দেশে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা যেমন ঊর্ধ্বমুখী, তেমনি লোডশেডিংও বাড়ছে। বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যবস্থার একটি সুস্পষ্ট চিত্র বলছেÑ শহরাঞ্চলকে তুলনামূলকভাবে স্বস্তিতে রাখতে গিয়ে গ্রামীণ এলাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়ে গেছে। বিগত দিনের সরকারের মতোই এবারও রাজধানী এবং আশপাশের শহরগুলোকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে কোথাও কোথাও দিনে ও রাতে মিলিয়ে ৮ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও স্থানীয় বিতরণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ সংকট থাকায় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ বণ্টন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ‘লোড ম্যানেজমেন্ট’ বা রোটেশনভিত্তিক লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এ প্রক্রিয়ায় শিল্পাঞ্চল, গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো এবং শহরের আবাসিক এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, আর তার প্রভাব সরাসরি পড়ছে গ্রামীণ জনপদে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে কয়েক হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি পূরণে গ্যাস, কয়লা ও আমদানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানো হলেও জ্বালানি সংকট ও সরবরাহ অনিশ্চয়তার কারণে কাক্সিক্ষত উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠানামা এবং কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া পরিশোধজনিত জটিলতা।
চলতি বছর গ্রীষ্মে সরকার বিদ্যুতের চাহিদা নির্ধারণ করেছে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। গতকাল বিকাল পর্যন্ত পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যানুযায়ী ১৫ হাজার ৬৯০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ১০৭ মেগাওয়াট। পিজিসিবি বলছে, এ সময় লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৪৬৭ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উৎপাদনের চিত্র থেকে দেখা যায়, এ সময় সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পাঁচ হাজার ৭ মেগাওয়াট, কয়লা থেকে ৪ হাজার ৫৩৭ মেগাওয়াট, ভারত থেকে আলাদা আলাদা চুক্তি আওতায় এক হাজার ৮৯১ মেগাওয়াট, আদানি থেকে এসেছে ৭৭৩ মেগাওয়াট, ত্রিপুরা থেকে ১৯৬ মেগাওয়াট, ভেড়ামারা থেকে ৯২২ মেগাওয়াট। তবে সরকারের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যে মানুষের আস্থা কম। সাধারণ মানুষের ধারণা, সরকার উৎপাদন ক্ষমতার কাছাকাছি চাহিদা নির্ধারণ করে, যেন লোডশেডিং অনেক বেশি প্রকাশ না পায়।
প্রতি বছর এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাস দেশে সবচেয়ে বেশি গরম থাকে। এ সময় বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে। তবে চলতি বছর বেশি উদ্বেগের কারণ ইরান যুদ্ধের প্রভাব। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন কারণে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। বৃষ্টি না হলে অথবা তাপমাত্রা না কমলে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সরকার জ¦ালানি আমদানিতে ব্যাপক চাপে পড়ে। একদিকে জ¦ালানির স্বাভাবিক জোগান বাধাগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে অব্যাহত দাম বৃদ্ধির কারণে আর্থিক চাপে পড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে সাশ্রয়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। তবে এ পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়েছে এ নিয়ে প্রশ্ন আছে।
এদিকে বিগত সময়ের বকেয়া আদায়ে সরকারকে চাপ দিচ্ছে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকরা। একইসঙ্গে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আদানি তাদের পুরনো পাওনা পরিশোধে তাগিদ দিয়ে পিডিবিকে চিঠি দিয়েছে। সময়মতো বকেয়া পরিশোধ করা না হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হতে পারে বলে জানিয়েছে তারা।
লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হতে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদ্যুতের লোডশেডিং আর শিল্প কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল অকটেন পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে অনেক শিল্প কারখানা সময়মতো ক্রেতাদের পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ করতে পারবে না, যা দেশের আর্থিক অগ্রগতি থামিয়ে দিতে পারে।
নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমাদের সময়কে বলেন, আমরা সরকারের মন্ত্রী, বিপিসির চেয়ারম্যান এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে বলেছি, যেন শিল্প কারখানায় বিদ্যুৎ, গ্যাস বা প্রয়োজনীয় জ¦ালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হয়।