রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন কেউ না কেউ তাদের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রাণও যাচ্ছে কারও কারও। রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১,২০০ থেকে ১,৪০০ মানুষ কুকুর-বিড়ালে আক্রান্ত হয়ে টিকা নিতে ভিড় করছেন। তবে ২০২২ সাল থেকেই বন্ধ রয়েছে বেওয়ারিশ কুকুরের টিকা কার্যক্রম। থমকে আছে কুকুরের জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও। বর্তমানে দেশে কী পরিমাণ বেওয়ারিশ কুকুর রয়েছে তারও নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। এ ছাড়া দেশে এখন কুকুর-বিড়াল পালনের হারও বেড়েছে। তবে নেই কোনো নীতিমালা। ঘরে-বাইরে সবখানেই রয়েছে প্রাণঘাতী জলাতঙ্কের ঝুঁকি। নতুন করে আতঙ্ক বাড়িয়েছে এই রোগে আক্রান্তের হার ও মৃত্যু বৃদ্ধি।
সম্প্রতি কুকুরের কামড়ে গাইবান্ধায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। আরও কয়েকজন চিকিৎসাধীন। একটি পাগলা কুকুর কামড়ালে তারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে টিকা নিতে যান। কিন্তু টিকা না পেয়ে বাইরে থেকে টিকা কিনে দেন। তবে সেই টিকায় কাজ হয়নি। অবশ্য গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. দিবাকর বসাক দাবি করেছেন, আক্রান্তরা টিকা নিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাননি।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এফ এ আসমা খান জানান, কুকুর-বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ১৪শ মানুষ সেখানে যায়। এখন টিকার সংকট নেই। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত এই হাসপাতালে ছয়জন মারা গেছেন। বর্তমানে এক শিশু চিকিৎসাধীন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের আরেক চিকিৎসক জানান, চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। প্রতিদিন প্রচুর মানুষ টিকা নিতে আসেন। এমন অনেকেই আছেন যারা বারবার আক্রান্ত হন এবং বারবার টিকা নিতে আসেন। এর মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বিড়ালের দ্বারা আক্রান্ত। বাকিরা কুকুরের দ্বারা।
মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. আরিফুল বাসার বলেন, ‘জলাতঙ্ক প্রাণঘাতী। এতে মৃত্যু শতভাগ। সে জন্য সবচেয়ে ভালো হলো মানুষ যাতে আক্রান্ত না হয় সেই চেষ্টা করা। যদি কুকুর-বিড়ালে কামড় বা আঁচড় দেয় তাহলে যত তাড়াতাড়ি টিকা দেওয়া যায়, তত ভালো। তাও না পারলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টিকা নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।’
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এফ এ আসমা খান আরও বলেন, ‘যদি কামড়ের পর ছিলে-ফেটে-কেটে যায়, রক্ত বের হয় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে খারজাতীয় সাবান দিয়ে চলমান পানিতে আধাঘণ্টা ধরে ঘষে ঘষে স্থানটি ধুয়ে ফেলতে হবে। ধুয়ে সেখানে কোনো সেলাই দেওয়া যাবে না। দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে টিকা দিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি জরুরি হচ্ছে, মুখ-ঘাড়-মাথার যত কাছে কামড় বা আঁচড় লাগবে, তত তাড়াতাড়ি ভ্যাকসিন দিতে হবে। কারণ খুব তাড়াতাড়ি এই জীবাণু ছড়িয়ে যায়। অনেক সময় দেখা যায় কামড়ে বা আঁচড়ে বেশি গুরুতর জখম হলে, ভ্যাকসিন দিলেও জলাতঙ্ক হয়ে যায়। জলাতঙ্ক হয়ে গেলে এটা সারানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। শতভাগ মৃত্যু নিশ্চিত।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, জলাতঙ্ক টিকা-প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। প্রাণী থেকে প্রাণীতে সংক্রমিত হয়। এটি সাধারণত লালার মাধ্যমে কামড় বা আঁচড়ের দ্বারা মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে ছড়ায়। একবার রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেলে, জলাতঙ্ক প্রায় শতভাগ প্রাণঘাতী। জলাতঙ্কের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, ব্যথা এবং ক্ষতস্থানে অস্বাভাবিক বা ব্যাখ্যাতীত খোঁচা বা জ্বালাপোড়ার মতো সাধারণ লক্ষণ। ভাইরাসটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ক এবং মেরুদ-ের প্রদাহ বৃদ্ধি পায়। মানুষের ক্লিনিক্যাল জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, তবে খুব কমই নিরাময় করা যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১৫০টিরও বেশি দেশে জলাতঙ্কের কারণে প্রতি বছর আনুমানিক ৫৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়, যার ৯৫ শতাংশই আফ্রিকা ও এশিয়ায় ঘটে থাকে। তবে, প্রকৃত ঘটনার সঠিক তথ্য না দেওয়া এবং হিসাবের অনিশ্চয়তার কারণে এই সংখ্যাটি সম্ভবত প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে অনেক কম। এই রোগের বোঝা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর পড়ে, এবং প্রায় অর্ধেক রোগীই শিশু; যাদের বয়স ১৫ বছরের কম বয়সী। ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে কুকুরই মানুষের দেহে জলাতঙ্ক ভাইরাস সংক্রমণের জন্য দায়ী।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের জলাতঙ্কপ্রবণ ৯টি দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ভুটান, উত্তর কোরিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মায়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড।
