শনিবার, ০৪:০৩ অপরাহ্ন, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৪শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

রংপুর : শহীদ আবু সাঈদের জনপদে অবহেলার রাজনীতি

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
  • ১০ বার পঠিত

‘হামার বেটাক মারলু ক্যান?’– এই প্রশ্ন উত্তরের জনপদ রংপুর শহরের দেয়ালে দেয়ালে লেখা ছিল। লেখাগুলো অনেকটাই মুছে গেছে। এসব দেয়ালে এখন ভোটের রং। পথে পথে মিছিল। তবে আবু সাঈদের নাম উচ্চারণ করলে মানুষ একটু থেমে যায়, দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যে তরুণ রাজপথে দাঁড়িয়ে বুক পেতে দিয়েছিলেন, বুলেটে ক্ষতবিক্ষত সেই তরুণ এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার প্রতীক। তাঁর রক্তের বিনিময়ে দেশ বড় পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে গেছে। কিন্তু সেই জনপদ কি বদলেছে, কিংবা বদলাবে? এমন প্রশ্ন এখন ভোটারদের মনে।

নীলফামারীর সৈয়দপুর থেকে রংপুর শহরের রাস্তা কিছুটা প্রশস্ত; কিন্তু দৃশ্য বদলায়নি। দুই পাশে ধানের মাঠ, মাঝে মাঝে ইটভাটা। ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে গেছে। রাস্তার পাশে হাটবাজার, সেখানেও অগোছালো অবস্থা। প্রায় ৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রংপুর শহরে পা রাখতেই অটোরিকশা আর ব্যাটারিচালিত যানবাহনের ভিড়। নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড নেই। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কোনো ছক চোখে পড়ে না। যেখানে-সেখানে যান দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তার দুই পাশে দখল করা ফুটপাত। পথচারীদের হাঁটার জায়গা নেই। দোকান আর ভ্যানের দখলে শহরের শ্বাসরোধ অবস্থা।

এই পথ দিয়েই এখন চলছে ভোটের প্রচারণা। চলছে মাইকিং। ডিজিটাল প্রচার আছে। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি আছে। অথচ সৈয়দপুর থেকে রংপুর শহরে যাওয়ার এই পুরো পথটাই যেন সেই অতীত প্রতিশ্রুতির বিপরীত সাক্ষী। আর এক সপ্তাহ পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এখন ভোটারদের সুযোগ আছে প্রশ্ন করার, জবাব চাওয়ার। যে আবু সাঈদের রক্তের ওপর দিয়ে এলো নির্বাচন, সেই রংপুরের মানুষ এখনও নিজের অবস্থান খুঁজে ফিরছে।

এক সময় রংপুর ছিল দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। গুপ্ত, পাল ও সেন রাজারা শাসন করেছেন এ জনপদ; মাহিগঞ্জ ছিল মোগল সাম্রাজ্যের আঞ্চলিক কার্যালয়। ১৯৪৭ সালের আগ পর্যন্ত এটি ছিল প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও শিল্পকেন্দ্র। তবে আজ রংপুর শহর নিরানন্দ, সড়কে খানাখন্দ, ফুটপাত দখল, ড্রেনেজ ব্যবস্থা অচল। বর্ষায় ডুবে যায় নগরের বড় অংশ, ড্রেন উপচে পানি পড়ে রাস্তায়, দুর্গন্ধে জীবন অসহনীয় হয়ে ওঠে। শুষ্ক মৌসুমে ওড়ে ধুলাবালি। সিটি করপোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ; এ কারণে বিদ্যালয়ের শিশুরাও দিনের বেলায় মশার কামড়ে অতিষ্ঠ।

রংপুর মহানগরীর কেন্দ্রীয় সড়কে দাঁড়ালে প্রথমে চোখে পড়ে ব্যস্ততা। দোকান, শোরুম, ব্যাংক, বেসরকারি ক্লিনিক– সব মিলিয়ে শহরের চেহারা দেখে মনে হতে পারে রংপুর এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একটু ভেতরে ঢুকলেই অন্য দৃশ্য চোখে পড়বে। খোলা নালা, জলাবদ্ধ গলি, ভাঙা ফুটপাত আর দিনের পর দিন সংস্কার না হওয়া সড়ক।

