লাল-সবুজ-হলুদ বাতির পর এবার রাজধানীর ট্রাফিক সিস্টেমে যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। মোটরযান আইন লঙ্ঘনকারী গাড়ি শনাক্ত করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংবলিত ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। এর মাধ্যমে আইন লঙ্ঘনকারী যানবাহন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করার পর সংশ্লিষ্ট গাড়ির বিরুদ্ধে অপরাধের মাত্রানুযায়ী মামলা করতে পারবে ট্রাফিক পুলিশ। এ জন্য রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংয়ে বসানো হচ্ছে এআই সফটওয়্যার-যুক্ত ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। ইতোমধ্যে কয়েকটি ক্রসিংয়ে এ ধরনের ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করার ফলে পরিবহন চালকরা সচেতন হবে, আইন ভাঙার প্রবণতা কমবে এবং ট্রাফিক পুলিশের কষ্ট লাঘব হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, যেসব যানবাহন সিগন্যাল লঙ্ঘন করবে, উল্টা পথে আসবে, জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর দাঁড়িয়ে চলাচলের বাধা সৃষ্টি করবে, ক্রসিংয়ে যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করবে কিংবা লেন আটকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেÑ সেসব গাড়িকে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করবে সিসি ক্যামেরা। পরে ফুটেজসহ এ তথ্য ট্রাফিক পুলিশের সার্ভার বা কন্ট্রোল রুমে চলে আসবে। তখন অপরাধের মাত্রানুযায়ী সংশ্লিষ্ট গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা করবে ট্রাফিক পুলিশ। ফলে আইন লঙ্ঘন করে গাড়ি চলে গেলেও মামলা থেকে রক্ষা পাবে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে রাজধানীর ২৫টি ইন্টারসেকশন বা ক্রসিংয়ে এআই সফটওয়্যার-সংবলিত ক্যামেরা বসানো হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে তা রাজধানীর অন্যান্য পয়েন্টেও স্থাপন করা হবে। ট্রাফিক আইন অমান্যকারী যানবাহন খুব সহজে শনাক্ত করা যাবে, যানবাহনটি কোন শ্রেণির, যানবাহনটি কোন দিকে যাচ্ছে, যানবাহনটির গতির মাত্রাসহ অন্যান্য তথ্য সহজেই জানা যাবে এই অত্যাধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজার মামলা করে থাকে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায়। নতুন এই পদ্ধতি চালু হলে মামলার সংখ্যা বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২৪ সালে প্রাথমিকভাবে ঢাকার গুলশান-২ সিগন্যালে পরীক্ষামূলকভাবে এআই পদ্ধতি চালু করা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সিগন্যাল মেইনটেন্যান্স সরঞ্জাম, সিসি ক্যামেরা, ইমেজ ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা ও অন্য সরঞ্জামাদি দিয়ে এই সিস্টেম চালু করা হয়। পরীক্ষামূলক কাজটি করেছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সিগন্যাল বাতির পোলসমূহে উন্নত মানের সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে। এগুলোর মাধ্যমে লাল বাতি অমান্য, উলটো পথে গাড়ি চালানো, ক্রসিংয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো, সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, বাম লেন আটকে রাখা এবং অবৈধভাবে পথচারী পারাপারের বিরুদ্ধে শিগগিরই ডিজিটাল মামলা দায়ের শুরু হবে।
ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, নগরীতে চলাচলরত যানবাহনগুলোকে শৃঙ্খলায় আনতে তাদের নানামুখী কার্যক্রম চলমান রয়েছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংগুলোতে ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট কার্যকর করে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। যানজট নিরসনে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় থাকা অবৈধ বাস কাউন্টারগুলো সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মানুষের চলাচল যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, এ জন্য ফুটপাতে বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে।
সূত্র জানায়, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল যাতায়াত নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে যানবাহন চালকদের প্রতি একগুচ্ছ
নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে। এর মধ্যে রয়েছে, ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট মেনে চলা, রাস্তার প্রতিটি ক্রসিংয়ে ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট (লাল-সবুজ-হলুদ) যথাযথভাবে অনুসরণ, লাল বাতি লঙ্ঘন না করা; সিগন্যালে লাল বাতি জ্বলাকালীন কোনোভাবেই গাড়ি চালানোর চেষ্টা না করা, স্টপ লাইন মেনে চলা; লাল বাতির সিগন্যালে থামার সময় অবশ্যই নির্ধারিত স্টপ লাইন বা জেব্রা ক্রসিংয়ের পূর্বে গাড়ি থামানো, উল্টো পথে গাড়ি না চালানো; কোনো অবস্থাতেই বিশেষ করে ক্রসিংগুলোতে উল্টো পথে যানবাহন না চালানো, বাম লেনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি; সোজা বা ডানে যাবে এমন যানবাহন কোনো অবস্থাতেই ক্রসিংসংলগ্ন বাম লেনে দাঁড়িয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করা এবং মোড়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করা; রাস্তার ক্রসিং বা মোড়গুলোতে গাড়ি দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা না করা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে পথচারীরা যদি জেব্রা ক্রসিং বা ফুটওভার ব্রিজ ছাড়া যত্রতত্র রাস্তা পারাপার হন অথবা পেডেস্ট্রিয়ান সিগন্যাল লাইটের লাল বাতি অমান্য করেন, তবে ঘটনাস্থলেই বিশেষ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে কারাদণ্ড বা জরিমানা করা হবে। পাশাপাশি সিসি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণ করে সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী ভিডিও প্রসিকিউশন দায়ের করা হবে।
ঢাকায় সিগন্যাল লাইট স্থাপন করা এলাকাগুলো হলোÑ হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ক্রসিং, বাংলামোটর ক্রসিং, হোটেল সোনারগাঁও ক্রসিং, ফার্মগেট পুলিশ বক্স ক্রসিং, বিজয় সরণি ক্রসিং, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ক্রসিং, জাহাঙ্গীর গেট ক্রসিং, গুলশান-২ ক্রসিং ও গুলশান-১ ক্রসিং, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পশ্চিম প্রান্ত (আড়ং ক্রসিং), খেজুরবাগান ক্রসিং, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর ক্রসিং, মাজার রোড ক্রসিং, আবুল হোটেল ক্রসিং, মৌচাক ক্রসিং, রায়সাহেব বাজার মোড় ক্রসিং ও লাভ রোড ক্রসিংয়ে অস্থায়ীভাবে ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট স্থাপন করা হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আরও ৬টি ক্রসিংয়ে অর্থাৎ হাইকোর্ট ক্রসিং, কদম ফোয়ারা ক্রসিং, মৎস্য ভবন ক্রসিং, কাকরাইল মসজিদ ক্রসিং, পুলিশ ভবন ক্রসিং ও শাহবাগ ক্রসিংয়ে ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট স্থাপন করেছে, যা শিগগিরই চালু হবে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংয়েও সিগন্যাল লাইট স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া পথচারীদের নিরাপদে পারাপারের উদ্দেশ্যে ডিএমপি রাজধানীর পুরাতন রমনা থানা ক্রসিং (শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সরণি), রমনা পার্কের অরুনিমা গেটের সম্মুখে (হেয়ার রোড), মিরপুর কলেজ/ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের সম্মুখে (মিরপুর রোড), গাবতলী পুলিশ বক্সের সম্মুখে (আমিনবাজার ব্রিজের পূর্বে), রামপুরা ট্রাফিক পুলিশ বক্স ক্রসিং (প্রগতি সরণি) ও কোহিনুর কেমিক্যাল কোম্পানির সম্মুখে (শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণি) সড়কের জেব্রা ক্রসিংয়ে সেফ পেডেস্ট্রিয়ান সিগন্যাল লাইট স্থাপন করেছে।
ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও আইন না মানার প্রবণতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। নতুন এআইভিত্তিক ব্যবস্থা সেই সমস্যাগুলো সমাধানে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ, প্রযুক্তির রক্ষণাবেক্ষণ, ডেটা ব্যবস্থাপনা এবং আইনি প্রক্রিয়ার দ্রুততা এসব বিষয় সঠিকভাবে নিশ্চিত করা না গেলে এ উদ্যোগের কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনা।