দাবায়ে রাখা গেল না। বাঙালি আরও ধনে ধনাঢ্য। টাকার পাহাড় কেবল দেশে নয়, বিদেশেও। এখন আরও বুক ফুলিয়ে ঘোরা ঠেকাবে কে? মাঝেমধ্যে খামাখাই শোরগোল। আপডেট হিসাব বলছে, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকা বেড়েছে ৪১ শতাংশ। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রতি সুইস ফ্রাঁর মূল্য প্রায় ১৫২ টাকা ধরে হিসাব করলে, সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের শেষে দেশটির ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ, যা ২০২৪ সালে ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ, বাংলায় ৮ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা। এর আগের বছর ২০২৩ সালে আমানত ছিল ২৬৪ কোটি টাকা। ২০২২ সালে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ ছিল ৮২৪ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে আমানত বৃদ্ধি হয়েছিল ৩২৪৬ শতাংশ।
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক-এসএনবির বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের পর ২০২৫ সালেই সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে। আর বাংলা মুদ্রার অঙ্কে তা প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। গত এক দশকের হিসাবেও এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আমানত। ২০২৫ সালের আমানতের পরিমাণ এখন পর্যন্ত রেকর্ড হওয়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এ বৃদ্ধির ফলে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের মোট আমানত ২০২১ সালের সর্বোচ্চ ১২ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকার (৮৭ কোটি ১১ লাখ সুইস ফ্রাঁ) রেকর্ডের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। এ তথ্য সুইস ব্যাংকগুলোর সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকে জমা দেওয়া সরকারি হিসাবের তথ্য। বেসরকারি বা গোপনের হিসাব প্রকাশ্যে আসার সুযোগ নেই। তাই উপরোক্ত হিসাব সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশিদের কথিত ‘কালো টাকা’র প্রকৃত পরিমাণ নির্দেশ করে না। সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর রাখা অর্থ মূলত স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের অংশ। ব্যাংকগুলো কোথায় ভালো মুনাফা পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ বিনিয়োগ করে। বিনিয়োগের সুযোগ ও রিটার্নের ওপর নির্ভর করে ব্যাংকগুলো নিয়মিত বিভিন্ন দেশে অর্থ স্থানান্তর করে।
অন্যদিকে ব্যক্তিগত হিসাবের মাধ্যমে রাখা বাংলাদেশিদের আমানত প্রায় ১০ শতাংশ কমে ১১ দশমিক ৪ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ হয়েছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ১২ দশমিক ৬ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। একসময় গ্রাহকের গোপনীয়তার জন্য পরিচিত সুইস ব্যাংকগুলো বর্তমানে অর্থপাচার ও করফাঁকি রোধে অধিক স্বচ্ছতার নীতি অনুসরণ করছে। এ লক্ষ্যে ২০১৮ সালে অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অব ইনফরমেশন (এএইওআই) কার্যক্রম চালু করা হয়। এর আওতায় বিভিন্ন দেশের কর কর্তৃপক্ষ বিদেশে নাগরিকদের আর্থিক হিসাব সম্পর্কিত তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। ২০২৫ সালে সুইস ফেডারেল ট্যাক্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফটিএ) বিশ্বের ১০১ দেশের সঙ্গে প্রায় ৩৪ লাখ আর্থিক হিসাবের তথ্য বিনিময় করেছে। তবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) গ্লোবাল ফোরামের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশ এখনও এএইওআইয়ে অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেয়নি। প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তান দিয়েছে। সেই তথ্যদৃষ্টে ২০২৫ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সুইস ব্যাংকে সর্বোচ্চ আমানত ভারতের। ভারতীয় ব্যক্তি ও ব্যাংকগুলোর মোট আমানত ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। তা আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ কম। বাংলাদেশ দ্বিতীয় পজিশনে। বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে একমাত্র উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের। আর শতকরা হিসাবে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে আফগানিস্তানের। সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। ২০২৫ সালে ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, ভুটানসহ কয়েকটি দেশের আমানত কমলেও বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপের আমানত বেড়েছে। বুঝতে বাকি থাকছে না, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও কর ফাঁকি দিতেই এই বিশাল অঙ্কের অর্থ পাচার করা হয়েছে।
এর আগে বলা হতো, আগে সুইস ব্যাংকে আওয়ামী লীগ সরকারের নেতাকর্মীদের টাকার পাহাড় ছিল। তাহলে চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকে ৪১% হারে বৃদ্ধির টাকাগুলো কার? এ প্রশ্ন ফেলনা নয়। তা জানতে-বুঝতে জবাব পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। তা বোঝার জন্য রকেট সায়েন্সের দরকার নেই। তবে স্মরণ করার কিছু বিষয়-আশয় রয়েছে। চব্বিশে প্রফেসর ডক্টর ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পর ডক্টর দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে আর্থিক খাতের দুর্নীতি অনুসন্ধানে একটি শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি হয়েছিল। সেই কমিটি সংস্কারের জন্য ২৫টির মতো প্রস্তাব দেয়। সঙ্গে ছিল শেখ হাসিনার সময়ে ২৪০ বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ। ইউনূস সরকার সেই কমিটির প্রস্তাবনা নিয়ে তেমন এগোয়নি। মাঝেমধ্যে টাকা উদ্ধার চেষ্টার কথা জানানো হয়েছে। আর ২৪০ বিলিয়ন ডলার শব্দটি নিয়ে বক্তব্য ছোড়া হয়েছে। শেখ হাসিনার সময় টাকা পাচার হয়নি এটা শিশুরাও বিশ্বাস করবে না, টাকার অঙ্ক নিয়ে বিতর্ক আছে। সেই বিতর্কের আড়ালে গত ১ বছরে সুইস ব্যাংকে আগের তুলনায় ৪১ গুণ যে বেড়ে গেল সেটা কাদের টাকা?
