ইরানের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি খোলা রয়েছে বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও ইরান জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কৌশলগত এই জলপথ বন্ধ থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা ইরানের বিভিন্ন স্থানে ১৪০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী একটি জাহাজ অনুমোদনহীন পথ ব্যবহার করায় ইরানি বাহিনী সেটিতে হামলা চালিয়েছিল। এর জবাব হিসেবেই এসব হামলা চালানো হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। রবিবার (১২ জুলাই) ভোরে দেশটি ঘোষণা দেয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রণালিটি বন্ধ থাকবে।
আইআরজিসি জানায়, তারা জর্ডানে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন জানিয়েছে, তারা ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার জবাব দিয়েছে।
কাতার, যা যুদ্ধবিরতি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে, এপ্রিলের পর এবারই প্রথম হামলার মুখে পড়েছে। আর মে মাসের পর প্রথমবার হামলার শিকার হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
রবিবার সন্ধ্যায় সেন্টকম নতুন করে ইরানে হামলার ঘোষণা দেয়। তারা জানায়, স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা (ইস্টার্ন টাইম) থেকে অভিযান শুরু হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে বেসামরিক নাবিক ও বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলে হামলা চালানোর সক্ষমতা দুর্বল করতে এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
ওইদিন বিকেলে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানায়, উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপের দিকে ‘শত্রুপক্ষ’ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। দ্বীপটিতে আইআরজিসির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি রয়েছে।
নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাত গত মাসে হওয়া অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। ওই চুক্তির লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সংঘাতের স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানো।
সপ্তাহের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের হামলার ফলে যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন।
তবে ট্রাম্প জানিয়েছেন, আলোচনা অব্যাহত থাকবে এবং মধ্যস্থতাকারীরা শান্তি প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছেন।
মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের জানিয়েছে, সপ্তাহের শুরুতে তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা ভুলবশত ঘটেছে এবং এর জন্য তারা দেশের অভ্যন্তরের একটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা গোষ্ঠীকে দায়ী করেছে।
সর্বশেষ সংঘাতের সূত্রপাত হয় আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী, অনুমোদনহীন পথে চলাচলের চেষ্টা করা একটি জাহাজে তারা নৌবাহিনীর ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার পর।
সেন্টকমের দাবি, আইআরজিসি সাইপ্রাসের পতাকাবাহী একটি জাহাজে প্রকাশ্যে হামলা চালায়। ইঞ্জিন কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জাহাজটি আর যাত্রা চালিয়ে যেতে পারেনি।
মার্কিন পক্ষ আরও জানিয়েছে, এমভি জিএফএস গ্যালাক্সি জাহাজের একজন নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, সামরিক কর্তৃপক্ষ তাদের জানিয়েছে যে জাহাজটির নাবিকরা জাহাজ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন এবং বর্তমানে তারা একটি লাইফবোটে অবস্থান করছেন।
সেন্টকম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় জানায়, বাণিজ্যিক জাহাজে আগের হামলার জন্য জবাবদিহির পর ইরানকে সমঝোতা স্মারক মেনে চলার আরেকটি সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেশটি আবারও তা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তাদের হামলায় ইরানের ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন স্থাপনা, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্রও রয়েছে।
এই বিবৃতি শেয়ার করে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ লেখেন, ‘ইরান ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন তার মূল্য দিতে হবে।’
অন্যদিকে আইআরজিসি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণ উপকূলের কয়েকটি ঘাঁটি এবং টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলা চালিয়েছে।
জবাবে ইরান জানায়, তাদের প্রতিশোধমূলক অভিযানের প্রথম ধাপে জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, ওই ঘাঁটির কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং এমকিউ-৯ ড্রোনের হ্যাঙ্গার ধ্বংস করা হয়েছে।
রবিবার সেন্টকম আবারও দাবি করে, হরমুজ প্রণালি খোলা রয়েছে এবং সেটি সচল রাখতে মার্কিন বাহিনী প্রস্তুত অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এক্সে লেখেন, ‘একতরফা চুক্তির যুগ শেষ।’
তিনি আরও লেখেন, ‘আমরা বলেছিলাম, কথা রাখুন, নইলে মূল্য দিতে হবে। বাস্তবতা এখন আপনার দরজায় কড়া নাড়ছে।’