বরিশালের গৌরনদীতে গ্রাম্য সালিশের দুই দিন পর গীতা রানী দাস (৩০) নামের এক যুবতীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সালিশের পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পর রোববার বিকেলে বাবার বাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়। পরে গ্রামবাসী মৃত্যুর ঘটনাকে রহস্যজনক দাবি করায় পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর ইউনিয়নের ঘেয়াঘাট গ্রামে। গীতা রানী ওই গ্রামের দিনমজুর গোপাল চন্দ্র দাসের মেয়ে।
মৃতের স্বজন, স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দেড় বছর ধরে একই এলাকার লক্ষণ শীলের ছেলে সঞ্জয় শীলের সঙ্গে গীতা রানীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। একপর্যায়ে তাঁরা শাখা-সিঁদুর ও মালা বদল করে কথিত বিয়ে করেন। প্রায় দেড় মাস আগে গীতা একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। এরপর সঞ্জয় ও তাঁর পরিবার গীতা ও নবজাতক সন্তানকে মেনে নিতে অনীহা প্রকাশ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন মাতব্বর ও হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকজন ব্যক্তির উদ্যোগে প্রথম দফায় সালিশ বৈঠক হয়। সেখানে গীতা রানীকে স্ত্রী হিসেবে এবং তাঁর নবজাতক কন্যাসন্তানকে মেনে নিয়ে বাড়িতে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় বলে স্বজনদের দাবি। পরে সঞ্জয় ও তাঁর পরিবার ১৫ দিনের মধ্যে গীতা ও তাঁর সন্তানকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিয়ে সালিশস্থল ত্যাগ করেন। তবে পরবর্তী সময়ে সঞ্জয় ওই সিদ্ধান্ত না মেনে আত্মগোপনে চলে যান বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এরপর গত ১১ সেপ্টেম্বর বাটাজোর ইউনিয়নের আজাদ প্যাদার নেতৃত্বে দ্বিতীয় দফায় সালিশ বৈঠক বসে বলে স্থানীয়দের দাবি। ওই বৈঠকে সঞ্জয় ও গীতার সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত হয় এবং গীতা রানীকে দেড় লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তাঁর স্বজনেরা।
মৃতের স্বজনদের অভিযোগ, প্রথম দফার সালিশে গীতাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও পরে তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। দ্বিতীয় দফার সালিশের সিদ্ধান্তের পর গীতা মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়েন। অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে বাটাজোরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত রোববার বিকেল ৫টার দিকে বাবার বাড়িতেই তাঁর মৃত্যু হয়।
তবে গীতার বাবা গোপাল চন্দ্র দাস বলেন, তাঁর মেয়ে দীর্ঘদিন ধরেই শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন।
গীতার একমাত্র ভাই শিবাস চন্দ্র দাস বলেন, তাঁর বোনের আগে আরেকটি বিয়ে হয়েছিল। ওই সংসারে অনু দাস নামে ১০ বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। বিবাহবিচ্ছেদের পর গীতা ও তাঁর মেয়েকে নিয়ে তাঁরা একসঙ্গে বসবাস করতেন। পরে সঞ্জয় শীলের সঙ্গে গীতার সম্পর্ক হয় এবং তাঁদের একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। সঞ্জয় ও তাঁর পরিবার গীতা ও সন্তানকে মেনে না নেওয়ায় সালিশ বসে। সেখানে দেড় লাখ টাকা জরিমানা করে সম্পর্কের ইতি টানা হয় বলে দাবি করেন তিনি। এরপর থেকেই তাঁর বোন মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়েছিলেন বলে জানান শিবাস।
তবে সালিশে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাটাজোর ইউনিয়নের আজাদ প্যাদা। তিনি বলেন, “এ ঘটনার কোনো সালিশ আমি করিনি। এমনকি এ বিষয়ে কোনো রায়ও দিইনি।”
গৌরনদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তারিক হাসান রাসেল বলেন, “গ্রামবাসী গীতা রানীর মৃত্যুর বিষয়টি রহস্যজনক দাবি করায় মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য থানায় আনা হয়েছে।”
তিনি জানান, সোমবার সকালে মরদেহ বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। পাশাপাশি ঘটনাটি নিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে।
এ জাতীয় আরো খবর..