ওই শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কয়েকদিন আগেও বলেছেন, ‘২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা)। প্রধানমন্ত্রী একাধিক ভাষণে বলেছেন, আর অর্থ পাচার হবে না। তিনি পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার ব্যাপারে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথাও বলেছেন। পাচারের সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারেও আছে। নিশ্চয়ই সুইস ব্যাংক বা বিদেশে টাকা ঠাটারিবাজারের মুরগিওয়ালা বা কুমিল্লার কোনো সবজিওয়ালা পাচার করেন না। শেখ হাসিনার সময় পাচার করা টাকাও টাকা, ড. ইউনূসের সময়ে পাচার করা টাকাও টাকা। তা বাংলাদেশেরই টাকা। তা আবার পরিমাণেও বেশি। হিসাবে দেখা যায়, ইউনূস আমলে আওয়ামী লীগের গড় বার্ষিক পাচারের চেয়ে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি পাচার হয়েছে। এবারের বাজেটে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসংক্রান্ত ফলো আপ তথ্য নেই।
ড. ইউনূস কথা দিয়েছিলেন, খুব দ্রুত পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা হবে। তার নিযুক্ত গভর্নর বলেছিলেন, পাচার হওয়া অর্থ ছয় মাসের মধ্যে ফেরত আনার ব্যবস্থা হচ্ছে। বেলা শেষে বলে গেছেন, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা কঠিন ব্যাপার। বর্তমান গভর্নরের কথাও তেমনই। কেবল পাচার নয়, আওয়ামী লীগ সরকার আমলে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির টাকা ফেরত আনা নিয়েও কথা কম হয়নি। একটি পর্যালোচনা কমিটিও গঠন হয়েছিল। ওই কমিটির সভাপতি ছিলেন প্রভাবশালী উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। সাবেক উপদেষ্টা ড. ফাওজুল কবির খান, সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এবং সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ও বর্তমান আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানও এ নিয়ে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলেন বলে শোনানো হয়েছিল। ড. আসিফ নজরুলের নির্দেশনায় সিআইডি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তদন্তের কাজ প্রায় সমাপ্ত করেছে। বর্তমান আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দেশে ও বিদেশের ল ফার্মগুলোর রিভিউ নেওয়া, লিগ্যাল অ্যাসেসমেন্টসহ নিউইয়র্কে মামলার অগ্রগতি অত্যন্ত প্রফেশনালি দেখভাল করেছেন। রিজার্ভ চুরির সময়ে দায়িত্বে অবহেলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিযুক্ত কর্মকর্তারা, যারা ২০২৫ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কাজ করে যাচ্ছিলেন, তাদের সবাইকে অপসারণ করেছে কমিটি। নিউইয়র্কের মামলায় বৈরী ও অতিমাত্রায় খরুচে আইনজীবীর বিপরীতে নতুন আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছে। নিয়ইয়র্কের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষেই যাতে সিআইডি চার্জশিট জমা দিতে পারে সে মতে কাজ করেছে। এ কমিটি ২০১৬ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার তদন্তকাজের অগ্রগতি ও এসংক্রান্ত সরকারি অন্যান্য পদক্ষেপের পর্যালোচনা, এ ঘটনার দায়দায়িত্ব নির্ধারণ এবং এর পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিয়েছে। এমন কর্মযজ্ঞের মাঝে এখন কী শুনতে হচ্ছে? কী দেখতে হচ্ছে?
মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
মতামত লেখকের নিজস্ব