পরিকল্পিত নগরায়ন ও আবাসন খাতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) তদারকির ঘাটতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম। ভবন নির্মাণে রাজউকের দুর্বল উপস্থিতির কথা তুলে ধরে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘পরিকল্পিত নগরায়ন বা আবাসন নিয়ে রাজউক কাজ করে। শুরু থেকেই এই সেক্টরের অবস্থা এমন। আমি কাউকে দোষারোপ করতে চাই না। হয়ত কোনো একসময় অনিয়ম বেশি হয়েছে। তবে ধারাবাহিকভাবেই আজকের এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, অনিয়মগুলো একা একা হয় না। আবাসন খাতের সংগঠন রিহ্যাব, ভবনের মালিক এবং রাজউকের পরিদর্শকদের ‘যৌথ প্রযোজনায়’ এসব অনিয়ম সংগঠিত হয়।’
আজ শনিবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে তফাজ্জ্ল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডুরা) আয়োজিত ‘ভূমিকম্প ঝুঁকিতে দেশ: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।
ডুয়ার সভাপতি শাহজাহান মোল্লার সভাপতিত্ব ও সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক মেহেদি হাসান আনসারি। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক মো. ছালেহ উদ্দিন, ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। এছাড়াও ছিলেন, রিহ্যাব ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মো. আব্দুর রাজ্জাক, ভূঁইয়া ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল।
রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, ‘যখন ভবন মালিকরা নকশাবহির্ভূত কাজ করেন, তখন পরিদর্শকরা টাকা নিয়ে মৌখিক সম্মতি দেন। কিন্তু লিখিত অনুমোদন পরিবর্তন করে দেন না। পরবর্তী সময়ে সেই ভবন মালিকরা আর ভবনের অকুপেন্সি সার্টিফিকেট বা ব্যবহারের অনুমতিপত্র পান না। যদি কেউ শতভাগ নকশা মেনে ভবন নির্মাণ করার পরও হয়রানির শিকার হন বা অকুপেন্সি সার্টিফিকেট না পান, তবে নির্দিষ্ট প্রমাণ নিয়ে আসুন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তাকে চাকরিচ্যুত করা হবে।’
তিনি বলেন, রেগুলেটরি ইস্যুতে রাজউকের দুর্বল উপস্থিতি রয়েছে। আমি বলব, অন্তত এই ‘দুর্বল উপস্থিতি’ দিয়ে যে কাজ শুরু করতে পেরেছি, এটাই আমার কাছে বিরাট এক অর্জন।একসময় শুধু আর্কিটেকচারাল প্ল্যান দিয়েই বিল্ডিং হয়ে যেত। ফায়ার সেফটি, ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল বা সিভিল স্ট্রাকচারাল ড্রয়িং লাগত না। এই পরিস্থিতিই তখন ছিল। কিন্তু এখন সেই ত্রুটিগুলো রিমুভ করার বা রেট্রোফিটিং করার দায়িত্ব আমাদের ওপর এসেছে।’
ভবন নির্মাণে নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, ‘প্ল্যান বা ডিজাইন তো আপনাদের এন্ড থেকেই আসে, রাজউক শুধু অনুমোদন দেয়। পৃথিবীর কোনো দেশে কি পুলিশিং করে বাড়িঘর তৈরি করা সম্ভব? একটা বিল্ডিংয়ের মিটার নিয়ে আমরা কী করব? এটা সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়। আমরা একটা গাইডলাইন দিতে পারি। কিন্তু তারা অবৈধভাবে পাশের বাড়ি থেকে মিটার আনে, অথবা মিটার হারিয়ে গেছে বলে জিডি করে নতুন মিটার আনে। এটা তো পাবলিক এন্ডের অবস্থা।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটা বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ কাটতে গেলে তারা আবার চুরি করে লাগায়, কোর্টে যায়। তাহলে একটা বাড়ির পেছনে কি আমাকে একজন করে ইন্সপেক্টর লাগিয়ে রাখতে হবে? এত লক্ষ ইন্সপেক্টর আমি কোথায় পাব? এই চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হচ্ছে।’
অন্যদিকে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আবাসন প্রকল্প গড়ে ওঠার সমালোচনা করে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘দুর্বল মাটির ওপর ইঞ্জিনিয়ারিং প্রয়োগ করে যতই সবল ভবন বানানো হোক না কেন, ৭ মাত্রার ভূমিকম্প লাগবে না, সাড়ে ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হলেই সেগুলো চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রকে শুধু পরিদর্শন বা অভিযোগ দায়েরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; রাষ্ট্রের এনফোর্সমেন্ট বা প্রয়োগ ক্ষমতাকে এমন শক্তিশালী জায়গায় নিতে হবে, যেন কোনো দুর্বৃত্ত দুর্বল মাটির ওপর ভবন নির্মাণ বা প্রকল্প নেওয়ার সাহসই না পায়।’
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন— সহসভাপতি জিলানী মিলটন, সাংগঠনিক সম্পদক আতিক হাসান শুভ, ডুরা সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়শ্রী ভাদুড়ী, অর্থ সম্পাদক জাহিদ ইসলাম, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মিরাজ মাহবুব ইফতি প্রমুখ।