বৃহস্পতিবার, ১২:৩০ অপরাহ্ন, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

সংলাপে সমাধান খুঁজছেন দিশাহীন ট্রাম্প

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫ বার পঠিত

সংলাপের টেবিলে সমাধান খুঁজতে চাইলেও কৌশলগত দিক থেকে ক্রমেই দিশাহীন হয়ে পড়ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একদিকে ইরানের ওপর কঠোর নৌ-অবরোধ ও সামরিক চাপ বজায় রাখা, অন্যদিকে হঠাৎ করেই আলোচনার সম্ভাবনার কথা বলাÑ এই দ্বৈত অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যুদ্ধ শেষের পথে বলে দাবি করলেও বাস্তবে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত, যেখানে ইরানের পাল্টা হুমকি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা নতুন এক বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকলে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের পাশাপাশি লোহিত সাগরের বাণিজ্য পথও বন্ধ করে দেওয়ার হুশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে দেশটির সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টারের প্রধান আলী আবদোল্লাহি বলেন, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্রের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর এবং লোহিত সাগর দিয়ে কোনো ধরনের আমদানি-রপ্তানি চলতে দেবে না।’ তিনি মার্কিন নৌ অবরোধকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইরান ‘চূড়ান্ত পদক্ষেপ’ নিতে প্রস্তুত।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ইরানের সমুদ্রপথে প্রায় সব ধরনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেন, অবরোধ শুরুর ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের ভেতরে ও বাইরে সমুদ্রপথে বাণিজ্য কার্যত স্থবির করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনী

ইতোমধ্যে অন্তত আটটি ইরানি তেলবাহী জাহাজকে ফেরত পাঠিয়েছে বলেও জানা গেছে।

তবে এই অবরোধ উপেক্ষা করে একটি ইরানি সুপার ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে ইমাম খোমেনি বন্দরের দিকে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে ইউরোপ-এশিয়া বাণিজ্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

এদিকে উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক যোগাযোগ বন্ধ হয়নি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই জানিয়েছেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বার্তা বিনিময় অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং দেশটির প্রয়োজন অনুযায়ী ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাওয়ার অধিকার রয়েছে, যদিও এ বিষয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান যুদ্ধ নয়, বরং আলোচনা চায়। দেশটির বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান হুশিয়ার করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায় বা আত্মসমর্পণে বাধ্য করার চেষ্টা করে, তবে তা সফল হবে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ ‘শেষের কাছাকাছি’ এবং শিগগিরই নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে। তবে তিনি যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও জানিয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্য ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরান-সংঘাতে যুক্তরাজ্য অংশ নেবে না। পার্লামেন্টে তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের যুদ্ধ নয়’ এবং কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করা হবে না।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যেও নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইরানকে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ তুলে চীনকে সতর্ক করেছেন ট্রাম্প, যদিও বেইজিং এ অভিযোগ ‘বানোয়াট’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুশিয়ারি দিয়েছে।

অন্যদিকে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরান একটি চীনা গোয়েন্দা স্যাটেলাইট ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর নজরদারি চালাচ্ছে। তবে এ তথ্য এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি।

আঞ্চলিক কূটনীতিতেও নতুন গতি এসেছে। পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্ক সফরে যাচ্ছেন, যেখানে আঞ্চলিক শান্তি ও সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আলোচনা হবে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শাহবাজ শরিফ বুধবার জেদ্দার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। সেখানে সৌদি আরবের নেতৃত্বের সঙ্গে সাক্ষাতের পর কাতার যাবেন তিনি। কাতারে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে তিনি আলোচনা করবেন।

এদিকে তুরস্কে দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠক করার এবং পঞ্চম আন্টালিয়া ডিপ্লোমেসি ফোরামে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে শাহবাজ শরিফের। তিনি আগামী শনিবার ইসলামাবাদে ফিরবেন।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও আশা প্রকাশ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার ‘প্রবল সম্ভাবনা’ রয়েছে এবং এই সংকটের সামরিক সমাধান নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। একদিকে সামুদ্রিক পথ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি, অন্যদিকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাÑ এই দুইয়ের টানাপড়েনে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষ করে লোহিত সাগরের বাণিজ্য পথ বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com