বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যোদ্ধাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদের ঘাটতি থাকলেও এ অভাব পূরণ করে দিয়েছে জাগ্রত বিশ্ববিবেক এবং বিদেশি সব গণমাধ্যম। এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় বিভিন্ন দেশের জাতীয় পত্রিকাগুলোর স্থানে স্থানীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকাগুলোকে পাল্লা দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেটের কথা বলেছে, সামরিক বাহিনীর নির্যাতনের কথা বলেছে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যে অবশ্যম্ভাবী- সে কথাও জোর দিয়ে বলেছে। এমনি একটি আঞ্চলিক পত্রিকা যুক্তরাষ্ট্রের ম্যারিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের দ্য বাল্টিমোর সান।
১৮৩৭ সালের ১৭ মে পত্রিকাটির প্রথম প্রকাশ। তখন ট্যাবলয়েড আকৃতির পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় ২১ লাইট স্ট্রিট থেকে, মূল্য ১ পেনি। ১৯০৪ সালের গ্রেট বাল্টিমোর ২১ লাইট স্ট্রিটের পাঁচতলা লৌহ খিলানের ভবনটি ভস্মীভূত হয় দ্য গ্রেট ফায়ারে। বহু ঠিকানা বদলে ১৯৫০ সালে পত্রিকাটির অফিস স্থাপিত হয় নিজস্ব জমিতে বাল্টিমোর শহরের ৫০১ নর্থ ক্যালভার্ট স্ট্রিটে। পত্রিকাটির প্রচার সংখ্যা দুই লাখ দশ হাজার আর রোববারে সাড়ে তিন লাখ।
আঞ্চলিক পত্রিকা হলেও দ্য বাল্টিমোর সান ঐতিহ্য ও কৌলীন্যে বিখ্যাত লেখক ও সাংবাদিকদের আকৃষ্ট করেছে। লেখক তালিকায় রয়েছেনÑ রাসেল বেকার, রিচার্ড ক্র্যামার, জন ক্যারোল, এডমন্ড ডাফি, থোমাস ফ্ল্যানারি, জেরাল্ড জনসন, ফ্র্যাঙ্ক কেন্ট, লরা লিপম্যান, থোমাস ও’নেইল, ডেভিড সিমন, মার্ক ওয়াটসন প্রমুখ।
১৯৭১-এর বাংলাদেশকে এই পত্রিকাটি মানবিক ছোঁয়া দিয়ে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরেছে। ২৫ মার্চের পাকিস্তানি আগ্রাসনের কথা সবার আগে যে দু-একটি বিদেশি পত্রিকা বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করতে পেরেছে, বাল্টিমোর সান তার অন্যতম।
২৮ মার্চের ‘দ্য ট্রুপস টেকওভার’ ছাড়াও বাংলাদেশ নিয়ে আরও যেসব উল্লেখযোগ্য প্রতিবেদন, ভাষ্য, সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে :
৩০ মার্চ ১৯৭১ : ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণের পরিকল্পনা করেছিল।
৩০ মার্চ ১৯৭১ : পাকিস্তান বাঙালিদের নির্মূল করে দিচ্ছে।
১৪ মে ১৯৭১ : পাকিস্তানের গল্প।
৯ জুন ১৯৭১ : পাকিস্তানকে সাহায্য বন্ধ করতে ২ জন সিনেটরের আহ্বান।
১৬ জুন ১৯৭১ : পাকিস্তান অস্ত্র সরবরাহে শিপিং এজেন্টদের বাধা।
১৬ জুলাই ১৯৭১ : ডক শ্রমিকরা পাকিস্তানি জাহাজে অস্ত্র ওঠাতে অস্বীকার করেছে।
২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ : পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়।
১৫ অক্টোবর ১৯৭১ : পাকিস্তানকে সাহায্য স্থগিত করার পরিকল্পনা।
১৯ অক্টোবর ১৯৭১ : এশিয়ার উত্তেজনা।
২৬ অক্টোবর ১৯৭১ : যুদ্ধের সম্ভাবনা।
১৩ নভেম্বর ১৯৭১ : ভয়ই পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র আইন।
৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ : বেপরোয়া পাকিস্তান।
৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ : উৎফুল্ল বাঙালি জনতা যশোরে ভারতীয় বাহিনীকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। দ্য বাল্টিমোর সান-এ
এ প্রকাশিত প্রথম প্রতিবেদনটির অংশবিশেষ অনূদিত হলো :
জন উডরাফের প্রতিবেদন
গোলাগুলি ও অগ্নিশিখার শহর ঢাকা
