মঙ্গলবার, ১০:৩৩ পূর্বাহ্ন, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কী, টুথপেস্টের মাধ্যমে কীভাবে শরীরে প্রবেশ করে?

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার পঠিত

বেসরকারি পরিবেশবাদী গবেষণা সংস্থা ‘এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন’ (ইএসডিও) সম্প্রতি দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া টুথপেস্টের ওপর গবেষণা চালিয়েছে। এতে উঠে এসেছে, বাজারের ৭৬.৫ শতাংশ টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে, যা মানুষের প্রতিদিনের ব্যবহারের মাধ্যমে সরাসরি শরীরে প্রবেশ করছে।

এমন তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই নতুন দেশজুড়ে নতুন এক আতঙ্কের নাম ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’। প্রশ্ন উঠেছে ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ কী, কীভাবে তা শরীরে প্রবেশ করে; টুথপেস্টেই বা কীভাবে আসে প্লাস্টিকের এই ক্ষুদ্র কণা?

‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ হলো প্লাস্টিকের অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণা যার আকার সাধারণত ৫ মিলিমিটারের (০.২ ইঞ্চি) চেয়ে কম হয়ে থাকে। এগুলো খালি চোখে সহজে দেখা যায় না এবং পরিবেশ ও মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

উৎস অনুযায়ী মাইক্রোপ্লাস্টিককে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হচ্ছে প্রাথমিক মাইক্রোপ্লাস্টিক, যা বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্য এবং ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ইচ্ছে করেই আকারে ছোট করে তৈরি করা হয়। অপরটি হচ্ছে মাধ্যমিক মাইক্রোপ্লাস্টিক, যা পরিবেশে থাকা বড় প্লাস্টিক বর্জ্য ভেঙে বা ক্ষয় হয়ে এই ক্ষুদ্র কণাগুলোর সৃষ্টি হয়।

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক মূলত দুটি কারণে আসে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ইচ্ছাকৃত ব্যবহার এবং পণ্যের ওজন কম খরচে বাড়ানোর প্রবণতা। এগুলো প্রধানত স্ক্রাবিং বা দাঁত পরিষ্কার করার পলিশিং এজেন্ট, গঠন উন্নত করা এবং জেলটিকে আকর্ষণীয় রঙের ও স্থিতিশীল করার জন্য যোগ করা হয়।

২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি সায়েন্টিফিক রিভিউতে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন বাণিজ্যিক টুথপেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবেই ‘মাইক্রোবিডস’ বা মাইক্রোপ্লাস্টিক যোগ করা হয়।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটের (বিএসটিআই) উপ-পরিচালক মনজুরুল করিম বলেন, টুথপেস্ট তৈরির স্ট্যান্ডার্ড ও প্রয়োজনীয়তার ওপর ভিত্তি করে অনুমোদিত ৪০টি উপাদানের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তবে এই তালিকায় এখনো মাইক্রোপ্লাস্টিক অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

কিন্তু ইএসডিওর এই গবেষণায় পরীক্ষা করা মোট ৩৪টি নমুনার মধ্যে ২৬টি টুথপেস্টেই (অর্থাৎ ৭৬.৫ শতাংশ নমুনায়) মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি মিলেছে।

জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও তাদের পরিবেশ ও ওরাল কেয়ার গাইডে ‘শূন্য প্লাস্টিক উপাদান’ নীতির কথা জানিয়েছে। এই সংস্থাগুলোর অবস্থান হলো, যেসব পণ্য সরাসরি মানুষের মুখ ও খাদ্যচক্রের সংস্পর্শে আসে, সেখানে সিন্থেটিক নন-বায়োডিগ্রেডেবল পলিমারের নিরাপদ মাত্রা বলে কিছু নেই; এর স্বাভাবিক মান কেবলই শূন্য।

গবেষণায় দেখা গেছে, টুথপেস্টের উপাদানগুলোর মধ্যে পলিমার (যেমন- পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন বা পিইটি) কণাগুলো সমানভাবে মিশ্রিত থাকে। এগুলো দাঁতের এনামেল স্ক্রাব করে ময়লা দূর করতে এবং পেস্টের ঘনত্ব ঠিক রাখার থিকনার হিসেবে ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের সময়ই যুক্ত করা হয়।