বিশেষজ্ঞরা জানান, কুকুরের টিকাদান ও জন্মনিয়ন্ত্রণ, কুকুরের কামড় প্রতিরোধ এবং সংস্পর্শে আসার পর সর্বজনীন টিকাদান নিশ্চিত করার মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে কুকুরবাহিত জলাতঙ্ক নির্মূল করা সম্ভব। মানুষের জলাতঙ্ক প্রতিরোধের জন্য কার্যকর টিকা এবং ইমিউনোগ্লোবুলিন রয়েছে। সন্দেহভাজন জলাতঙ্ক আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শে আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ক্ষতস্থান অবিলম্বে পরিষ্কার করা এবং টিকা গ্রহণ করলে জলাতঙ্কের প্রাদুর্ভাব ও মৃত্যু প্রতিরোধ করা যায়। বিশ্বব্যাপী দেখা গেছে যে, কুকুরের টিকা প্রদানের হার ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বজায় রাখলে কুকুরের জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু দেশে ২০২২ সালের পর থেকে বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকা দেওয়ার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ২০১০ সাল থেকে দেশে বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকা দেওয়া কার্যক্রম শুরু হয়।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ভারপ্রাপ্ত প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন বলেন, ভ্যাকসিন নেই। সরকার দিলে আমরা কার্যক্রম চালাই। কারণ এই ভ্যাকসিন সরকার আমাদের সরবরাহ করত। ২০২২ সালে শেষ বার সাপ্লাই এসেছিল। এরপর সরকার কেনেনি। এখন আবার কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কেনার পর আমাদের দিলে আমরা কার্যক্রম শুরু করব। এছাড়া হাসপাতালে ভর্তি করা, পেশেন্ট ভ্যাক্সিনেশন কার্যক্রমও নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের আরেক চিকিৎসক বলেন, ‘বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কুকুর নিধন করা যাবে না। ২০১২ সালে এ নিয়ে উচ্চ আদালতও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। সে জন্য আগে যেমন টিকা দেওয়া হতো, সেটি আবার চালু করা এখন জরুরি। এছাড়া কুকুরের জন্মনিয়ন্ত্রণ করা, কমিউনিটি ওনারশিপ দেওয়া এ রকম অনেক কিছু করা লাগবে। না হলে শুধু ভ্যাকসিন দিয়ে কুলানো যাবে না। অ্যানিমেল কন্ট্রোল করতে হবে। টিকাও দিতে হবে। একটা রেগুলেশনের মধ্যে আনতে হবে। বাইরের কিছু দেশে যেমন ট্যাক্সেশন আছে, তাও করা যেতে পারে।’
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ, বেওয়ারিশ প্রাণীর সংখ্যা কমানো এবং দায়িত্বশীল পোষাপ্রাণী পালন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশে চালু রয়েছে লাইসেন্স, নিবন্ধন ও বার্ষিক ট্যাক্স ব্যবস্থা। কোথাও এর নাম ‘পেট ট্যাক্স’, কোথাও ‘ডগ লাইসেন্স’, আবার কোথাও ‘পেট রেজিস্ট্রেশন ফি’। জার্মানিতে ডগ ট্যাক্স চালু আছে। প্রায় সব শহরে কুকুর পালনে বার্ষিক ট্যাক্স দিতে হয়। অনেক জায়গায় মাইক্রোচিপ ও রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক। সিঙ্গাপুরে কুকুর ও বিড়াল উভয়ের জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। মাইক্রোচিপ, টিকাদান ও অনলাইন রেজিস্ট্রেশন লাগে। নির্দিষ্ট লাইসেন্স ফি দিতে হয়। কানাডার অনেক শহরে কুকুর-বিড়ালের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। লাইসেন্স না করলে জরিমানাও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয়ভাবে না হলেও অনেক রাজ্য ও শহরে ও সিটিতে ডগ/ক্যাট লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। জলাতঙ্ক টিকার প্রমাণ ছাড়া লাইসেন্স মেলে না। কিছু জায়গায় বার্ষিক নবায়ন লাগে। ভারতেরও বড় শহরগুলোতে ধীরে ধীরে ডগ লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন কোষ শাখার প্রধান ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, একটি পাইলট প্রকল্প পাস হয়েছে। এখনো পিডি নিয়োগ হয়নি। পিডি নিয়োগ হলেই হয়তো জুলাই থেকে কার্যক্রম শুরু হবে। তিন বছরের এই পাইলট প্রকল্প রাজধানীতে চলবে। এরপর সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে। এই প্রকল্পের আওতায় বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকা দেওয়া এবং পুরুষ কুকুরদের জন্মনিয়ন্ত্রণ করা হবে।