প্রধানমন্ত্রী বা ভিভিআইপি মুভমেন্টের কথা মনে এলেই সাধারণ মানুষের চোখের সামনে একটা কমন দৃশ্য ফুটে ওঠে। তা হলে অনেক আগে থেকেই রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। দুই পাশে চরম ত্যক্তবিরক্ত গণমানুষ দাঁড়িয়ে থাকবে। উল্টো হয়ে পাহারায় ব্যস্ত সারি সারি পুলিশ। বিকট হর্ন বাজাতে বাজাতে সাঁইসাঁই করে ছুটবে বিলাসী গাড়িবহর। বিপরীত পাশে বিরামহীন সাইরেন বাজাতে থাকবে অসহায় কোনো অ্যাম্বুলেন্সচালক। অতঃপর নগরজুড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট, সীমাহীন ভোগান্তি।
নিত্য ভোগান্তির চিত্র বদলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মানুষ যা কল্পনাও করেনি, তারেক রহমান তা বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষ কখনো ভেবেছেন যে প্রধানমন্ত্রী সকাল ৯টায় সচিবালয়ে গিয়ে অফিস করবেন? কিংবা ছুটির দিনে কাজ করবেন। কল্পনায় কি ছিল রাস্তা বন্ধ না করে, বহরের গাড়ি সীমিত করে প্রায় সাধারণ মানুষের মতো ছুটবেন প্রধানমন্ত্রী? সামগ্রিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণেরে পর থেকে প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া পদক্ষেপগুলোকে ভীষণ ইতিবাচক হিসেবেই বিবেচনা করবেন বলে আশা করি। যদিও আমার আশা-নিরাশায় কিছু যায় আসে না। কারণ আমজনতার মন আকাশের মতো, ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। কারণে-অকারণে বদলায়।
মাথায় রাখতে হবে, পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন করতে গিয়ে আবার যেন হিতে বিপরীত না হয়। কোনোভাবেই যেন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাব্যবস্থা বেশি শিথিল না হয়। সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে দায়িত্বশীলদের। কারণ দেশি-বিদেশ সব ষড়যন্ত্র বন্ধ হয়ে গেছে—এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। এ ছাড়া এটা বিলেত নয়—বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাব্যবস্থা সাজাতে হবে বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে। না হলে হঠাৎই পরিস্থিতি জটিল হতে পারে, বাড়তে পারে রাজনৈতিক সংকট। সরাসরি বললে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো জোরদার করা উচিত। এমনকি ডা. জুবাইদা আর জাইমা রহমানেরও।
ক্ষমতা আর জনতার দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। অনেকটা তেল-জলের মতো। তার মধ্যে জনগণ বিশ্বাস করতে চায়, তারেক রহমান ক্ষমতার বদলে জনতার প্রধানমন্ত্রী হয়ে উঠবেন। ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে, সাধারণ মানুষ নিয়ে ভাববেন, হয়ে উঠবেন গণমানুষের কণ্ঠস্বর। সে জন্য প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যানকে কিছু ইস্যু গুরুত্ব দিয়ে অ্যাডড্রেস করতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে যেন প্রকট না হয়ে উঠে পাওয়া-না পাওয়ার দ্বন্দ্ব। কারণ নির্যাতিত-নিপীড়িত হলে নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ থাকেন। ক্ষমতায় গেলে বাড়ে বিভেদ-সংঘাত। ক্ষমতায় বসার সঙ্গে সঙ্গেই দলের নেতাকর্মী-সমর্থক নিজেদের ভীষণ যোগ্য মনে করছে। যারা সরকারের আনুকূল্যে ভালো স্থান পেয়েছে, তাদের সবাই হিংসা করা শুরু করেছে। বঞ্চিতরা নিজস্ব বলয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রকাশ করছে। এমনকি অতীত ত্যাগ-তিতিক্ষার নিরিখে কী পেল-কী পেল না সেই হিসাব-নিকাশ করছে অবিরত।
