জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ বাড়ায় দেশটির দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ইঙ্গিত বলে মনে করছেন কূটনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্টের একটি প্রতিবেদন ও রাজনৈতিক মহলে ‘গোপন আঁতাত’ এর আলোচনার প্রেক্ষিতে এ মত দিচ্ছেন তারা।
তাদের পর্যবেক্ষণ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জামায়াত এখন যুক্তরাষ্ট্রের আস্থাভাজন হিসেবে দেখা দিয়েছে, যার পেছনে দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্কিত ওয়াশিংটনের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ কাজ করছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মাঠে এখন আছেই বিএনপি ও জামায়াত। তাই এসব দেশের কাছে জামায়াতের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। জামায়াত প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে তারা একটি আধুনিক ইসলামী রাজনৈতিক দল। যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতকে নিয়ে আগের ধারণা বদলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক আগ্রহ বাড়ছে। বঙ্গোপসাগরভিত্তিক ‘ব্লু ইকোনমি’, আন্তর্জাতিক শিপিং রুট, সম্পদ ও নিরাপত্তা বিবেচনায় বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। আরাকান ও মিয়ানমার সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতার সম্ভাবনা এই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের নজর বাড়িয়েছে। ফলে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ একটি কৌশলগত প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখানে নির্বাচন প্রভাবিত করবে বা কারও সঙ্গে গোপন আঁতাত করবে, এটা রাজনৈতিক বক্তব্য। আগে দেশটি ইসলামের নাম শুনলে লাফ দিত, এখন সেটি নেই। জামায়াত যেহেতু এখন দেশের আইন মেনে কাজ করছে, সুতরাং দলটি সম্পর্কে তাদের কোন সন্দেহ নেই।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘গোপন আঁতাত’ এর অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, জামায়াতের নীতি হচ্ছে গণতন্ত্রকামী সব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। আমাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আছে। উভয় দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করব এটাই স্বাভাবিক।
গত ২২ জানুয়ারি ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, একজন মার্কিন কূটনীতিকের মতে, বাংলাদেশ আরো বেশি ইসলামমুখী হয়ে উঠছে এবং জামায়াতে ইসলামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো ফল করবে। ওই কূটনীতিক বলেন, আমরা চাই তারা (জামায়াত) আমাদের বন্ধু হোক।
এ প্রতিবেদনের পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জামায়াতের সঙ্গে আমেরিকার আঁতাত দেশের জন্য ভালো নয়। অন্যদিকে, জামায়াতের সংসদ সদস্য প্রার্থী সুলতান আহমেদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় না পৃথিবীর কোথাও ইসলামী দল ক্ষমতায় আসুক। তারাও এবার চাইছে বাংলাদেশে ক্ষমতায় বদল আসুক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাব্বির আহমদ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র দেখছে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দলটি আমেরিকার ইন্টারেস্ট বাদ দিয়ে শুধু ভারতের ইন্টারেস্ট দেখবে কি না। বিএনপি মহাসচিবের মন্তব্যে নির্বাচনকে সামনে রেখে হয়তো ভারতকে খুশি করার চেষ্টা থাকতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান মন্তব্য করেন, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জটিলতার মধ্যে জামায়াতের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাচ্ছে। যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও চ্যালেঞ্জিং করতে পারে। ভারত জামায়াতকে পাকিস্তানের মিত্র ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে দেখে।
বিশ্লেষকদের মূল্যায়নে, জামায়াতকে পশ্চিমারা এখন আর আগের মতো মৌলবাদী দল মনে করছে না। দলটিও শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার কট্টর অবস্থান থেকে সরে এসে দেশের প্রচলিত আইনে সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। গত আগস্টের পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত থাকায় এবারের নির্বাচনে মূলত বিএনপি জোটের সঙ্গে জামায়াতের জোটের জোর প্রতিযোগিতা হবে মনে করা হচ্ছে।