্প্রদায়িকতা সম্পূর্ণ বৈষয়িক। দুয়ের ক্ষেত্র তো অবশ্যই আলাদা, লক্ষ্যও ভিন্ন ভিন্ন। সাম্প্রদায়িকতা নষ্ট ছেলের মতোই উগ্র আচরণ করে, তবে যত তার আস্ফাালন সবটাই কিন্তু ধর্মের জোরে।
সাম্প্রদায়িকতা শুধু ধর্মীয় নয়, অন্য প্রকারেরও হতে পারে এবং হয়ে থাকে, কিন্তু কোনো সাম্প্রদায়িকতাই ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার মতো প্রবল নয়। কেননা তাদের কারো কাছেই ততটা পৈতৃক সম্পত্তি নেই, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার কাছে যতটা রয়েছে। ধর্ম মানুষের জন্য আশ্রয় বটে। বঞ্চিত মানুষ কার কাছে যাবে, কোথায় গিয়ে প্রার্থনা করবে, আশ্রয় খুঁজবে ধর্ম না থাকলে।
সাম্প্রদায়িকতাও আশ্রয় দেয় মানুষকে, যেমন বিভক্ত করে, তেমনি আবার ঐক্যবদ্ধও করে বটে এবং ঐক্যবদ্ধ মানুষ গৌরবও পায় ওই আশ্রয় পেয়ে গেলে।
রাষ্ট্রও বিভাজন পছন্দ করে। করে এই জন্য যে রাষ্ট্র স্বার্থ দেখে একাংশের, অপরাংশের নয়। কতকাল আগে আদর্শ রাষ্ট্রের একটি পরিকল্পনা দাঁড় করিয়েছিলেন প্লেটো। সেই পরিকল্পনায় শ্রেণিতে শ্রেণিতে পরিষ্কার বিভাজন ছিল।

শ্রমিকরা নির্মম পৃষ্ঠপোষকউৎপাদন করবেন, সৈনিকরা দেশ রক্ষা করবেন, আর দার্শনিকরা করবেন দেশ শাসন। নিচের লোক ওপরে উঠতে পারবে না। কখনো নয়। এ রকম একটি ব্যবস্থা কল্পনা করা সহজ ঠিকই, কিন্তু বাস্তবায়িত করা খুবই কঠিন। কেননা নিচের লোকেরা সব সময়ে মেনে নেয় না, অনেক সময়েই বিদ্রোহ করে। তখন দরকার পড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর। বস্তুত নিরাপত্তা বাহিনী দেশ রক্ষা যতটা না করে, তার চেয়ে অনেক বেশি করে শাসকশ্রেণির স্বার্থ রক্ষা। 

ভারতের প্রাচীন শাসকরা তাই একটি কাজ করলেন খুব ভালো তাঁদের দিক থেকে। শ্রেণিবিভাজনটাকে চিরস্থায়ী করে নিলেন সঙ্গে ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণবাদী ধর্মকে যোগ করে। সবকিছুই পূর্বজন্মের কর্মফল। তুমি যে নিম্নবর্ণের হয়েছ, তার কারণ পূর্বজন্মে তুমি পাপ করেছিলে। আর আমি যে ব্রাহ্মণ হয়ে জন্মেছি, তার কারণ এই যে পূর্বজন্মে আমি পুণ্য করেছিলাম। নিশ্চয়ই করেছিলাম, নইলে ব্রাহ্মণ হলাম কী করে? এই রকমের যুক্তি যখন দাঁড় করানো যায়, তখন আর সিপাহি-মন্ত্রীর আবশ্যকতা থাকে না, মানুষ আপনা থেকেই শ্রেণিবিভাজনটাকে মেনে নেয়। প্রতিবাদ করে না। অগোছালো রাষ্ট্র গোছালোভাবে শ্রেণিবিভাজনকে সাজিয়ে নিয়েছে।

ধর্মকে এভাবে শ্রেণিবিভাজনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারার পেছনে একটি বড় উপাদান ছিল। এই যে এ উপমহাদেশে ধর্মের জন্য ক্ষেত্র বেশ প্রশস্ত ও উর্বর ছিল। ভাষা, অন্যদিকে ভৌগোলিক মানুষকে রেখেছিল। খুব বেশি না করেও বস্তুগত সিদ্ধি লাভের সুযোগ মানুষকে উৎসাহিত করেছে আধ্যাত্মিক, অতীন্দ্রিয়বাদী ইত্যাদি হতে। রিজনের জন্য যে শ্রম করা আবশ্যক, সেটা না করে লোকে রিভিলেশনের ওপর আস্থা রাখাটা পছন্দ করেছে। জ্ঞান অতীন্দ্রিয় লোক থেকে বুঁদ করে পড়েছে, ইন্দ্রিয়লোকে তাকে অর্জন করতে হয়নি, যুক্তি ও পরিশ্রমের সাহায্যে।

শাসকরা তাই ধর্মকে সহজেই পেয়ে গেছেন ব্যবহারের অস্ত্র হিসেবে। আর্যরা পেয়েছে, মোগলরাও পেয়েছে। ধর্মের ব্যাপারে উদার যে সম্রাট আকবর, তিনিও যে ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন, তা বলা যাবে না। তিনিও ‘দ্বিন-ই-ইলাহি’ নামে একটি নতুন ধর্মমত চালু করতে চেয়েছিলেন সর্বধর্মের সমন্বয় ঘটিয়ে। পরবর্তীকালে আমাদের এই বাংলাদেশেও দেখেছি, ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে ইহজাগতিকতা না বুঝিয়ে আরো বেশি করে, স্বাধীনভাবে, ধর্মচর্চাকেই বোঝানো হয়েছে। ইহজাগতিকতাকে পুষ্ট করেনি, ধর্মবাদিকতাকেই বরং পুষ্ট করেছে। প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ হলো ধর্ম ও রাষ্ট্রকে পরস্পর থেকে আলাদা করে ফেলা, আর এখানেই থাকে ইহজাগতিকতার পক্ষে প্রসারের একটি চমৎকার সুযোগ ধর্মনিরপেক্ষতা।

উপমহাদেশে ধর্ম ও রাষ্ট্রকে বিচ্ছিন্ন করা সহজ হয়নি। প্রাক-ইংরেজ যুগে সমাজে এক ধরনের স্থবিরতা ছিল। তবু তার ভেতরও পুঁজিবাদী বিকাশের একটি সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছিল বৈকি। ইংরেজ আগমনে সেটি গেল নষ্ট হয়ে। স্থবিরতা ধর্মের আধিপত্য বিস্তারের পক্ষে সহায়ক, সব সময়েই। ওদিকে পুঁজিবাদী ইংরেজ ভারতবর্ষে এসে সামন্তবাদী মানসিকতাকে উৎসাহিত করতে থাকল। সেটি আরেক দিক। অপর এবং আরো গভীর দিকটি হলো, পরাধীনতা। মানুষের স্বাধীন বিকাশের পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়াল এই বৈদেশিক শাসন। পরনির্ভরতা, অদৃষ্টবাদ এবং সর্বোপরি আত্মসমর্পণের ঘটনা ঘটল এবং ঘটতে থাকল কিছুটা প্রকাশ্যে, অপ্রকাশ্যে আরো বেশি।

ইংরেজ অবশ্য তার ধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেনি। সাম্রাজ্যবাদের দ্বিতীয় ফ্রন্ট হিসেবে মিশনারিরা কাজ করবে ভেবেছিল, কিন্তু ১৮৫৭ সালের সিপাহি অভ্যুত্থানের পর থেকে ইংরেজ বুঝে নিল যে ধর্মের ব্যাপারে হাত দেওয়া বিপজ্জনক কাজ হবে। তার চেয়ে ভালো দেশি মানুষের ধর্মবোধকে সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে উৎসাহিত করা। সে জন্য তারা প্রাচ্যবিদ্যার প্রসার চাইল। ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে উৎসাহিত করল। পুঁজিবাদের স্বাধীন বিকাশের পথকে অবরুদ্ধ করে দিয়েই অবশ্য ভারতবর্ষের জন্য সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি করেছিল দীর্ঘস্থায়ী ইংরেজ শাসন। ওই অবরোধের উল্টো পিঠে শক্তিশালী হচ্ছিল সামন্তবাদ।