দুদিনের অবিশ্রান্ত গুলিবর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের পর ঢাকা শহরকে গোলাগুলি ও অগ্নিশিখার শহরে পরিণত করে স্বাধীনতার দিকে পূর্ব পাকিস্তানের ঝুঁকে পড়াটা হঠাৎ যেন আটকে দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট এএম ইয়াহিয়া খান যখন গতরাতে গণতন্ত্রের পথ উত্তরণে তার দুবছরের সতর্ক পরীক্ষা-নিরীক্ষার অবসানের ঘোষণা দিলেন, সেনাবাহিনী ততক্ষণে গুলি করতে করতে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে নিলÑ সব দিকে রেখে গেল গোলাগুলির দৃশ্যমান চিহ্ন, পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি মানুষের নির্বাচিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে আটকে ফেলল কারাগারে।
স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রের অবিরাম গুলিবর্ষণের মাঝে কখনও কখনও কয়েকটা গুলির শব্দ স্পষ্টই জানিয়ে দেয়, কেউ যেন সেনাবাহিনীর গুলির জবাব দিচ্ছে।
সংবাদকর্মীরা প্রত্যক্ষ করেছেন এমন কিছু ঘটনায় তারা সৈনিকদের ভারী মেশিনগানের সাহায্যে কোনো ধরনের সতর্ক সংকেত না দিয়ে নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালাতে দেখেছেন। মৃত্যু ও অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চিত করা যায়নি। যখন জানা গেল, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে ব্যাপক সুরক্ষিত ঢাকার প্রেসিডেন্টস হাউস ছেড়ে গেছেন তখনই প্রথম বোঝা গেল আলোচনা ভেঙে যাওয়ার চেয়েও বড় কোনো ঘটনা ঘটেছে। দুঘণ্টা পর যখন প্রেসিডেন্ট হাউসের কঠোর সেনাপ্রহরার অনেকটাই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে, অবশিষ্টদের একজন বেসামরিক গার্ডের কাছে খবর দিতে গেলে তিনি যে জবাব দেন তা হচ্ছে : ‘কোনো প্রশ্ন করার জন্য (প্রেসিডেন্ট কোথায় আছেন) এটা বড় দুঃসময়।’
রাত এগারোটার দিকে সৈন্যরা সাংবাদিকদের ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে জড়ো করল, হোটেলের ভেতরে না ঢুকলে গুলি করা হবেÑ এই হুমকি দিয়ে তাদের ভেতরে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। নগরীর বিভিন্ন অংশ স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিবর্ষণ শুরু হয়ে গেল। রাত ১২-২০ মিনিটে শেখ মুজিবের বাসায় টেলিফোন করা হলে এক শান্ত স্বরের জবাব শোনা গেলÑ শেখ বিছানায়।
আজ সকালেই করাচি বেতার প্রথমবারের মতো বিশেষ করে শেখ মুজিবের অবস্থান নিয়ে মুখ খুলেছেÑ পাঁচজন সহযোগীসহ তাকে সেই ফোনকলের এক ঘণ্টা দশ মিনিট পর গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সেই ফোনকলের দশ মিনিট পরই হোটেলের সব ফোন ডেড হয়ে যায়।
জন উডরাফ
ততক্ষণে হোটেলের সৈন্যরা পাশেই উড়তে থাকা সবুজ, লাল ও সোনালি রঙের বাংলাদেশের পতাকা ছিঁড়ে ফেলে এবং স্তূপীকৃত পতাকা হোটেলের লনে পুড়িয়ে ফেলে।
শুক্রবার দিবাগত রাত একটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে প্রথম কামান আক্রমণের শব্দ শোনা যায়Ñ ছাত্রনেতারা সেখানে সক্রিয়।
২৫ থেকে ৩০ ট্রাক ভর্তি সৈন্য হোটেল ডিঙিয়ে দেড় মাইল দূরে ক্যাম্পাসের দিকে এগিয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গোলাগুলির প্রতিধ্বনি আসতে থাকে।
রাত দুটোর দিকে একই গন্তব্যে কামানের গোলার শব্দ আসতে থাকে আর আড়াইটার দিকে দুটো বড় ভবন অগ্নিশিখায় ঢাকা পড়েÑ সে রাতের প্রথম ভয়াবহ অগ্নিসংযোগ। দশতলার জানালা দিয়ে দেখে বাঙালি সাংবাদিকরা জানালেন, ভবন দুটোর একটি ইকবাল হল ও একটি মুহসীন হলÑ আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের সক্রিয় আশ্রয়।
দ্য বাল্টিমোর সান প্রতিবেদন
ভয়ই পূর্ব পাকিস্তানে একমাত্র আইন
