দেশজুড়ে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হামের সংক্রমণ। রাজশাহী, বরিশাল, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই ভাইরাস। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত হয়ে দেশে গতকাল বুধবার রাত পর্যন্ত ৪২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে এই তথ্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত শিশুদের ভর্তির সংখ্যা। জ্বর, কাশি, সর্দি ও লালচে ফুসকুড়ি নিয়ে ভর্তি হচ্ছে অসংখ্য শিশু। চিকিৎসকদের মতে, সংক্রমণ এখন আর বিচ্ছিন্ন পর্যায়ে নেই। এটি এখন ইতোমধ্যে কমিউনিটি পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার আগামী ৫ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, কর্মসূচি বাস্তবায়নে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে এবং দ্রুত টিকা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সারাদেশে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রী বলেন, ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী প্রায় ২ কোটি ১৯ লাখ শিশুকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে
বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রথম ডোজ টিকার বয়স ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাসে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংক্রমণের তীব্রতার কারণেই এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এটি কেবল একটি রোগের বিস্তার নয়, এটি আমাদের টিকাব্যবস্থার ফাঁকফোকরের করুণ প্রতিফলন।
এদিকে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চলতি বছর প্রায় ৭০০ শিশু ভর্তি হয়েছে, যাদের মধ্যে প্রাণ হারিয়েছে ২৩ জন। অন্যদিকে চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ১৮ শিশু ভর্তি হয়েছে, চিকিৎসাধীন মোট শিশু ৭৬। কক্সবাজার থেকে আসা ৫ মাস বয়সী
আয়েশা সিদ্দিকা আইসিইউতে মারা গেছে; নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট অপেক্ষা করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন জানান, ১১১ শিশুর নমুনা পাঠানো হয়েছে, ৮ জনে হাম শনাক্ত। সুনামগঞ্জে তিন শিশুর শরীরে হাম ধরা পড়েছে; হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছয় শিশু ভর্তি আছে। পাবনায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৮ শিশু ভর্তি হয়েছে, মোট চিকিৎসাধীন ৩০।
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে গত ২৪ ঘণ্টায় ২১ শিশু ভর্তি হয়েছে। ১৭ মার্চ থেকে মোট ১৪৩ শিশু ভর্তি, ৫ মৃত্যু, ৬৪ চিকিৎসাধীন। শনাক্ত ৪৭ শিশুর মধ্যে ৩৯ জন ময়মনসিংহের; ৮০% শিশু ৯ মাসের নিচে এখনও টিকা পাননি।
পাবনা জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় পাবনা জেনারেল হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে নতুন করে আরও ৮ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৩০ জন রোগী। হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা গুরুত্বের সঙ্গে তাদের চিকিৎসা সেবা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আমাদের সময়কে একাধিক চিকিৎসকরা বলেছেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ব্যাঘাত, অপুষ্টি আর অবহেলাই এই বিপর্যয়ের মূলে। সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম এমন একটি ভাইরাস, যা একবার ছড়াতে শুরু করলে থামানো কঠিন। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে।
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কণ্ঠে উদ্বেগ আরও স্পষ্টÑ ৯ মাসের আগেই এত শিশু আক্রান্ত হওয়া মানে সংক্রমণ এখন ঘরের ভেতর ঢুকে গেছে। এটি আর সীমিত কোনো প্রাদুর্ভাব নয়, এটি কমিউনিটি সংক্রমণ।
হামের লক্ষণ শুরু হয় সাধারণ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়ার মধ্য দিয়ে। এরপর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে লালচে ফুসকুড়ি। কিন্তু এর ভেতরেই লুকিয়ে থাকে বড় বিপদ। রোগটি শিশুর শরীরের প্রতিরোধক্ষমতা ভেঙে দেয়, ফলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দেয় যা অনেক সময় জীবন কেড়ে নেয়।
পুষ্টিবিদরা সতর্ক করছেন, অপুষ্ট শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। তাদের শরীর এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে না। ফলে একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগই হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী।
এই সংকটময় সময়ে বিশেষজ্ঞদের জোরালো আহ্বান হলোÑ কোনোভাবেই টিকাদান কর্মসূচি থেকে শিশুদের বাইরে রাখা যাবে না। অপুষ্টি মোকাবিলায় জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে। গুজব ও ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। বিশেষজ্ঞদের একটাই বার্তাÑ হাম প্রতিরোধের একমাত্র পথ হলো টিকা। সময়মতো দুই ডোজ নিলে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।
অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের শিশু চিকিৎসক ডা. বিজন কুমার বণিক আমাদের সময়কে বলেন, শিশুর শরীরে জ্বর বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে দেরি নয়, তাৎক্ষণিক চিকিৎসা নিন। আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখুন, পুষ্টিকর খাবার দিন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত এটি শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার লড়াই। আজকের অবহেলা যেন আগামী দিনের আরও বড় শোকের কারণ না হয় যায়, সতর্কতা আর সচেতনতাই এখন সবচেয়ে বড় অস্ত্র, বলছেন চিকিৎসকরা।