রাজনীতিতেও তার প্রবেশ ঘটেছে বৈকি। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইটা সামন্তবাদবিরোধিতার দায়িত্ব পালন করেনি। বরং দেখা গেছে, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে লড়াইটা নিজেই সামন্তবাদী চরিত্র ধারণ করেছে। দেশকে মাতার মতো ‘পূজা’ করা, ধর্মবাদী আন্দোলনে মা কালীকে অনুপ্রেরণাদায়িনী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা—এসব ঘটনা সামন্তবাদের প্রতি আনুগত্যের লক্ষণ বটে। এটা ঠিক যে সে মুহূর্তে প্রধান দ্বন্দ্ব সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গেই ছিল, সামন্তবাদের সঙ্গে নয়। কিন্তু ওটা আরো বেশি ঠিক যে সামন্তবাদবিরোধিতা পরিহার করে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামকে শক্তিশালী করা যায় না। আর যদি সাম্রাজ্যবাদকে একমাত্র শত্রু মনে করে সামন্তবাদকে মিত্রজ্ঞান করা হয়, তাহলে সামনে এগোনোর কোনো উপায়ই থাকে না, এগোতে গিয়েও পিছিয়ে আসতে হয়। ইংরেজ আমলে, বলা বাহুল্য, ওই ঘটনাই ঘটেছে। প্রবল ইংরেজবিরোধিতার অন্তরালে ধর্মীয় চেতনা শক্তিশালী হয়েছে। যে বুর্জোয়ারা স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করছিলেন, তাঁরা নিজেরা স্বাধীন ছিলেন না। রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হওয়ার প্রশ্নটা তো ওঠেই না, সাংস্কৃতিকভাবেও স্বাধীন ছিলেন না। তাঁরা আবদ্ধ ছিলেন সামন্তবাদী চিন্তা-চেতনায়। আরো যে ক্ষতির ঘটনা ঘটল, সেটা হলো সাম্প্রদায়িকতার বৃদ্ধি। উপমহাদেশের কৃষক নানা ঐতিহাসিক কারণে ধর্মভীরু ছিলেন বটে, কিন্তু সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোতে ধর্মীয় সহনশীলতা অত্যন্ত স্পষ্ট রূপেই লক্ষণীয় ছিল। স্বাধীনতার যে লড়াইয়ে হিন্দু-মুসলিমের একত্র লড়ার কথা, সেখানে তা ঘটল না। সামন্তবাদী ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও বক্তব্য এসে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রথমে বিচ্ছিন্নতার, পরে বিরোধের সৃষ্টি করল। সংখ্যালঘু মুসলমান সংখ্যাগুরু হিন্দুকে মিত্র হিসেবে না দেখে, শত্রু হিসেবে দেখতে শিখল। এবং ইংরেজের রাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে যে ভূমিকাটা তার নিজের পক্ষে নেওয়া স্বাভাবিক, সেটাই নিয়েছে। বিভেদকে উৎসাহিত করেছে শাসনের স্বার্থে। শেষ পর্যন্ত ওই রাষ্ট্র ভেঙে যে দুটি হলো এবং হওয়ার পরও কোনোটিতেই যে সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান হলো না, তার কারণ ইংরেজ আমলে সৃষ্ট ওই সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও বিরোধ।

আসল ভাগটা ছিল শ্রেণির সঙ্গে শ্রেণির। সেই ভাগাভাগিটাকে অস্পষ্ট ও আচ্ছাদিত করে রাখার কাজে ধর্ম খুবই সাহায্য করল সাম্প্রদায়িকতার মাধ্যমে। যে দ্বন্দ্বটা বাধার কথা ছিল শ্রেণিতে শ্রেণিতে, তা বাধল সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে। স্বাধীনতার অপর নাম হয়ে দাঁড়াল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com