আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। একইদিন হবে গণভোটও। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কারে জনমত নেওয়ার লক্ষ্যে এ গণভোট হবে। এমন পরিস্থিতিতে গণভোটে ‘হ্যাঁ’কে জয়ী করতে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ইতিমধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে জনগণের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারে ভোটের গাড়ি উদ্বোধন করেছে। জামায়াত ও এনসিপির শঙ্কা বিএনপি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাবে কি না? এনসিপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, জুলাই সনদে স্বাক্ষর করলেও একটি দল গণভোটে ‘না’ ভোটের পক্ষে কাজ করছে। তবে বিএনপি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হলে বিএনপি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাবে।
গণভোটের বিষয়ে বিএনপি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও দলটির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশে সংস্কারের অগ্রপথিক বিএনপি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সদ্য প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপাররসন খালেদা জিয়া যখনই ক্ষমতায় গেছেন, তখনই সংস্কার এনেছেন বিভিন্ন সেক্টরে। এরই ধারাবাহিকতায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার বাস্তবায়নে সংস্কারের পক্ষে। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হলে নির্বাচনের পাশাপাশি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাবে বলে সিদ্ধান্ত রয়েছে।’
এদিকে গতকাল কক্সবাজারের পেকুয়ায় এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে আছে। ঐকমত্যের ভিত্তিতে যে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা আমরা অক্ষরে অক্ষরে প্রত্যেকটি প্রস্তাব বাস্তবায়ন করব। জুলাই সনদের বাইরে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। যেটা জাতীয়ভাবে ঐকমত্য হবে, সেই বিষয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ।’
এর আগে গত মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বাংলা মোটরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারে ‘ভোটের গাড়ি’ উদ্বোধন করেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। অনুষ্ঠানে গণভোটে যারা ‘না’-এর পক্ষে যাবেন, তারা সংসদ নির্বাচনে জিততে পারবেন না বলে সতর্ক করেন তিনি।
“আগামী সংসদ নির্বাচনে জিততে হলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে থাকতে হবে” এমন মন্তব্য করে নাহিদ ইসলাম বলেন, “এ ভুল করার চেষ্টা করবেন না। যদি ‘না’ ভোটের পক্ষে চলে যান, জনগণের বিপক্ষে চলে যাবেন। নির্বাচনেও জয়ী হতে পারবেন না বলে বিশ্বাস করি। নির্বাচনে জয়ী হতে হলে অবশ্যই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে থাকতে হবে। সংস্কারের পক্ষে থাকতে হবে।”
গত শুক্রবার রাতে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে স্থায়ী কমিটির সভা হয়। সভায় তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা, সিলেট থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করা এবং তারেক রহমানের বগুড়া ও রংপুর সফর স্থগিত করা ছাড়াও সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করতে প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনে যান। সেখানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে নজরুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেন, “গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়াই বিএনপির সিদ্ধান্ত। আসন্ন নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে গণভোট আয়োজিত হলে বিএনপি তাতে ইতিবাচক সাড়া দেবে, আমরা সবার আগে সংস্কার চেয়েছি।”
গত সোমবার রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভারস আইজাবস। সাক্ষাৎ শেষে সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত আমির দেশবাসীকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।
তিনি বলেন, “আমরা আবারও বলি, আমরা সংস্কারের পক্ষে। অতএব আমরা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে। আমরা জানি, দেশবাসী সংস্কার চায়, তাদের আমরা অনুরোধ করব দলীয় ভোট আপনি যাকে খুশি দেবেন, তবে দেশের স্বার্থে আপনি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন।”
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে সাত মাস ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনার পর গত বছর ১৭ অক্টোবর ঢাকায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘জুলাই জাতীয় সনদ, ২০২৫’ স্বাক্ষরিত হয়। সেদিন ২৪টি দল সনদে সই করে, পরে আরও একটি দল সই করেছে। তবে এনসিপি জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যায়নি, পরেও আর সনদে সই করেনি।
কোন কোন বিষয় নিয়ে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোট : গণভোটে যে চারটি বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোট থাকবে সেগুলো হলো ক. নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। খ. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। গ. সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন। ঘ. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে। এগুলোর ওপর ভিত্তি করে যে প্রশ্নটি তৈরি করা হয়েছে সেটি হলো ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’ অর্থাৎ, উল্লিখিত চারটি বিষয়েই যদি আপনি সম্মত হন তাহলে প্রশ্নটির উত্তরে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন। আর চারটি বিষয়েই অসম্মত হলে দেবেন ‘না’ ভোট। এখানে উল্লেখ্য, চারটি বিষয়ের এক-দুটিতে সম্মত কিংবা অসম্মত হওয়ার সুযোগ নেই। ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার অর্থ দাঁড়াবে আপনি চারটি বিষয়েই সম্মত হয়েছেন। বিপরীত অর্থ দাঁড়াবে ‘না’ ভোট দিলে।
সরকারের উদ্যোগ : সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের পেজে গণভোটের ‘হ্যাঁ’তে সিল দিন এরকম একটি ফটোকার্ড শেয়ার করার পাশাপাশি ভিডিও চিত্রেও জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই ভিডিওচিত্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনকারী, নিহতদের পরিবারের সদস্য, গুম কমিশনের সদস্যের বরাতে ‘হ্যাঁ’ ভোট কেন দিতে হবে সেটির ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে কী পাওয়া যাবে সেটির বিস্তারিত উল্লেখ করে, ‘না’ ভোট দিলে কিছুই পাওয়া যাবে না এমন প্রচারণাও চালাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। এমনকি ব্যাংক কর্মকর্তা, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করতে গত বছর ১৩ নভেম্বর আলী রীয়াজকে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণায় নেমেছেন। গত সোমবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ অডিটরিয়ামে ‘গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ’ বিষয়ে বিভাগীয় মতবিনিময় সভা হয়। এতে রাজশাহী বিভাগের প্রশাসনের কর্মকর্তারা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, “গণভোট শুধু আগামী পাঁচ বছরের জন্য নয়; বরং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের পূর্ণ প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য।’ তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশন কীভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করবে এসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জনগণের ম্যান্ডেটের মাধ্যমেই নিতে হবে। এ কারণেই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে এবং নাগরিক হিসেবে সবার দায়িত্ব গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে থাকা।”
আলী রীয়াজ বলেন, ‘গণভোট নিয়ে সব রাজনৈতিক দলও একমত। কারণ, এটি জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত গ্রহণের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। দেশের চাবি এখন জনগণের হাতে। আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে সেটি পুরোপুরি জনগণকেই নির্ধারণ করতে হবে।’
রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার আ ন ম বজলুর রশীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এসএম আব্দুর রাজ্জাক, রাজশাহীর রেঞ্জ ডিআইজি মো. শাহজাহান, রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার জিল্লুর রহমান।
এদিকে গণভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে। গত ৫ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে পাঠানো একটি চিঠির ভিত্তিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর সপ্তাহখানেক পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে জোর দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এক চিঠির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে প্রতিটি শাখায় ব্যানার টানিয়ে গণভোটে মানুষকে উৎসাহিত করতে অনুরোধ করেছে। এ বিষয়ে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, সম্প্রতি এক বৈঠকে তাদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানোর জন্য বলা হয়েছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহীদের (সিইও) স্পষ্টভাবেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কাজ করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে কাজ করা এনজিওগুলোকে অর্থ দেওয়ার জন্যও ব্যাংকগুলোকে অনুরোধ করা হয়েছে। এবিবি এ কাজে সহায়তা করবে।