সোমবার, ১২:৩৪ অপরাহ্ন, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

দ্বিতীয় দফা বৈঠকের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত পাকিস্তান

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১ বার পঠিত

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার আবহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনাকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন করে জোরদার হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদকে ঘিরে নিরাপত্তা, সামরিক প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে আলোচনাটি এখন বৈশ্বিক মনোযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার আলোচনায় অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা সোমবার ইসলামাবাদে পৌঁছাবেন। তবে শেষ মুহূর্তে বড় পরিবর্তন এসেছে প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে পাকিস্তান সফর বাতিল করেছেন। এবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘শুধু নিরাপত্তার কারণেই জেডি এই সফরে যাচ্ছে না,’ যদিও তিনি ভ্যান্সকে ‘অত্যন্ত দক্ষ’ বলে উল্লেখ করেন।

এর আগে জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন দূত মাইক ওয়াল্টজ এবং জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, ভ্যান্সই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন। এখনও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কে এই আলোচনায় নেতৃত্ব দেবেন, তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে ট্রাম্প ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনার আলোচনায় অংশ নিতে পারেন।

ইসলামাবাদে সম্ভাব্য এই বৈঠককে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, রাওয়ালপিন্ডির নূর খান বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর দুটি সি-১৭ গ্লোবমাস্টার কার্গো বিমান অবতরণ করেছে। একই সঙ্গে রাজধানীর ‘রেড জোন’-এ যাওয়ার পথগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। শহরের অভিজাত সেরেনা ও ম্যারিয়ট হোটেল থেকে অতিথিদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং নতুন বুকিংও বন্ধ রাখা হয়েছেÑযা উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের প্রস্তুতিরই ইঙ্গিত দেয়।

গত ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রথম দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রায় ২১ ঘণ্টার সেই বৈঠক কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। এর পর দুই দেশের মধ্যে দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও তা শিগগিরই শেষ হতে যাচ্ছে। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই দ্বিতীয় দফার আলোচনা আয়োজনের চেষ্টা চলছে।

তবে এই আলোচনার পথ মোটেই মসৃণ নয়। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ জানিয়েছেন, নতুন বৈঠকের আগে ‘সমঝোতার রূপরেখা’ চূড়ান্ত করা জরুরি। তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত দাবি তুলছে। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ইরান কোনো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাবে না এবং এ বিষয়ে আলোচনারও সুযোগ নেই।

অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করে বলেন, ইরানের পারমাণবিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার কোনো অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের নেই। একই সঙ্গে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ‘তিক্ত পরাজয়’ উপহার দিতে তাদের নৌবাহিনী প্রস্তুত।

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক উত্তেজনা। ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে সেখানে গুলি চালিয়েছে এবং ফরাসি ও ব্রিটিশ জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এর জবাবে তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, শান্তি চুক্তি না হলে ইরানের প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

ইরান অবশ্য পাল্টা দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রই তাদের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার না করায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, এখন থেকে কোনো জাহাজ চলাচলের বিশেষ করিডর বা ফি-ভিত্তিক ব্যবস্থাও থাকবে না। ইতোমধ্যে দুটি তেলবাহী ট্যাংকারকে পিছু হটতে বাধ্য করা হয়েছে এবং একাধিক জাহাজে গুলি চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ভারতীয় জাহাজে হামলার অভিযোগে দিল্লি তেহরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইরানসংশ্লিষ্ট জাহাজ তল্লাশি ও জব্দের প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন বাহিনী। ফলে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিও কঠোর হচ্ছে ইরানে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে দুই বিদেশিসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলসংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে স্টারলিংকের মতো স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সরঞ্জাম আমদানির অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে আরও বিস্তৃত এলাকায়। ইয়েমেনের হুতি সরকার বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধের হুশিয়ারি দিয়েছে। একই সঙ্গে লেবাননে সংঘাতে ইসরায়েলি সেনা হতাহতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। ইসরায়েলের অভ্যন্তরেও প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে হাজারো মানুষের বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া রাফায়েল পিনাইনা বলেন, নেতানিয়াহু ভেতর থেকে আমাদের সমাজকে ধ্বংস করছেন এবং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক নষ্ট করছেন। তাই তিনি এ প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। লি হফম্যান-আজিভ নামের এক সমাজকর্মী বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি মূলত ৭ অক্টোবর এবং এর পর থেকে প্রধানমন্ত্রীর শুরু করা অন্তহীন যুদ্ধে যারা প্রিয়জন হারিয়েছেন, তাদের পরিবারের প্রতি সমর্থন জানাতে।’

ইসলামাবাদে সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা শুধু দুই দেশের সম্পর্ক নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে পারস্পরিক অবিশ্বাস, সামরিক হুমকি এবং চলমান উত্তেজনার মধ্যে এই আলোচনার সফলতা এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com