সোমবার, ০২:০২ অপরাহ্ন, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, [bangla_date] , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

সার নিয়ে ‘অসার’ ভাবনা

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার পঠিত

আমন মৌসুম সামনে রেখে মাঠে কৃষকের ব্যস্ততা বাড়ছে। জমি প্রস্তুতের পর চারা রোপণ হয়েছে কিংবা হচ্ছে; এখন ধানের কাঙ্ক্ষিত ফলনের জন্য সময়মতো সার প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ ঠিক এ সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সার নিয়ে অস্থিরতার খবর আসছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় কৃষকদের ভোগান্তির চিত্র উদ্বেগ তৈরি করেছে।

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সম্প্রতি যে ঘটনা ঘটেছে, সেটি শুধু একটি ডিলারের গোডাউন ভাঙার ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সার না পাওয়ার অভিযোগে কৃষকরা ডিলার পয়েন্টে জড়ো হন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর একপর্যায়ে গোডাউনের দরজা ভেঙে প্রায় ১৯৭ বস্তা সার নিয়ে যান। পরে প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বরাদ্দ, উত্তোলন ও স্থানীয় চাহিদার মধ্যে ব্যবধানের কথাও উঠে এসেছে। অবশ্য কোনো অবস্থাতেই গোডাউন ভেঙে সার নিয়ে যাওয়াকে বৈধ বা গ্রহণযোগ্য বলা যায় না। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এমন ঘটনা সাধারণত হঠাৎ করে হয় না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক দুর্বলতা কিংবা সরবরাহব্যবস্থার ত্রুটি। তাই গোডাউনের দরজা ভাঙার ঘটনায় শুধু কৃষকদের দায়ী করে বিষয়টি শেষ করে দিলে সমস্যার মূল কারণটি অদৃশ্যই থেকে যাবে।

সরকারের বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে সারের কোনো সংকট নেই; চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও বলেছেন, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত আছে এবং ঘাটতি এড়াতে আমদানির অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। একই কথা বলেছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদও।

সরকারের এ বক্তব্য সত্য হলে মাঠপর্যায়ে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, মজুত যদি থাকে, তাহলে কৃষকের হাতে সার পৌঁছাচ্ছে না কেন? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু সরকারি গোডাউনের হিসাব দেখলে চলবে না। দেখতে হবে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা। কার জন্য কত সার বরাদ্দ হয়েছে, কতটা উত্তোলন করা হয়েছে, কোন এলাকায় কত চাহিদা, ডিলারের গোডাউনে কত সার আছে, কতটা বিক্রি হয়েছে এবং কৃষক শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত দামে সার পেয়েছেন কি না, প্রতিটি ধাপের হিসাব স্বচ্ছ হতে হবে। কারণ কাগজে-কলমে পর্যাপ্ত মজুত থাকা আর কৃষকের জমির জন্য পর্যাপ্ত সার থাকা এক কথা নয়।

একজন কৃষকের কাছে সরকারি গোডাউনে থাকা সার কোনো কাজে আসে না, যদি সেটি তার ইউনিয়নের ডিলার পয়েন্টে সময়মতো না পৌঁছায়। আবার ডিলারের গোডাউনে সার থাকলেও কৃষক যদি নির্ধারিত দামে তা না পান, তাহলেও সেই মজুতের বাস্তব মূল্য কৃষকের কাছে শূন্য। এখানেই বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। কৃষকদের অভিযোগ, কোনো কোনো জায়গায় সার থাকার পরও কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। ফলে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে খুচরা বাজার থেকে সার কিনতে হচ্ছে। অন্যদিকে ডিলাররা দাবি করছেন, তাদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে না। দুই পক্ষের বক্তব্য যখন পরস্পরবিরোধী, তখন সরকারের দায়িত্ব হলো দ্রুত মাঠপর্যায়ে প্রকৃত তথ্য বের করে আনা। কে সত্য বলছেন, কে মিথ্যা বলছেন—এটি অনুমানের বিষয় নয়। হিসাব মিলালেই উত্তর পাওয়া সম্ভব।

এখানে আরও একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সারের ডিলারশিপ ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন এসেছে। চলতি বছরের এপ্রিলে আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া সব সার ডিলারের নিয়োগ বাতিল করে নতুন ডিলার নিয়োগের কথা জানিয়েছিল সরকার। এ পরিবর্তন প্রশাসনিকভাবে প্রয়োজনীয় হতে পারে। অতীতে কোনো ডিলার রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে অনিয়ম করে থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। কিন্তু একটি পুরোনো ব্যবস্থাকে বাতিল করে নতুন ব্যবস্থা চালু করলেই যে নতুন ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যাবে, এমন নয়। বরং পরিবর্তনের সময়ই সরবরাহব্যবস্থায় সাময়িক জটিলতা তৈরি হতে পারে। সরকারের তথ্য উপদেষ্টাও সার বিপণন ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের কারণে কৃষক পর্যায়ে সাময়িক প্রভাব পড়ার কথা বলেছেন। কিন্তু ‘সাময়িক প্রভাব’ কথাটি কৃষকের জন্য খুব স্বস্তিদায়ক নয়। কারণ আমন চাষের সময়টা সাময়িক নয়। ধানের চারা সার প্রয়োগের নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষা করে না। সময়মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি না পেলে উৎপাদন কমতে পারে। আর উৎপাদন কমলে শুধু কৃষক নয়, শেষ পর্যন্ত বাজার, ভোক্তা এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে। তাই সার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হলে সেটি করতে হবে কৃষকের প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে। পুরোনো ডিলার বাদ দিয়ে নতুন ডিলার নিয়োগ করা হলো কি না, এটি মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হলো নতুন ব্যবস্থায় কৃষক আগের চেয়ে সহজে, স্বচ্ছভাবে এবং নির্ধারিত দামে সার পাচ্ছেন কি না।