নগরীর ধাপ এলাকার চা দোকানি মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘ভাই, শহর বড় হইছে, লোক বাড়ছে। কিন্তু শহরের ব্যবস্থা আগের মতোই রইছে। বৃষ্টি হইলেই দোকানের সামনে পানি। ভোটের সময় আসেন নেতারা। ভোট শেষ, আর কেউ আসেন না। এই শহরটা একটু বাসযোগ্য হইলেই চলত।’

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল উত্তরাঞ্চলের মানুষের বড় ভরসা। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী– সব দিক থেকে রোগীরা এখানে আসেন। কিন্তু হাসপাতালের বাইরের অবস্থা দেখলে সেই ভরসার জায়গা নড়বড়ে মনে হয়।

হাসপাতালের সামনে কথা হয় লালমনিরহাট থেকে আসা আয়েশা আক্তারের সঙ্গে। তিনি তাঁর স্বামীর চিকিৎসার জন্য এসেছেন। বললেন, ‘ভোরে বাড়ি থাইকা বাইর হইছি। বাস থাইকা নামার পর মনে হইল যুদ্ধের ময়দানে নামছি। রাস্তা ভাঙা, গাড়ির গাদাগাদি। স্বামী অসুস্থ; কিন্তু হাসপাতালে ঢুকাই কষ্ট।’ তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতালে চিকিৎসা পেতে দালালদের দৌরাত্ম্য, বাইরের পরিবেশের অরাজকতা রোগীদের মন ভেঙে দেয়।’

রংপুর রেলস্টেশন শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম এটি। অথচ স্টেশন চত্বরে যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত বসার জায়গা নেই, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে নাজুক। স্টেশনের পাশে দীর্ঘদিন ধরে ভ্যান চালান অজি উল্যাহ। তিনি বললেন, ‘এই স্টেশন দিয়া হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করে। কিন্তু দেখেন, টয়লেটের অবস্থা কী, প্ল্যাটফর্মে বসার জায়গা নাই। নির্বাচন আইলেই নেতারা আসে, বলে রংপুর হবে আধুনিক শহর। কিন্তু এই স্টেশনটা আধুনিক হইল না।’
রংপুরে যানজট নতুন সমস্যা নয়। বিশেষ করে সিটি বাজার, জাহাজ কোম্পানি মোড়, মেডিকেল মোড় এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় যাবাহন থমকে থাকে। নগর পরিকল্পনার অভাবেই এই সংকট বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

রংপুর পাবলিক লাইব্রেরির সামনে কথা হয় কলেজ শিক্ষার্থী আতিকুল রহমানের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘এই শহরে পরিকল্পনা বলতে কিছু নেই। রাস্তা ছোট, গাড়ি বেশি। ফুটপাত দখল হয়ে আছে। আমরা তরুণরা চাই শহরটা একটু গোছানো হোক। কিন্তু আমাদের কথা শোনার কেউ নেই।’

অর্থনৈতিক দিক থেকেও রংপুরের চিত্র হতাশাজনক। এক সময় চিনিকল, বস্ত্রশিল্প ও কৃষিভিত্তিক ছোট কারখানাগুলো এ অঞ্চলের অর্থনীতিকে সচল রেখেছিল; এখন অধিকাংশই বন্ধ। নতুন কোনো শিল্পাঞ্চল বা বিনিয়োগ প্রকল্প হয়নি। তরুণদের কর্মসংস্থান নেই বললেই চলে। ফলে উচ্চশিক্ষা শেষে তরুণদের বড় অংশ ঢাকামুখী। একটি কোচিং সেন্টারের শিক্ষক রাশেদ মাহমুদ বললেন, ‘আমার ছাত্রদের বেশির ভাগই বলে, স্যার ঢাকায় না গেলে কিছু হবে না। রংপুরে সুযোগ কম। এই শহর তরুণদের ধরে রাখতে পারছে না।’

ভোটের রাজনীতি ও পুরোনো প্রতিশ্রুতি
সংসদ নির্বাচন সামনে এলেই রংপুরে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ে। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, আধুনিক নগরের প্রতিশ্রুতি শোনা যায় সর্বত্র। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরেও রংপুরে ভোটের প্রচারণা এখন তুঙ্গে। মাঘের হালকা শীতও ভোটার ও প্রার্থীদের উদ্দীপনা কমাতে পারেনি। শহর-গ্রাম জুড়ে সভা-সমাবেশ, মাইকিং, উঠান বৈঠক, মিছিল-মিটিং এবং ডিজিটাল প্রচারণায় সরগরম নির্বাচনী মাঠ। এবার প্রথমবারের মতো পোস্টারবিহীন নির্বাচনে বিশেষ সাড়া ফেলেছে দলের নির্বাচনী থিম সং। কিন্তু এবার ভোটারের কণ্ঠে আশাবাদের চেয়ে সন্দেহ বেশি।

