শনিবার, ০১:২৭ অপরাহ্ন, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ২১শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

থার্ড টার্মিনাল নিয়ে সমঝোতা হয়নি

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫ বার পঠিত

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্প ঘিরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে চলমান আলোচনায় মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজস্ব বণ্টন কাঠামো ও ঝুঁকি ভাগাভাগির শর্ত। গতকাল শুক্রবার অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও এই দুই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতৈক্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। জাপানের পক্ষ থেকে সংশোধিত ও বিস্তারিত প্রস্তাব উপস্থাপন করা হলেও বাংলাদেশ সরকার তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সম্মতি দেয়নি; বরং দেশের আর্থিক স্বার্থ, দীর্ঘমেয়াদি দায় এবং অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।

বৈঠকে জাপানের সুমিতোমো করপোরেশন, হানেদা, নারিতা এয়ারপোর্ট অথরিটি (এনএএ) এবং নিপ্পন কোয়েইয়ের সমন্বয়ে গঠিত ওয়ার্কিং গ্রুপ (এসডব্লিউজি) তাদের প্রস্তাবে যাত্রী ও কার্গো খাতে নির্দিষ্ট রাজস্ব ভাগ, অগ্রিম পরিশোধিত মূল্য, এমবার্কেশন ফি, এবং একটি কাঠামোবদ্ধ ঝুঁকি-ভাগাভাগি মডেল উপস্থাপন করে।

তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, রাজস্ব নির্ধারিত প্রক্ষেপণের চেয়ে বেশি হলে বাংলাদেশ বেশি সুবিধা পাবে, আবার কমে গেলে লোকসানের একটি বড় অংশ বহন করতে হবে, যা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সতর্ক অবস্থান দেখা গেছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব প্রবাহের নিশ্চয়তা, সম্ভাব্য ঝুঁকি ও দায়বদ্ধতার ভারসাম্য- এই বিষয়গুলোতেই মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে গতকাল শুক্রবার বিকাল ৫টা ৪৫ মিনিটে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জাপানের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা অংশ নেন। জাপানের

প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ সরকারের জন্য একাধিক সুবিধা নিশ্চিত হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে- জাইকা ঋণ পরিশোধের জন্য সুরক্ষিত রাজস্ব প্রবাহ, দ্রুততম সময়ে কার্যক্রম শুরু, হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উন্নত গ্রাহক অভিজ্ঞতা ও সন্তুষ্টি, বিশ্বমানের অপারেশন নিশ্চিতকরণ, ডিজিটাল ও স্মার্ট প্রযুক্তির প্রবর্তন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, আন্তর্জাতিক রুট ও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশ-জাপান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জোরদারকরণ।

প্রস্তাবনায় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে ঝুঁকি ভাগাভাগি কাঠামো। এতে বলা হয়েছে, প্রকৃত রাজস্ব যদি নির্ধারিত প্রক্ষেপণের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়, তবে অতিরিক্ত অংশের ৭৫ শতাংশ বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) দেওয়া হবে। বিপরীতে, রাজস্ব ১০ শতাংশের বেশি কমে গেলে ঘাটতির ৭৫ শতাংশ রাজস্ব অংশ থেকে সমন্বয় করা হবে। এই কাঠামোকে পারস্পরিক দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতার একটি ভারসাম্যপূর্ণ মডেল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

আর্থিক প্রস্তাবে সি-৫ সি-৬ ও সি-৭- এই তিনটি ভিন্ন মডেল উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে অগ্রিম পরিশোধিত মূল্য, এমবার্কেশন ফি, যাত্রীপ্রতি চার্জ এবং কার্গো রাজস্ব ভাগের বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। যাত্রীসেবার ক্ষেত্রে প্রস্তাব করা হয়েছে রাজস্বের ২২.৫ থেকে ২৭ শতাংশ অথবা প্রতি যাত্রীর জন্য ২.১ মার্কিন ডলার (প্রায় ২৩১ টাকা), যেখানে প্রথম পাঁচ বছরের জন্য হার নির্ধারণ করা হয়েছে ২২.৫ শতাংশ। অন্যদিকে কার্গো খাতে প্রস্তাবিত হার ২২.৫ থেকে ২৭ শতাংশ অথবা প্রতি টনে ১১.৫ মার্কিন ডলার (প্রায় ১,২৬৫ টাকা)।

এসডব্লিউজি তাদের প্রস্তাবে উল্লেখ করেছে, এ সব আর্থিক পরিসংখ্যান তাদের সর্বোত্তম অনুমানের ভিত্তিতে প্রস্তুত এবং নির্দেশক হিসেবে দেওয়া হয়েছে। তারা জানায়, ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর এবং ২০২৬ সালের ২০ মার্চ ও ২৭ মার্চের চিঠিতে উল্লিখিত শর্তগুলো ইতোমধ্যে পূরণ করা হয়েছে। প্রস্তাবনাটি ৩০ জুন পর্যন্ত বৈধ থাকবে বলেও জানানো হয়।

উপস্থাপনায় আরও বলা হয়, জাপানের হানেদা ও নারিতা বিমানবন্দর বর্তমানে ১০০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক রুটে সেবা প্রদান করছে, যা তাদের পরিচালন সক্ষমতার প্রতিফলন। এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এসডব্লিউজি আগামী ১৫ বছরে এইচএসআইএ-তে যাত্রী ও কার্গো চাহিদা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা নিয়েছে। নতুন রুট সংযোজনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়।

অতিরিক্ত উপস্থাপনায় জাপানের পক্ষ থেকে দেখানো হয়েছে, এইচএসআইএ টার্মিনাল-৩ ওঅ্যান্ডএম প্রকল্পের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী অপারেশনাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে চায়। এতে যাত্রী ও কার্গো চাহিদা বৃদ্ধির পূর্বাভাস, সম্ভাব্য রাজস্ব উন্নয়ন, ঝুঁকি-বণ্টন কাঠামো, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ বিস্তাারিতভাবে তুলে ধরা হয়।

বৈঠকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এমবার্কেশন ফি, অগ্রিম পরিশোধিত ফি এবং রাজস্ব ভাগাভাগি কাঠামো। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেন, দেশের স্বার্থরক্ষার জন্যই আমরা বারবার এক টেবিলে বসছি। আমরা চাই যত দ্রুত সম্ভব টার্মিনাল চালু করতে। প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জাপানের প্রতিনিধিদের বাংলাদেশের প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে নতুন করে সংশোধিত প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের জাপানের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহের কথাও তুলে ধরেন।

বৈঠকে উভয় পক্ষ দ্রুত সময়ের মধ্যে আবার বৈঠকে বসার বিষয়ে আলোচনা করে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আখতার এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক প্রমুখ।

জাপানের প্রতিনিধিদলে ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনইচি এবং জাপানের ভূমি, অবকাঠামো ও পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সহকারী ভাইস মিনিস্টার রিয়েকো নাকায়ামাসহ অন্য কর্মকর্তারা।

কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো না গেলেও উভয় পক্ষ আলোচনা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে একমত হয়েছে। জাপানের প্রস্তাবিত শর্তগুলো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com