পাটকলের এক যুবক সুপারিটেনডেন্ট বলল, মাত্র কঘণ্টা আগে তারা গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে। সেনাবাহিনী গ্রামে ঢোকার পর গ্রামটা জ্বালিয়ে দিয়েছে, এক তরুণ গ্র্যাজুয়েটকে হত্যা করেছে। সেনাবাহিনী কেন এসেছে, তার জানা নেই। রাস্তায় ধরে আরও এগোনোর পর দেখা গেল, ছয়টা গ্রাম পুড়িয়েছে। গেরিলা তৎপরতার প্রতিশোধ হিসেবে ক’জন গ্রামবাসীকেও হত্যা করেছে।
যখন জিজ্ঞেস করা হলোÑ কাজটা ভুলে মুক্তিবাহিনীই করেছে কিনা, এ কথা শোনার পর যেন ব্যক্তিগতভাবে অপমানিত বোধ করেছেÑ এভাবে এগিয়ে এলো সুপারিনটেন্ডেন্ট এবং একজন স্কুলশিক্ষক।
‘না স্যার, না। পাকবাহিনী, ওরা পাকবাহিনী, পাকবাহিনী।’
পাটকলের সুপারিনটেনডেন্ট বলল, আমাকে পালাতে হয়েছে, কারণ সেনাবাহিনী সব শিক্ষিত লোকদের মেরে ফেলছে। যাতে কেউ আর নেতৃত্ব দিতে না পারে। স্কুলশিক্ষক তার কথায় সায় দেয়।
একমত ঢাকার কূটনীতিবিদরাও তাদের যারা সেনাবাহিনীর নির্যাতনের সাক্ষ্য সংগ্রহ করছেন। তারাও মনে করেন দেশের অধ্যাপক, ডাক্তার, আইনজীবী, ছাত্র ও অন্যান্য শিক্ষিত মানুষকে পদ্ধতিগত হত্যা করা হচ্ছে কিংবা কারাগারে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। (১৩ নভেম্বর ১৯৭১)
দ্য বাল্টিমোর সান, সম্পাদকীয়
পাকিস্তানের গল্প
যখন পাকিস্তানের দুটো অংশ নির্মমভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, সেই মার্চ মাসের পাকিস্তান ট্র্যাজেডির ব্যাপ্তি ধীরে ধীরে প্রকাশিত হচ্ছে। ছয়জন বিদেশি সংবাদদাতাকে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সরকার নিয়ন্ত্রিত সফরে তারা যতটুকুই দেখতে পেরেছেন, তার তথ্যবহুল বিবরণী থেকেই বেরিয়ে আসছে সে ট্রাজেডির চিত্র। তাদের একজন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) মোর্ট রোজেনব্লুম পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে ব্যাংককে এসে তার প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। তার লেখায় যা উঠে এসেছে, তা কসাইয়ের নির্মমতা, ঘৃণা আর ভয়ংকরের গল্প। একটি জাতীয় অর্থনীতির ধ্বংসের প্রান্তসীমায় চলে আসার গল্প, রাজনৈতিক হট্টগোলের গল্প।
রোজেনব্লুমের অনুমান, সেখানে পাঁচ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, ধ্বংসযজ্ঞের যে দৃশ্য, তা অবিশ্বাস্য। লাখ লাখ মানুষ অভুক্ত। অন্যান্যের প্রতিবেদনে এটাও স্পষ্ট, পশ্চিম পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে গিয়ে পূর্ববাংলায় হত্যা করা হয়েছে অজানাসংখ্যক অবাঙালিকে। তাদের লেখায় এটাও স্পষ্ট হয়েছে, এই রাষ্ট্রের বর্বরোচিত বিভাজনের দায় সবার আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের আদেশদাতাদের ওপর বর্তায়।
মোর্ট রোজেনব্লুম
পূর্ববাংলার রাজধানী ঢাকায় মাত্র ১৫০ জনের মৃত্যু হয়েছেÑ আগে বলা এই তথ্য সর্বৈব মিথ্যা। আর সম্ভাব্য সশস্ত্র অভ্যুত্থান রোধ করতে সেনাবাহিনী গভীর রাতে হানা দিতে বাধ্য হয়েছে, এ দাবিও মিথ্যা। কারণ এই বক্তব্যের কোনো সাক্ষ্য এখনও মেলেনি। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, পাকিস্তান সরকার জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে বিজয়ী পূর্ববাংলার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাসীন হতে না দেওয়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং সেই প্রতিজ্ঞা থেকেই মার্চ মাসে পরিকল্পিত এই আক্রমণ চালানো হয়।
যদিও এ ঘটনার পরিণতি কী হবে, এখনই জানা যাবে না। তবে এটা অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, পাকিস্তানের স্রষ্টারা যে দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, এর সমাপ্তি ঘটেছে। ইতোমধ্যে ভগ্নদশার অর্থনীতি যেখানে এসে ঠেকেছে, সেখান থেকে উত্তরণের আর কোনো সুযোগ নেই।