এখানে আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে; যে কোনো সমস্যার জন্য আগের সরকারের সময়ের ডিলারদের দায়ী করা। অতীতে কারা কী করেছেন, সেটি তদন্ত হতে পারে। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে শাস্তিও হতে হবে। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী করে বর্তমান সমস্যার ব্যাখ্যা দেওয়া কোনো সমাধান নয়। কারণ কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোই আসল কথা। কোনো ডিলার আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পেয়েছেন, নাকি বর্তমান সময়ে নিয়োগ পেয়েছেন, কৃষকের কাছে তার গুরুত্ব নেই। কৃষক জানতে চান, তিনি তার জমির জন্য প্রয়োজনীয় সার পাবেন কি না এবং কত দামে পাবেন।

সরকারের উচিত এখনই একটি স্বচ্ছ ও দ্রুত যাচাই ব্যবস্থা চালু করা। প্রতিটি ইউনিয়নভিত্তিক চাহিদা, বরাদ্দ, উত্তোলন ও বিক্রির তথ্য প্রকাশ করা যেতে পারে। ডিলার পয়েন্টে দৃশ্যমানভাবে সার বরাদ্দ ও বিক্রয়মূল্য টাঙিয়ে রাখা দরকার। কৃষকের অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রয়োজনে মোবাইল নম্বর বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অভিযোগ নিয়ে দ্রুত তদন্ত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—মজুতের হিসাব নয়, কৃষকের হাতে পৌঁছানো সারের হিসাব দেখতে হবে। কোনো এলাকায় চাহিদা যদি বরাদ্দের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে সেখানে দ্রুত অতিরিক্ত সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। আবার কোনো ডিলারের গোডাউনে সার থাকার পরও কৃষক না পেলে তার হিসাব পরীক্ষা করতে হবে। মজুত লুকিয়ে রাখা, কৃত্রিম সংকট তৈরি করা, অতিরিক্ত দামে বিক্রি কিংবা পাচারের প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকদেরও বুঝতে হবে, ক্ষোভ থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনো সমাধান নয়। গোডাউন ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বড় বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। তবে প্রশাসনেরও মনে রাখতে হবে, শুধু আইন প্রয়োগ করে কৃষকের ক্ষোভ থামানো যায় না। সমস্যার কারণ দূর করতে হয়।

কুড়িগ্রামের ঘটনা তাই সরকারের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মাঠপর্যায়ের সরবরাহব্যবস্থা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। প্রশাসন যদি এখনই তদন্ত করে প্রকৃত কারণ বের করতে পারে, তাহলে আমন মৌসুমে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব। আমাদের মনে রাখতে হবে, কৃষকের জন্য সার কোনো বিলাসী পণ্য নয়। এটি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপকরণ। সময়মতো সার না পেলে কৃষক শুধু আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন না, দেশের খাদ্য উৎপাদনও ঝুঁকিতে পড়ে। সরকার বলছে, সার আছে। কৃষক বলছেন, সার নেই। এই দুই বক্তব্যের মাঝখানেই আসল সত্যটি লুকিয়ে আছে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, মাঠের বাস্তবতা যাচাই করা। কোথায় সার আছে, কোথায় নেই; তার নির্ভুল মানচিত্র তৈরি করতে হবে। কোথায় সরবরাহ আটকে আছে, কোথায় ডিলার অনিয়ম করছে, কোথায় বরাদ্দ কম, কোথায় চাহিদা বেড়েছে; সবকিছু দ্রুত শনাক্ত করতে হবে। সার গোডাউনে পড়ে থাকার জন্য নয়; কৃষকের জমিতে পৌঁছানোর জন্য। তাই সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো কৃষকের হাতে নির্ধারিত দামে, নির্ধারিত সময়ে সার পৌঁছে দেওয়া। কোনো ডিলার কারসাজি করলে তার রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আবার সরবরাহ ঘাটতি থাকলে সেটিও স্বীকার করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। আমন মৌসুমে কৃষক যেন সারের জন্য দিনের পর দিন ডিলারের দোকানে দাঁড়িয়ে না থাকেন, বেশি দামে খোলা বাজার থেকে সার কিনতে বাধ্য না হন কিংবা শেষ পর্যন্ত ক্ষোভে গোডাউনের দরজা ভাঙার মতো পরিস্থিতিতে না পৌঁছান, সেই দায়িত্ব সরকারেরই। কারণ শেষ বিচারে প্রশ্নটি শুধু সারের নয়। প্রশ্নটি কৃষকের আস্থা, কৃষি উৎপাদন এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তার। সুতরাং এখন আর ‘সংকট আছে কি নেই’—এই বিতর্কে সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। সংকট যদি নাই থাকে, তাহলে কৃষকের হাতে সার নেই কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর সরকারকে মাঠে গিয়ে দিতে হবে।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, দৈনিক কালবেলা

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com