শনিবার, ০৪:০৪ অপরাহ্ন, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৮শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

স্মরণশক্তি বাড়ানোর উপায়

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫ বার পঠিত

মানবজীবনে স্মৃতিশক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। জ্ঞান অর্জন, চিন্তাভাবনা, দৈনন্দিন কার্যকলাপসহ জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে স্মৃতিশক্তি অপরিহার্য। একজন মানুষের সাফল্য ও ব্যর্থতা অনেকাংশে নির্ভর করে তার স্মরণশক্তির ওপর। ইসলাম স্মৃতিশক্তিকে খুব গুরুত্ব দিয়েছে এবং কোরআন-হাদিসে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির জন্য কিছু চমৎকার নির্দেশনা দিয়েছে।

স্মৃতিশক্তি আল্লাহপ্রদত্ত নেয়ামত : স্মৃতিশক্তি মহান আল্লাহর একটি বিশেষ নেয়ামত। প্রত্যেক মানুষের স্মৃতিশক্তি এক রকম নয়। কেউ কেউ সহজেই অনেক কিছু মনে রাখতে পারে, আবার কেউ কেউ অল্প সময়েই ভুলে যায়। মহান আল্লাহ কোরআনে বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের মায়ের গর্ভ থেকে তোমাদের এমন অবস্থায় বের করেছেন, যখন তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের জন্য কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয় সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’ (সুরা নাহল ৭৮) এ আয়াত থেকে বোঝা যায় শ্রবণ, দৃষ্টিশক্তি ও হৃদয় (স্মৃতি ও চেতনার কেন্দ্র) মহান আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত। সুতরাং এ সম্পদকে সংরক্ষণ করা, বাড়ানো এবং সঠিক কাজে ব্যবহার করা ইমানদারের দায়িত্ব। স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির উপায়সমূহ উল্লেখ করা হলো।

তাওহিদ ও তাকওয়া অবলম্বন : তাকওয়া বা মহান আল্লাহর ভয় মানুষের চিন্তা ও স্মৃতিকে শুদ্ধ করে তোলে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদেরকে (ফুরকান) পার্থক্যকারী শক্তি দান করবেন।’ (সুরা আনফাল ২৯) এখানে ‘ফুরকান’ মানে হচ্ছে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ও জ্ঞান-বুদ্ধি ও স্মৃতিশক্তির বিকাশ। যারা গুনাহ থেকে বাঁচে, তারা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সাহায্য পায়, যার একটি হলো স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি।

গুনাহ থেকে বিরত থাকা : অপরাধ ও পাপকাজ মানুষের হৃদয়কে অন্ধ করে তোলে এবং স্মৃতিশক্তিকে দুর্বল করে দেয়। বিখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত ইমাম শাফি (রহ.) বলেছেন, ‘আমি আমার উস্তাদ ওয়াকিকে আমার স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ার কথা জানালাম। তখন তিনি আমাকে গুনাহ ত্যাগ করতে বললেন।’ গুনাহ হৃৎপিণ্ডকে কলুষিত করে এবং আল্লাহর দয়া থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়। ফলে মানুষ জ্ঞান ও হেকমতের আলো থেকে বঞ্চিত হয়।

দোয়া ও কোরআনের আমল : স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির জন্য কোরআন ও হাদিসে কিছু দোয়া এবং আমল রয়েছে, যা নিয়মিত পালন করলে মহান আল্লাহর রহমতে স্মরণশক্তি বৃদ্ধি পায়। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘রব্বি জিদনি ইলমা।’ অর্থাৎ হে আমার পালনকর্তা! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন। (সুরা তাহা ১১৪)

