মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম মঙ্গলবার সামান্য বেড়েছে। তবে বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং বৈশ্বিক চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে মূল্যবৃদ্ধি সীমিত রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।
মঙ্গলবার গ্রিনিচ মান সময় (জিএমটি) ৩টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩৮ সেন্ট বা ০ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৭২ দশমিক ৩৭ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ৩০ সেন্ট বা ০ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৬৮ দশমিক ৮৫ ডলারে পৌঁছায়। সোমবার উভয় বেঞ্চমার্কের দাম ইরান-সংঘাত শুরুর আগের পর্যায়ের কাছাকাছি নেমে এসেছিল।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, সরবরাহ পুনরুদ্ধারের অগ্রগতির কারণে তাৎক্ষণিক ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির প্রভাব কমেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের অনিশ্চয়তার কারণে বর্তমান যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে বাজার এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
তিনি বলেন, এখন বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি থাকবে বিশেষ করে চীনের জ্বালানি চাহিদা কতটা বাড়ে, সেদিকে। কারণ সরবরাহ নিয়ে ইতিবাচক খবরের বড় অংশই বাজার ইতোমধ্যে মূল্যায়ন করেছে। ফলে তেলের দামের পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে প্রকৃত চাহিদা প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় কি না, তার ওপর।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা অব্যাহত
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ওয়াশিংটন হয় ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাবে, নয়তো ফের হামলা করবে। অন্যদিকে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা শেষে ইরানও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এবং উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি স্বাভাবিক হওয়ার অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বিনিয়োগকারীরা।
অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে, দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সোমবার রাতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী অন্তত দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এতে জাহাজ দুটি উল্লেখযোগ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
মঙ্গলবার জাপানের মালিকানাধীন কয়েকটি সুপারট্যাংকার, যেগুলো সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল বহন করছিল, সেগুলো উপসাগর ছেড়ে হরমুজ প্রণালির দিকে অগ্রসর হতে দেখা গেছে। এর আগে একদিন আগে আটকে থাকা আরও কয়েকটি জাহাজও ওই পথ দিয়ে যাত্রা শুরু করে।
সরবরাহ স্বাভাবিক হতে সময় লাগছে
এএনজেড ব্যাংকের বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কিছুটা বাড়লেও তেল পরিবহন প্রত্যাশার তুলনায় ধীরগতিতে স্বাভাবিক হচ্ছে।
তাদের মতে, প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচলের প্রাথমিক পুনরুদ্ধার এখন স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন পারাপারকারী জাহাজের সংখ্যা এখনো এক অঙ্কেই সীমাবদ্ধ রয়েছে এবং ধারাবাহিকভাবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকেরা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অন্তর্বর্তী সমঝোতা তাৎক্ষণিক ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমালেও জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ফলে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে।
উৎপাদন বাড়াচ্ছে ওপেক প্লাস
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত জুন মাসে দৈনিক ৩৮ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করেছে, যা এপ্রিল ২০২০ সালের পর সর্বোচ্চ। এটি ইরান-সংঘাত শুরুর আগের উৎপাদন মাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
অন্যদিকে সৌদি আরব ও রাশিয়াসহ ওপেক প্লাস জোট রোববার আগস্ট থেকে দৈনিক আরও ১ লাখ ৮৮ হাজার ব্যারেল উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে জুন ও জুলাই মাসেও একই পরিমাণ উৎপাদন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছিল।
এছাড়া সৌদি আরব এশিয়ার ক্রেতাদের জন্য আগস্ট মাসে তাদের প্রধান আরব লাইট অপরিশোধিত তেলের সরকারি বিক্রয়মূল্য (ওএসপি) ওমান/দুবাই গড় মূল্যের তুলনায় ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৫০ ডলার কমিয়েছে। আগের মাসের তুলনায় এটি ১ দশমিক ১০ ডলারের হ্রাস, যা দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় মূল্যছাড়গুলোর একটি বলে জানিয়েছে সৌদি আরামকো।