নগরীর পায়লা চত্বর এলাকার বাসিন্দা রওশন আলী বলেন, ‘ভোটের সময় সবাই আসে। ভোট শেষ হইলে আর কেউ খোঁজ নেয় না।’

শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতি আওড়ান রংপুরের রাজনীতিকরা। তাঁর নাম উচ্চারণ করে জাতীয় নেতারা ন্যায়ের কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবে সেই ন্যায় কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে– এ প্রশ্ন রাখেন স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষক আবু বকর। তিনি বললেন, ‘আবু সাঈদ মারা গেল, আমরা শোক করলাম। কিন্তু রংপুরের অবস্থার কী পরিবর্তন হইছে? শহীদের নাম নিয়ে রাজনীতি হয়, তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয় না। এবার ভোটের বাক্সে মানুষ শুধু প্রার্থী বাছাই করবে না, হিসাবও চাইবে। সেই হিসাব যদি এবারও না মেলে, তবে রংপুরের দেয়ালে প্রশ্নগুলো আবার ফিরতে পারে– আরও বড় করে, আরও শক্তিশালী হয়ে।’

রংপুর জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৪৪ জন। বিএনপি সব আসনে প্রার্থী দিয়েছে। আসন সমঝোতার কারণে একটিতে এনসিপিকে সমর্থন দিয়ে বাকি পাঁচটিতে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, ইসলামী ফ্রন্ট, বাংলাদেশ কংগ্রেস, সমাজতান্ত্রিক দলসহ বিভিন্ন দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও প্রচারণা চালাচ্ছেন।

রংপুর-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম, রংপুর-৪ আসনে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এবং রংপুর-৩ আসনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে ভোটাররা হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে দেখছেন। পাশাপাশি রংপুর-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তৃতীয় লিঙ্গের আনোয়ারা ইসলাম রানী ‘হরিণ’ প্রতীকে লড়ছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায় ও উন্নয়নে কাজ করে আসছেন।

প্রচারণার মাঠে প্রার্থীরা উন্নয়নের আশ্বাস দিলেও ভোটাররা সচেতন। নবীন-প্রবীণরা মনে করছেন, নির্বাচনে নিজের পছন্দের প্রার্থীকেই বেছে নেওয়া উচিত। ভোটাররা সহিংসতামুক্ত, শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা করছেন।

তরুণ ভোটার ফাহমিদা আক্তার বলেন, ‘আমরা এমন এমপি চাই, যিনি সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াবেন এবং প্রতিশ্রুতির চেয়ে উন্নয়নে গুরুত্ব দেবেন।’

রংপুর শহরের সাতমাথা এলাকার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এবার আমরা এলাকায় বাস্তব উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের জন্য চিন্তা-ভাবনা করে ভোট দিতে চাই।’
রংপুর সদর এলাকার তাজহাটের বাসিন্দা আয়েশা ফেরদৌস বলেন, ‘এ জেলায় কোনো শিল্প-কলকারখানা, বাণিজ্যিক বন্দর, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল নেই। অথচ যে কোনো আন্দোলনে রংপুরের মানুষ সবার আগে জীবন দেয়। ফলপ্রাপ্তির বেলায় রংপুর একেবারেই শূন্য।’

প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, পরিবর্তনের ও স্বচ্ছ রাজনীতির অঙ্গীকার করছেন। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও রংপুর-২ (বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ) আসনের প্রার্থী এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘মানুষ পরিবর্তন দেখতে চায়। এবার জনগণ সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে।’ রংপুর-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু বলেন, ‘রংপুরের মানুষ এবার আবেগ নয়, বিবেকের ভিত্তিতে ভোট দেবেন।’

রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান জানান, রংপুর জেলায় মোট ভোটার ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০২ জন। জেলায় মোট ৮৭৩টি কেন্দ্রে চার হাজার ৯৮৮টি বুথে ভোট গ্রহণ হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com