আবার এটাও সত্য, ক্ষমতার চেয়ারে বসার পর বিএনপির অনেক নেতা এখন অতি সুশীল হয়ে যাচ্ছেন। সমালোচনার নামে তাঁরা দলের বদনাম করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভালো কাজগুলোকে আড়াল করছেন, নয়তো ছোট করে দেখছেন। এমনকি ক্ষমতা পাওয়ার পর তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের খুব একটা পাত্তা দিচ্ছেন না নেতারা। এই মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। কারণ মনে রাখতে হবে তৃণমূলের লাখ লাখ নেতাকর্মীর আত্মত্যাগ, শ্রম-ঘাম আর রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে রচিত হয়েছে জুলাই বিপ্লবের প্রেক্ষাপট। পতন হয়েছে একসময়ের প্রতাপশালী হাসিনা সরকারের, সৃষ্টি হয়েছে বিএনপির ক্ষমতায় ফেরার সুযোগ।
প্রধানমন্ত্রীর প্রচলিত ধারণা বদলে দিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতি সাধারণ হয়ে উঠছেন তারেক রহমান। প্রথা ভেঙে নানা শ্রেণি-প্রেশার মানুষের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন তিনি। পরম মমতায় টেনে নিচ্ছেন বুকে। অথচ অনেক নেতার অবস্থান ঠিক তার বিপরীত। ক্ষমতা পাওয়ার পর থেকেই মন্ত্রী-এমপি হওয়া নেতাদের সঙ্গে ভীষণ দূরত্ব বাড়ছে দুর্দিনে সক্রিয় কর্মীদের। আগে তপ্ত দুপুরের মিছিলে কর্মী-সমর্থকদের ঘামের গন্ধ পেতেন নেতারা, কাছে রাখতেন সব সময়। এখন প্রতিবাদী মিছিল মিটিং নেই, নেই গ্রেপ্তার আতঙ্ক। দিনবদলের পর ধবধবে সাদা জামাকাপড় পরে, দামি ফারফিউম দিয়ে পরিপাটি থাকেন সবাই। তাও কর্মীদের কাছে ভিড়তে দেন না নেতারা। সংকটে খোঁজখবর নেন না খুব একটা। জরুরি কাজে একাধিকবার ফোন দিলেও রিসিভ করার সময় নেই। উল্টো এখন কর্মীদের ঘামে বিদ্ঘুটে দুর্গন্ধ পান নেতারা। অথচ তাদের কারণেই আপনারা সংসদে গিয়েছেন, হয়েছেন এমপি-মন্ত্রী, নয়তো চেষ্টা-তদবিরে পেয়েছেন নানা পদ-পদবি। এসব ভুলে গেলে চলবে না। মাঠের কর্মী-সমর্থকদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। তবেই সরকারে থেকেও দল হিসেবে শক্তিশালী থাকবে বিএনপি।
আরেকটা বিষয় নিশ্চয় তারেক রহমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছেন। তা হলো দলকে এমপিনির্ভর না করে সংগঠকনির্ভর করা। আগামীর যেকোনো সংকটের জন্য তৃণমূলে সংগঠক তৈরি করতে হবে। পদবিতে গুরুত্ব না দিয়ে সংকটে হাল ধরতে পারে এমন নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে হবে। মনে রাখতে হবে যেকোনো সময় রাজনীতির গণেশ উল্টে যেতে পারে। তখন ক্ষমতা নয়, সাধারণ জনতাই হয় একমাত্র অবলম্বন।
দৃশ্যত ক্ষমতার চেয়ে জনতা খুবই দুর্বল। কার্যত জনতার শক্তি অনেক বেশি। ঐক্যবদ্ধ জনতা জনস্রোত সৃষ্টি করে। ক্ষিপ্ত হলে ভেঙে চুরমার করে দিতে পারে কঠিন প্রাচীরে ঘেরা ক্ষমতার মসনদ। সবশেষে ২৪-এর জুলাই বিপ্লব যার জীবন্ত উদাহরণ। তাই যখন যাঁরাই ক্ষমতায় থাকবেন, তাঁদেরকে অবশ্যই জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিন। নয়তো যেকোনো সময় প্রলয়ংকরী ঝড় উঠতে পারে, লণ্ডভণ্ড হয়ে যেতে পারে সাজানো বাগান। আশার কথা হলো, ক্ষমতায় বসার পর থেকেই তারেক রহমান বিরামহীনভাবে জনতার মন জয় করার চেষ্টা করছেন। প্রত্যাশা, অব্যাহত থাকবে সেই প্রচেষ্টা। যার মধ্য দিয়ে বদলে যাবে দেশের সংঘাতময় রাজনৈতিক সংস্কৃতি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আর সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় গড়ে উঠবে সাম্য-সুন্দর ও মানবিক মর্যাদার বাংলাদেশ।
বদলে যাওয়া বাস্তবতায় ক্ষমতার কাছে জনতার প্রত্যাশা অনেক বেশি। জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এরই মধ্যে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিন, আরো অনেকের ভাতা প্রদান, এক মাস না যেতেই বিমানবন্দর আর রেলস্টেশন এমনকি চলন্ত ট্রেনে ফ্রি ওয়াই-ফাই সেবাও চালু করা হয়েছে। আশা করি গণমানুষের কল্যাণে কাজের এমন ধারা অব্যাহত রাখবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যার মধ্য দিয়ে শুধু বিএনপির নয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হয়ে উঠবেন বাংলাদেশের আপামর জনগণের অবিসংবাদিত নেতা।
লেখক : কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক
হেড অব নিউজ, নিউজ২৪