বক্তৃতা বা কথায় নয়, কাজ করে দেখাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাস্তবে প্রতিদিন পাড়ি দিতে হচ্ছে এক বন্ধুর পথ। পাছে লোকে কিছু বলের দিকে তাকানোর সুযোগ নেই। পুরোনো-নতুন প্রতিপক্ষের শব্দদূষণ, খোঁচা-খিঁচুনি, উসকানি, টিপ্পনি সব সয়ে এগোচ্ছেন সামনের পানে। পেছনে তাকানো বা সব কিছুর জবাব দেওয়ার সময় নেই। এসবের মধ্য দিয়ে দেশে রাজনৈতিক-ব্যক্তিগত শিষ্টাচার, উদারতার নজির তৈরি করে চলছেন তিনি। রাষ্ট্রের নির্বাচিত নির্বাহী প্রধান হয়েও ব্যতিক্রমী প্রাত্যহিক জীবন ও দেশ গড়ার বার্তাই দিচ্ছেন না, বাস্তবায়নও করে চলছেন।
নির্বাচনের আগে দেশে ফিরে ‘আই হ্যাভ আ প্লান’ ঘোষণার আগ থেকেই ভার্চুয়ালে তিনি তার অভিপ্রায় জানাচ্ছিলেন। ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব একটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ পরিকল্পনার আকাক্সক্ষার কথাও জানিয়েছেন। নির্বাচনে বিশাল জয়ের পর নেমে পড়েছেন কর্মযজ্ঞে। প্রথাগত ক্ষমতাচর্চার বিপরীতে রাষ্ট্র পরিচালনা ও জনগণের সেবায় দেখিয়ে চলছেন নতুনত্ব, অভিনবত্বের আশার আলো। কেবল আহ্বান নয়, প্রতীকিও নয়, বাস্তবে নিজেই করছেন। যার কোনো কোনোটি তার সহযোগী-সহকর্মীদেরও ভাবিয়ে তুলছে, হতচকিত করে দিচ্ছে। সকালে দপ্তরে রওনা দেওয়া মাত্রই যখন বাড়ির দরজা খুলে উপস্থিত সবার উদ্দেশে বলেন, ‘চলেন যুদ্ধে যাই’ কী বুঝবে সহকর্মীসহ স্টাফরা? হতচকিত হওয়া, ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কী করার থাকে তাদের! একটু পর উপস্থিতরা বুঝলেন, যুদ্ধ বলতে তিনি দেশ পরিচালনার কাজকে বুঝিয়েছেন। তিন শব্দের চমকপ্রদ লাইনে দেশ গঠনে তার প্রতিদিনের সংগ্রামের কথাই বলেছেন। এভাবেই চলছে তার দিনাতিপাত তথা ঘোষিত ‘আই হ্যাভ আ প্লান’ বাস্তবায়ন।
দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন একটু দেরিতে করলেও অসুবিধা হবে না বলে মত দিয়েছিলেন বড় বড় অর্থনীতিবীদের কেউ কেউ। কিন্তু, না, যথাসময়েই শুরু হবে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া। শুরু হবে খাল খনন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও। কৃচ্ছ্রসাধনের জন্য ব্যয়বহুল ইফতার পার্টি এড়িয়ে গেছেন তিনি। সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বানের আগে নিজে সাশ্রয়ী হয়ে দেখিয়েছেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য নিজের দপ্তরে অতিরিক্ত লাইট, ফ্যান, এসি ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। চলতিপথে ভিভিআইপি প্রোটোকল ছেড়ে লালবাতিসহ ট্রাফিক সিগন্যাল মানছেন। পরিবারের সদস্যদের জন্য এসএসএফ নিরাপত্তা নেননি।
তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর এমন বেশ কিছু নিত্যনতুন ঘটনার সাক্ষী হয়ে চলছে দেশের মানুষ। তার এসব সিদ্ধান্ত এই বার্তা স্পষ্ট করে দেয় যে, সরকারি পদ ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য নয়, জনসেবার জন্য এবং রাষ্ট্র নাগরিকের জীবন থামানোর জন্য নয়, তাদের জীবন সহজ করার জন্য। তার শনিবারও অফিস করা যত না প্রতীকী, তার চেয়েও বেশি কাজের গতি বাড়ানোর একটি বার্তা। এর মর্মার্থ বেশ গুরুত্ববহ, মানে আর নয়, সরকারি কাজে দীর্ঘসূত্রিতা। তার শনিবারও অফিস করার মধ্য দিয়ে সপ্তাহের কর্মদিবসগুলোতে মন্ত্রী, সচিবসহ প্রজাতন্ত্রের অন্য সব কর্মকর্তা-কর্মচারী সর্বোচ্চ কাজ করতে উৎসাহিত না হয়ে পারবেন না। জনগণ এগুলোর ফলে আশা করতেই পারে, মানুষ তাদের পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের পথ দেখছে। ঘুণে ধরা শাসন সংস্কৃতি-পদ্ধতি বদলে দেওয়ার প্রচেষ্টা শুরু হয়ে গেছে। রাষ্ট্র-সরকার ও নাগরিক তথা গণমানুষের সঙ্গে যে দূরত্ব বা বিচ্ছিন্নতা এতদিনকার শাসনকাঠামোয় তৈরি হয়েছে, সেটি শুধু নীতিগত ব্যর্থতার কারণেই নয়, ক্ষমতার দৃশ্যমান দাম্ভিকতা, অপব্যবহার, দুর্নীতি ও বৈষম্যের কারণেও হয়ে চলেছে।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন