মঙ্গলবার, ০২:৫৯ পূর্বাহ্ন, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

মন্তব্য প্রতিবেদন, ভুলের মাশুল দিচ্ছে আমাদের শিশুরা

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১০ মে, ২০২৬
  • ১৮ বার পঠিত

একজন মায়ের কোলে যখন শিশুর নিথর-নিষ্প্রাণ শরীর পড়ে থাকে, তখন পার্থিব সব হিসাব-নিকাশ, চাওয়া-পাওয়া স্রেফ অর্থহীন হয়ে যায়। থাকে শুধু বুকভরা অসীম শূন্যতা আর অনিঃশেষ হাহাকার। আজ বাংলাদেশের বহু ঘরে, বহু মায়ের বুকে তেমনই অথৈ বেদনার ধারাপাত। প্রতিদিনই বাড়ছে এমন গল্প। প্রতিদিনই নতুন করে যোগ হচ্ছে আরও ১০-১২টি পরিবারের শোক! সংখ্যায় বলা হচ্ছেÑ গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে ১২টি শিশু মারা গেছে, এ পর্যন্ত মোট মৃত্যু হয়েছে ৩৫২টি শিশুর। কিন্তু এটি আসলে ৩৫২টি অসমাপ্ত গল্প, ৩৫২টি ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন, ৩৫২টি পরিবারের চিরস্থায়ী ক্ষত।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্য হলোÑ এই ব্যাধি আমরা একসময় জয় করেছিলাম। বহু বছরের টিকাদান কর্মসূচি, মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং মানুষের বিশ্বাসÑ সব মিলিয়ে একসময় দেশবাসী জেনেছিল, হাম আমাদের দেশ থেকে বিদায় নিয়েছে। সেই ঘোষণা ছিল একধরনের সম্মিলিত স্বস্তি। মনে হয়েছিল, একটি ভয়ংকর অধ্যায় আমরা পেছনে ফেলে এসেছি। কিন্তু ইতিহাস নিষ্ঠুরভাবে শেখায়Ñ অবহেলা মানেই প্রত্যাবর্তন। আজ সেই রোগ আবার ফিরে এসেছে। ফিরে এসে আমাদের প্রস্তুতিহীনতা, আমাদের অবহেলার নগ্ন সত্য তুলে ধরেছে।

আমরা নিশ্চয় উপলব্ধি করতে পারিÑ একটি শিশুর মৃত্যু কখনোই কেবল একটি ঘটনা নয়; এটি একটি পরিবারের থমকে যাওয়া। ছোট ছোট জুতো জোড়া আর ব্যবহার হবে না। স্কুলব্যাগটি আর কাঁধে উঠবে না। আর গল্প শোনা বা শুনিয়ে ঘুম পাড়ানো হবে না। হয়তো সেই শিশুই ছিল পরিবারের একমাত্র সন্তান। হয়তো সেই মা-বাবা আর কখনও সন্তান পাবে না। রাষ্ট্রের কাছে এটি পরিসংখ্যান; পরিবারের কাছে এটি অনন্ত শোকের অশ্রুগাথা।

বাস্তবতা হলো, বর্তমান সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে টিকা সংগ্রহ, পরিকল্পনা ও সরবরাহ ব্যবস্থায় যে ঘাটতি ছিল, তার ফল আজ আমরা ভোগ করছি। আগের সময়গুলোতে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি, টিকার সরবরাহে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায়নি এবং জনস্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ভবিষ্যৎ ঝুঁকির জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী করা হয়নি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যমতে, অন্তর্বর্তী সরকার বা এর আগের সরকার যারা ছিলেন, তারা কিন্তু হামের পর্যাপ্ত পরিমাণ টিকা আনেননি এবং এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থাও নেননি। ফলে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। এখন টিকা আসছে, নতুন ডোজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ১৫ লাখ ডোজ টিকা দেশে এসেছে। কিন্তু সংকট যখন দরজায় এসে দাঁড়ায়, তখন নেওয়া তড়িঘড়ি প্রস্তুতি অনেক সময়ই যথেষ্ট হয় না। একটি জনবহুল দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা কখনোই ‘অপেক্ষা’ করে চলতে পারে না; এখানে সবকিছুই আগাম প্রস্তুতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।

এই সংকট আমাদের স্বাস্থ্য খাতের গভীর বাস্তবতাও সামনে এনে দিয়েছে। হাসপাতাল কম, শয্যা কম, যন্ত্রপাতি অপ্রতুল, জনবল সীমিত। সবচেয়ে বড় কথা, স্বাস্থ্যসেবার মান এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ডাক্তার ও নার্সরা চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই চেষ্টাকে শক্তিশালী করার মতো অবকাঠামো কি আমরা তৈরি করতে পেরেছি? উপজেলা, জেলা, মফস্বলÑ সব জায়গায় একই অভিযোগÑ বেড নেই, ওষুধ নেই, পরীক্ষার কিট নেই, অ্যাম্বুলেন্স নেই। রোগী বাড়ছে, কিন্তু চিকিৎসা কাঠামো আগের জায়গাতেই স্থির হয়ে আছে।

স্বাস্থ্যসেবা যখন নাগরিকের মৌলিক অধিকার, তখন এহেন বাস্তবতা মেনে নেওয়া কঠিন। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য এই সংকট আরও নির্মম। শহরে কোনোভাবে চিকিৎসা পাওয়া গেলেও গ্রামাঞ্চলে অনেক পরিবার এখনও প্রাথমিক চিকিৎসা পাওয়ার আগেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। একটি শিশুর জ্বর, কাশি বা র?্যাশÑ এসব উপসর্গ যখন দেখা দেয়, তখন দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ না থাকলে পরিস্থিতি মুহূর্তেই ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রথম যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ। জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। তবে কেবল বরাদ্দ বাড়ালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরাদ্দকৃত অর্থ কতটা সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে ব্যয় হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।

দেশের মফস্বল, গ্রাম, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এখন জরুরি। যেখানে প্রয়োজন, বেড সংখ্যা বাড়াতে হবে; আর যেখানে বেড আছে, সেখানে নিয়মিত বিদ্যুৎ, পানি, খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে কঠোরভাবে নজর রাখতে হবে যেন সরকারি হাসপাতালের ওষুধ বাইরে বিক্রি না হয়। সরকারি সম্পদ যদি জনগণের কাছে না পৌঁছায়, তবে সেই ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কখনোই ফিরবে না।

ডাক্তারদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। রোগীরা যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সেটিও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়, সরকারি হাসপাতালের রোগীদের প্যাথলজির পরীক্ষা বাইরে করাতে পাঠানো হয়। এটি দরিদ্র ও অসচ্ছল মানুষের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। স্বাস্থ্য একটি মৌলিক অধিকার; এই অধিকারকে কোনোভাবেই পণ্যে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়; এর সঙ্গে জড়িত মানুষের আস্থা, সচেতনতা ও মানবিকতা। একটি টিকাদান কর্মসূচি তখনই সফল হয়, যখন মানুষ বিশ্বাস করেÑ এই ব্যবস্থা তাদের জন্যই কাজ করছে। তাই মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানো, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম শক্তিশালী করা এবং মানুষের মধ্যে ভীতি বা ভুল ধারণা দূর করা এখন অত্যন্ত জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑ মানবিকতা। একটি সুস্থ, শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। হাম এখন একটি চলমান সংকট। এর বাইরেও অসংখ্য রোগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য সার্বিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে না পারলে উন্নয়ন টেকসই হবে না।

শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একটি শিশুকে হারানোর শোক কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না; এটি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাত হয়ে পরিবারের জীবনে থেকে যায়। রাষ্ট্র যদি সত্যিই একটি সুস্থ জাতি গড়ে তুলতে চায়, তবে এই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়েই স্বাস্থ্য নীতিমালা তৈরি করতে হবে।

অন্যথা আমরা উন্নয়নের পথে এগোলেও একটি দুর্বল, অকার্যকর ও অচেতন জাতি হিসেবে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে। সেক্ষেত্রে আগামী সময়ও আমাদের ক্ষমা করবে না।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com