রবিবার, ০১:০২ অপরাহ্ন, ২১ জুন ২০২৬, ৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

কিশোর গ্যাংয়ে ভয়াল রাজধানী

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬
  • ৬ বার পঠিত

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ রূপে বিস্তার ঘটেছে কিশোর গ্যাং। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, নগরীর ৫০ থানা এলাকায় বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে ১১৮টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ। সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, এলাকা দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব গ্রুপের সদস্যরা নিয়মিত সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। হাতে চাপাতি, রড, ছুরি, রামদা থেকে শুরু করে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে তারা ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, হামলা, অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। গত পাঁচ বছরে এসব দ্বন্দ্বে প্রাণ গেছে শতাধিক কিশোর-তরুণের, আহত হয়েছে কয়েকশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের পরও নতুন নতুন নামে গড়ে উঠছে গ্যাং, আর সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করা হচ্ছে সদস্য সংগ্রহ, যোগাযোগ ও শক্তি প্রদর্শনের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে। ফলে কিশোর গ্যাংয়ের ক্রমবর্ধমান তৎপরতায় উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে নগরজুড়ে।

পাড়া-মহল্লায় ছোট-বড় গ্রুপে বিভক্ত হয়ে প্রায় প্রতিদিনই নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। প্রকাশ্যে মহড়া দিয়ে ইভটিজিং, ছিনতাই, চুরি, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, অপহরণ- এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধেও জড়াচ্ছে তারা। নানা নামে এলাকাভিত্তিক নতুন নতুন সন্ত্রাসী বাহিনীও গড়ে তুলছে।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে সক্রিয় ১১৮টি কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ডিএমপির মিরপুর বিভাগে। সাত থানা এলাকায় এই বিভাগের ৩২টি গ্রুপের মধ্যে পল্লবী থানাতেই রয়েছে ১৪টি সক্রিয় গ্যাং। মিরপুরের পর তেজগঁাঁও বিভাগের ছয় থানা এলাকায় সক্রিয় রয়েছে ২৬টি গ্রুপ, যার মধ্যে মোহাম্মদপুর থানাতেই রয়েছে ১৬টি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, পাড়া-মহল্লা কিংবা বস্তির ছিঁচকে সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও এসব গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ছে। প্রতিটি গ্রুপে সাধারণত ৭ থেকে ২০ জন সদস্য রয়েছে, যাদের বয়স ১৪ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। তাদের হাতে দেশি অস্ত্রের পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্রও পাওয়া যাচ্ছে। বেশিরভাগ সদস্যই মাদকসেবনের সঙ্গে যুক্ত বলে তথ্য রয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নিজেদের ‘হিরো’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং এলাকায় প্রভাব বিস্তার দেখানোর প্রবণতা থেকে অনেক কিশোর তুচ্ছ ঘটনাকেও রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ দিচ্ছে। মুঠোফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার সুযোগ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমকে তারা ব্যবহার করছে সংগঠিত হওয়ার হাতিয়ার হিসেবে। বিভিন্ন গ্রুপে তথ্য ও ছবি আদান-প্রদানের পাশাপাশি হামলার নির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে অনলাইনে। নিজেদের শক্তি প্রদর্শনে খুন করতেও দ্বিধা করছে না অনেক সদস্য।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, পশ্চিমা বিশ্বের গ্যাং সংস্কৃতির প্রভাব বাংলাদেশে বহু বছর আগে প্রবেশ করলেও এর ভয়াবহতা সামনে আসে ২০১৭ সালে। রাজধানীর উত্তরায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধের জেরে ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবীর হত্যাকাণ্ডের পর কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। ওই ঘটনায় ‘ডিসকো বয়েজ’ ও ‘বিগ বস’ নামে দুই গ্রুপের সদস্যদের গ্রেপ্তারের পর রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের তথ্য সামনে আসে। পরবর্তী সময়ে অভিযানে অর্ধশতাধিক গ্যাংয়ের শত শত সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারপরও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব এবং এলাকাভিত্তিক আধিপত্যের লড়াইয়ে গত পাঁচ বছরে শতাধিক কিশোর-তরুণ নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে কয়েকশ। অনেক পরিবার হারিয়েছে সন্তানকে, আবার অনেক তরুণ জড়িয়ে পড়েছে দীর্ঘমেয়াদি অপরাধ চক্রে।

সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত ১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী বেড়িবাঁধ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাং ‘এলেক্স ইমন গ্রুপ’-এর মূল হোতা ইমন ওরফে এলেক্স ইমনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। দুই গ্যাংয়ের সংঘর্ষে তার শরীর থেকে পা বিচ্ছিন্ন করে উল্লাস করার অভিযোগও ওঠে প্রতিপক্ষ সদস্যদের বিরুদ্ধে।

এ ছাড়া গত ১১ জুন শেরেবাংলা নগর এলাকায় ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে আহত হন দুই পুলিশ সদস্য। গত মঙ্গলবার আদাবরের শেখেরটেক এলাকায় একটি বিকাশ এজেন্টের দোকানে ঢুকে সশস্ত্র ছিনতাইকারীরা প্রকাশ্যে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে প্রায় তিন লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়। পরবর্তী অভিযানে পুলিশের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার কয়েকজনের বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।

কাফরুলের ইব্রাহিমপুর এলাকায় চলন্ত মোটরসাইকেলের চালকের মাথায় ইট মেরে মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ঘটনায়ও কিশোর গ্যাং সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একইভাবে মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় সক্রিয় ‘ভইরা দে গ্রুপ’-এর সদস্যদের বিরুদ্ধে মারধর, আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক সেবন ও ইভটিজিংসহ নানা অপরাধে জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পুলিশ সূত্র জানায়, দেশে ক্ষমতার পালাবলের পর কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণকারী গডফাদার বা পৃষ্ঠপোষকও বেশিরভাগ সময় পরিবর্তন হয়। ২০২৩ সালে ঢাকা মহানগর পুলিশের তালিকানুযায়ী, ঢাকার দুই সিটির ২১ জন কাউন্সিলর কিশোর গ্যাং সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ করত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশে ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই কাউন্সিলররা আর এলাকায় নেই। তার জায়গায় অন্যরা এখন কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করছে পর্দার আড়াল থেকে।

ডিএমপির সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, রমনা বিভাগে ৬টি, লালবাগে ১০টি, ওয়ারীতে ১৩টি, মতিঝিলে ১০টি, গুলশানে ১১টি, উত্তরা বিভাগে ১০টি, মিরপুরে ৩২টি এবং তেজগাঁও বিভাগে ২৬টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বাড্ডা, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, উত্তরখান, দক্ষিণখান, উত্তরা, রামপুরা, সবুজবাগ, কামরাঙ্গীরচর ও আদাবর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা তুলনামূলক বেশি। আগে তাদের কার্যক্রম মারামারি ও স্থানীয় দাপট প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তারা মাদক ব্যবসা, অনলাইন প্রতারণা এবং ভাড়াটে হামলার মতো অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক ভাঙন, অভিভাবকের অনুপস্থিতি, মানসিক দূরত্ব এবং সামাজিক মাধ্যমে সহিংসতা ও অপরাধী জীবনধারার গ্ল্যামারাইজেশন কিশোরদের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সমাজপতি, জনপ্রতিনিধি এবং সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন বলেন, ডিএমপির তালিকা অনুযায়ী ঢাকায় ১১৮টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে এবং তালিকাটি হালনাগাদ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, পুলিশের একার পক্ষে এই গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করা দুরূহ। এ কাজে সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও স্থানীয় জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে।

রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ নয়, এটি সামাজিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঘিরে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com