টুথপেস্টের ভেতরে থাকা প্লাস্টিকের গঠনগুলো কোনো বাহ্যিক দূষণ নয়, বরং এগুলো সুনির্দিষ্ট আকারের (যেমন ৩০ থেকে ৪০০ মাইক্রোমিটার) ম্যানুফ্যাকচার্ড ফ্র্যাগমেন্ট। কম খরচে পণ্যের ওজন ও স্থায়িত্ব বাড়াতে কিছু কোম্পানি এই অনাকাঙ্ক্ষিত কৌশল ব্যবহার করে।

ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল হেলথ রিসার্চের ২০২৫ সালে প্রকাশিত গবেষণাপত্র অনুযায়ী, বাজারে প্রাপ্ত সাধারণ টুথপেস্টগুলোর ল্যাব টেস্টে মূলত ৪ ধরনের প্লাস্টিক পলিমার বেশি পাওয়া যায়। এগুলো হলো: পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পলিইথিলিন টেরেফথালেট ও পলিমিথাইল মিথাক্রাইলেট।

এই চার উপাদানের মধ্যে পলিইথিলিন, যা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাইক্রোবিডস। পলিপ্রোপিলিন, যা টুথপেস্টের স্থায়িত্ব বাড়ানোর প্লাস্টিক। পলিইথিলিন টেরেফথালেট, যা উজ্জ্বল ভিজ্যুয়াল বা ঝিলমিলে কণা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া পলিমিথাইল মিথাক্রাইলেট জেলের ঘনত্ব বাড়ানোর কৃত্রিম উপাদান।

মাইক্রোপ্লাস্টিক মূলত ৩টি প্রধান পথে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। খাদ্য ও পানীয় গ্রহণের মাধ্যমে, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে এবং ত্বকের সরাসরি সংস্পর্শে। এই অতিক্ষুদ্র কণাগুলো পরিবেশের সবখানে ছড়িয়ে থাকায় আমরা অজান্তেই প্রতিদিন এগুলো শরীরে গ্রহণ করছি।

টুথপেস্ট ব্যবহারের সময় প্রতিদিন মানুষ অজান্তেই প্লাস্টিক কণা গিলে ফেলে, যা সরাসরি পাকস্থলী ও অন্ত্রে প্রবেশ করে। এটি বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি ঘটে, কারণ তারা পেস্ট সহজে থুতু দিয়ে ফেলতে পারে না।

এছাড়া অ্যানালস অব গ্লোবাল হেলথ জার্নালে ২০২৫ সালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, টুথপেস্টের এই মাইক্রোবিডসগুলো ব্রাশ করার সময় দাঁতের ফাঁকে এবং মাড়ির ভেতরের অংশে আটকে থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে মাড়িতে অনবরত যান্ত্রিক জ্বালাপোড়া ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটায়।

গবেষণা বলছে, প্লাস্টিক কণাগুলো মুখের নরম টিস্যু এবং গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল মিউকোসার মাধ্যমে সরাসরি শরীরে শোষিত হয়ে কোষের ক্ষতি বা অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি করে।

ইএসডিওর গবেষণায়ও দেখা গেছে, ব্রাশ করার সময় মুখের ভেতরের নরম শ্লেষ্মা ঝিল্লি দিয়ে এই অতিসূক্ষ্ম কণা সরাসরি রক্তে প্রবেশ করতে পারে। পরবর্তীতে প্লাস্টিকে থাকা রাসায়নিক উপাদান শরীরের হরমোন নিঃসরণে বাধা দেয় এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে জমা হয়ে কোষের ক্ষতি করে।

পরিশেষে বলা যায়, দৈনিক ব্যবহৃত টুথপেস্টের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করা একটি নীরব কিন্তু মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি, যা থেকে বাঁচতে এখনই ভোক্তাদের সচেতনতা ও আইনি সংস্কার প্রয়োজন। যেহেতু চিকিৎসাবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক নীতিমালায় টুথপেস্টে প্লাস্টিক কণার আদর্শ বা স্বাভাবিক মাত্রা ‘০’ (শূন্য) নির্ধারণ করা হয়েছে, তাই দাঁত পরিষ্কারের কাজে ক্ষতিকর পলিইথিলিন বা পলিমারের পরিবর্তে নিরাপদ প্রাকৃতিক খনিজ ব্যবহার করাই একমাত্র বৈজ্ঞানিক উপায়।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com