দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। নারী স্বাবলম্বী হলে পরিবারে আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত হবে। পরিবার আর্থিকভাবে সুরক্ষিত হলে দেশও এগিয়ে যাবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় ইশতেহারে নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএনপি। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর সেই অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ দিচ্ছে দলটি। আগামীকাল মঙ্গলবার ১০ মার্চ ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকার কড়াইল বস্তিতে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফ্যামিলি কার্ড উদ্বোধনের মাধ্যমে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রধানতম প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দিচ্ছে। ধাপে ধাপে দেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবারের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে আজ সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রণীত ‘ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন-২০২৬’ অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মূল লক্ষ্য সমাজের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে সহায়তার আওতায় আনা। নীতিমালায় ৭ শ্রেণির মানুষকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। শুরুতে পাইলট প্রকল্প হিসেবে দেশের ১৪টি উপজেলার একটি ইউনিয়নের একটি করে ওয়ার্ডে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ পরিবারে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। চার মাসের পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের পর ধাপে ধাপে সারাদেশে বিস্তৃত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারের আর্থিক সুরক্ষায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছিল সরকার।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, এই কার্ডের অর্থ সরাসরি পরিবারের গৃহকর্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হবে, যা নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করবে। সরকার আগামী ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে দেশের ৫০ শতাংশের বেশি যোগ্য পরিবারকে এই প্রকল্পের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। নতুন সরকারের এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন।
‘ফ্যামিলি কার্ড ২০২৬’-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, চলতি মার্চ থেকে প্রতি মাসে ১০ হাজার পরিবারকে এই কার্ড দেওয়া হবে। কার্ডধারী প্রতিটি পরিবার মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা পাবে। অবশ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ইতোমধ্যেই উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে।
শুরুতে যেসব এলাকায় দেওয়া হচ্ছে : দেশের ১৪টি এলাকায় পরীক্ষামূলক ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হচ্ছে। এলাকাগুলো হলোÑ ঢাকার বনানী এলাকার কড়াইল, সাততলা ও ভাষানটেক বস্তি; মিরপুর শাহ আলী এলাকার আলী মিয়ার টেক ও বাগানবাড়ি বস্তি; রাজবাড়ীর পাংশা; চট্টগ্রামের পতেঙ্গা; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর; বান্দরবানের লামা; খুলনার খালিশপুর; ভোলার চরফ্যাশন; সুনামগঞ্জের দিরাই; কিশোরগঞ্জের ভৈরব; বগুড়া সদর; নাটোরের লালপুর; ঠাকুরগাঁও সদর এবং দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা ২০২৬ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডকে প্রতিটি নাগরিকের জন্য ‘সর্বজনীন সামাজিক পরিচয়পত্র’ (ইউনিভার্সাল সোশ্যাল আইডি কার্ড) হিসেবে রূপান্তরের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। নতুন এই প্রকল্পের আওতায় পরিবারের নারীপ্রধানের নামে কার্ড দেওয়া হবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে দারিদ্র্য মূল্যায়নের জন্য ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ স্কোরিং ব্যবহার করে সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হবে। গ্রামাঞ্চলে যাদের বসতভিটা ও আবাদি জমির পরিমাণ শূন্য দশমিক ৫০ একর বা তার কম, তারা এই কার্ডের যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। এ ছাড়া আয় ও সম্পদ যাচাই করে দরিদ্র ও অতি-দরিদ্র পরিবার চিহ্নিত করা হবে। পরিবারের কোনো সদস্য নিয়মিত সরকারি চাকরিজীবী বা পেনশনভোগী হলে, বাণিজ্যিক লাইসেন্স বা বড় ব্যবসা থাকলে অথবা গাড়ি বা এসি থাকলে সেই পরিবার এই সুবিধার আওতায় আসবে না। ভূমিহীন, গৃহহীন, প্রতিবন্ধী এবং হিজড়া, বেদে ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। শহর, উপজেলা, ইউনিয়ন, পৌরসভা এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে সুবিধাভোগী