ঢাকার কড়াইল বস্তি। গতকাল মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) সন্ধ্যা সোয়া ৫টা। হঠাৎ একটি ঘর থেকে আগুনের ফুলকি উঠতেই মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়লো লেলিহান শিখা। ঘিঞ্জি গলি, প্লাস্টিক-টিন-কাঠের ঘর, শুষ্ক হাওয়া – সব মিলিয়ে আগুন যেন দানব হয়ে গিলে নিলো পুরো বস্তির দেড় হাজারের বেশি ঘর। রাত সাড়ে ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ততক্ষণে সব শেষ।
আজ বুধবার (২৬ নভেম্বর) সকালে ছবিটা ভয়ঙ্কর। যেদিকে চোখ যায় শুধু ছাই আর পোড়া টিনের স্তূপ। এখনো ধোঁয়া উড়ছে, গন্ধে শ্বাস বন্ধ হওয়ার জোগাড়। হাজার হাজার মানুষ খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। কেউ ছেঁড়া ত্রিপল বিছিয়ে মাথা গুঁজেছে, কেউ ভিজে কাপড় শুকোচ্ছে, কেউ আবার পোড়া ধ্বংসস্তূপে হাতড়ে খুঁজছে – কিছু বাকি আছে কি না।
শাফিয়া বেগমের চোখে জল আর ক্ষোভ মিশে একাকার। তিনি বললেন, ‘আমার গতর খাটা টাকা, সব পুড়্যা গেলো। জীবনভর যা জমাইছি, যা দিয়া ছেলে-মেয়ের মুখে দুই মুঠো ভাত তুলে দিতাম – এক রাতেই ছাই। কাল রাতে না খাইয়া কাটাইছি। একটা কম্বলও জোটে নাই। শীতে গা কাঁপছে, পেটে ক্ষুধা জ্বলছে, আর এই ছাইয়ের গন্ধে ঘুম আসে না।’
পাশেই রিকশাচালক আব্দুল করিম। আগুন লাগার আগে মুহূর্তে ঘরের কয়েকটা টিন সরাতে পেরেছিলেন, বাকি সব গেল। তিনি বললেন, ‘বউ-পোলাপান নিয়া খোলা আকাশের নিচে শুইছি। কাল থেকে আজ অবধি এক মুঠো খাবারও কেউ দেয় নাই। লোকজন আসছে, ফটো তুলে চলে যাচ্ছে, কিন্তু যে জিনিসটা দরকার – খাবার, কম্বল, ওষুধ– তা কেউ আনে নাই।’
শিশু আর বৃদ্ধদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। ঠান্ডায় কাঁপছে শরীর, অনেকের জ্বর এসেছে। খাবার নেই, পানি নেই, ওষুধের তো প্রশ্নই ওঠে না।
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, বৌবাজার এলাকার একটি ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত। সরু গলি, যানজট আর পানির উৎসের অভাবে প্রথমে মাত্র ৩টি ইউনিট পৌঁছালেও বড় গাড়ি ঢুকতে পারেনি। পরে ১৯টি ইউনিট এলেও ৫ ঘণ্টার বেশি লেগেছে আগুন পুরোপুরি নেভাতে। প্রাথমিক হিসেবে ১৫০০-র বেশি ঘর পুড়েছে, তদন্তের পর সঠিক সংখ্যা জানা যাবে।
এক রাতের আগুনে কড়াইল বস্তির হাজারো মানুষ এখন রাস্তায়। যাদের জীবনে কখনো ‘বাড়তি’ কিছু ছিল না, তাদের সেই সামান্য ‘সব’টুকুও কেড়ে নিলো আগুন। এখন তাদের চোখে শুধু একটাই প্রশ্ন – আজ রাতে মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে কোথায়? পেট ভরবে কী দিয়ে?