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘আল্লাহুম্মান ফা-নি বিমা আল্লামতানি, ওয়া আল্লিমনি মা এনফায়ুনি, ওয়া জিদনি ইলমা।’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি যা আমাকে শিখিয়েছেন, তা আমার জন্য উপকার করে দিন, আমাকে এমন কিছু শিক্ষা দিন যা আমার উপকারে আসবে এবং আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন। (জামে তিরমিজি) এই দোয়াগুলো প্রতিদিন অন্তর থেকে পাঠ করলে মহান আল্লাহ স্মৃতিশক্তি ও জ্ঞান বাড়িয়ে দেন।

নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত : নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত ও মুখস্থ করার বিষয়টি স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করার অন্যতম কার্যকর পদ্ধতি। কোরআন হিফজ করতে গেলে মনোযোগ, ধৈর্য এবং নিয়মিত অনুশীলনের প্রয়োজন হয়, যা মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে। হাফেজদের ওপর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের স্মৃতিশক্তি তুলনামূলকভাবে অধিক প্রখর হয়।

জিকির ও ইস্তেগফার : মহান আল্লাহর জিকির মস্তিষ্ককে শুদ্ধ করে, মানসিক প্রশান্তি দেয় এবং স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সহায়তা করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর জিকিরেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা রাদ ২৮) যারা বেশি ইস্তেগফার করে, তাদের অন্তর আলোকিত হয়, যা স্মৃতি ও বুদ্ধি বিকাশে সাহায্য করে।

পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন ও হালাল খাদ্যগ্রহণ : ইসলাম মানুষের খাদ্যাভ্যাসের প্রতিও গুরুত্ব দেয়। হালাল ও পবিত্র খাবার খেলে মস্তিষ্ক ও হৃদয় সুস্থ থাকে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই শরীরে একটি মাংসপিণ্ড রয়েছে, তা যদি বিশুদ্ধ হয়, তবে সমস্ত শরীর বিশুদ্ধ হয়। আর যদি তা দূষিত হয়, তবে সমস্ত শরীর দূষিত হয়। সেটি হলো হৃদয়।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) হারাম খাবার হৃদয় ও মস্তিষ্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে স্মৃতি দুর্বল হয়ে যায়।

তাহাজ্জুদ আদায় : তাহাজ্জুদ নামাজ মানুষকে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করে। রাতের নির্জনে ইবাদতের মাধ্যমে অন্তর বিশুদ্ধ হয়, একাগ্রতা বৃদ্ধি পায় এবং মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে।

ওস্তাদদের প্রতি সম্মান ও দোয়া গ্রহণ : ইসলামী জ্ঞানের প্রাচীন ঐতিহ্যে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওস্তাদদের প্রতি সম্মান এবং দোয়া চাওয়া স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম। ইমাম মালেক (রহ.) তার ছাত্র ইমাম শাফি (রহ.) সম্পর্কে বলেন, ‘তোমার মধ্যে আমি এমন এক আলো দেখি, যা আল্লাহ তোমার অন্তরে রেখেছেন।’

প্রয়োজনীয় ইসলামী বই পাঠ করা : ইসলামী বই, বিশেষ করে সাহাবিদের জীবন, হাদিস গ্রন্থ ও তাফসির পাঠ করলে অন্তর প্রশান্ত হয় এবং চিন্তাচেতনা পরিশীলিত হয়। নিয়মিত পাঠ স্মৃতিশক্তি সক্রিয় রাখে।

স্মৃতিশক্তি আল্লাহর দান : স্মৃতিশক্তি মহান আল্লাহর মূল্যবান দান। এই নেয়ামতকে মহান আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করা আমাদের দায়িত্ব। ইসলাম শুধু ইবাদত বা আচারবিধির ধর্ম নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের মানসিক, আত্মিক ও জ্ঞানগত উন্নয়নের সকল দিক নির্দেশ করে। যারা ইসলামী পন্থায় জীবন পরিচালনা করে, মহান আল্লাহ তাদের অন্তরকে বিশুদ্ধ করেন, চিন্তা ও স্মৃতিকে সমৃদ্ধ করেন।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া, গাজীপুর

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com