নির্বাচনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। ভুল কমানোর জন্য দুই স্তরের যাচাই ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তারা এই কর্মসূচি তদারকি করবেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, তথ্যের সঠিকতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। যদি প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলোকে সঠিকভাবে শনাক্ত করা যায় এবং সহায়তা নিয়মিতভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়, তবেই এটি দেশের সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। কারণ ফ্যামিলি কার্ড কেবল একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয় বরং এটি হতে পারে সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি নতুন অধ্যায়। ফ্যামিলি কার্ডের সঠিক বাস্তবায়নে এটি হয়ে উঠতে পারে নারীর স্বনির্ভরতা ও দারিদ্র বিমোচনের হাতিয়ার।
বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, দেশের উন্নয়ন নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া অসম্পূর্ণ। নারী অধিকার, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হলে জাতীয় উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায় অর্জন সহজ হবে। এ জন্য নারীদের তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সুরক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে সমাজে তাদের সম্পৃক্ততা এবং ক্ষমতাকে দৃঢ় করবে। ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন করতে পারলে তৃণমূলের নারীদের ক্ষমতায়ন এগিয়ে যাবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, আগামী চার মাসে পাইলট বা পরীক্ষামূলক পর্যায়ে অন্তত ৪০ হাজার পরিবার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পাবে। এই প্রকল্পের প্রাথমিক খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৩৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের বরাদ্দ থেকে ৩৯ কোটি টাকা এই প্রকল্পের জন্য আলাদা করে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা সরাসরি ভাতা হিসেবে দেওয়া হবে এবং বাকি টাকা সুবিধাভোগী নির্বাচনের কাজে ব্যয় করা হবে।
সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকা অনুযায়ী, বর্তমানে চালু থাকা টিসিবি কার্ডগুলোকে ফ্যামিলি কার্ডের ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। একই স্মার্টকার্ড এবং ওটিপি যাচাইয়ের মাধ্যমে সুবিধাভোগীরা সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কিনতে পারবেন। ভবিষ্যতে এর মাধ্যমে শিক্ষা উপবৃত্তি এবং কৃষি ভর্তুকির সুবিধাও পাওয়া যাবে। ফ্যামিলি কার্ড মূলত একটি ডিজিটাল ডেটাবেজভিত্তিক স্মার্টকার্ড। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিবারগুলো সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সরাসরি নগদ আর্থিক সহায়তাও পাবে। এর প্রধান লক্ষ্য নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে কেন্দ্র করে সমাজের প্রান্তিক, হতদরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত কর।
কার্ড বিতরণের প্রক্রিয়াটিও প্রযুক্তিনির্ভর ও বহু স্তর যাচাইভিত্তিক। নির্বাচিত ওয়ার্ডগুলোতে সরকারি প্রতিনিধিরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সম্ভাব্য সুবিধাভোগী পরিবার চিহ্নিত করবেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নেতৃত্বে উপজেলা পর্যায়ে এবং ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি এই কার্যক্রম পরিচালনা করবে। তথ্যগুলো নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র ডেটাবেজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে, যাতে কোনো দ্বৈত সুবিধাভোগী না থাকে। সর্বশেষে প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার সুপারিশের ভিত্তিতে চূড়ান্ত তালিকা অনুমোদিত হবে। আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি এবং নিবন্ধিত সচল মোবাইল নম্বর বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। স্থানীয় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় এবং সরকারের অনলাইন পোর্টাল থেকে আবেদন ফরম পাওয়া যাবে। পুরো ব্যবস্থাটি একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটাবেজের মাধ্যমে পরিচালিত হবে, যাতে নিয়মিতভাবে তদারকি করা যায় যে সুবিধাভোগীরা ঠিকমতো সহায়তা পাচ্ছেন কি না।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি নগদ অর্থ প্রদান করা হবে। এই কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে দেশের হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং নারীদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। মূলত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে এই অর্থ সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।