অবরুদ্ধ গাজায় দিনের পর দিন ন্যূনতম খাবারটুকু না পেয়ে শিশুরা এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে, কাঁদতেও পারছে না। উপত্যকায় গত সপ্তাহে দুর্ভিক্ষের ঘোষণা দেয় জাতিসংঘ। এটা কেবল বলার জন্য বলা একটি যান্ত্রিক শব্দ ছিল না। যখন কোথাও পর্যাপ্ত খাবারের জোগান থাকে না, তখন শিশুরা ভয়াবহ অপুষ্টিতে ভোগে। তারা ধীরে ধীরে বেদনাদায়ক মৃত্যুর দিকে এগোতে থাকে। সহজভাবে বললে, দুর্ভিক্ষের মূল অর্থ এটাই।
কথাগুলো বলছিলেন অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রেসিডেন্ট ইনগার অ্যাশিং। গাজায় অনাহার, অপুষ্টি ও রোগ-শোকে জর্জরিত শিশুদের চরম দুরবস্থার কথা হৃদয়গ্রাহী ভাষায় তিনি তুলে ধরেছেন। ইসরায়েলের ২২ মাসের আগ্রাসনে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী এ শিশুরা। গত বৃহস্পতিবার এএফপির প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে।
ইনগার অ্যাশিং বলেন, বেশ কয়েক সপ্তাহ ক্ষুধার্ত থাকলে শারীরিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেহে সঞ্চিত চর্বি থেকে শক্তি আহরণ করে বেঁচে থাকতে বাধ্য হয় শিশুরা। তারপর যখন সেই চর্বিটুকু শেষ হয়ে যায়, তখন কার্যত ‘পেশি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ’ খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হতে থাকে। এভাবে শরীরের ক্ষয় অব্যাহত থাকে। তিনি বলেন, ‘তা সত্ত্বেও আমাদের ক্লিনিকগুলো প্রায় নীরব। এখন (সেখানে থাকা) শিশুদের কথা বলার বা বেদনায় কেঁদে ওঠারও শক্তি নেই। তারা দুর্বল অবস্থায় শুয়ে থাকে। কার্যত, তাদের দেহ ক্ষয়ে যাচ্ছে।’
আলজাজিরা জানায়, শুক্রবার এক দিনে অনাহার-অপুষ্টিতে দুই শিশুসহ আরও পাঁচজনের প্রাণ গেছে। এতে অনাহারে মৃত্যুর সংখ্যা ৩২২ জনে পৌঁছেছে। এদের মধ্যে ১২১ শিশু রয়েছে।
গত শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে গাজায় দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতির ঘোষণা করে জাতিসংঘ। কারণ, হিসেবে ইসরায়েলের ‘নিয়মতান্ত্রিকভাবে ত্রাণ ঠেকানো’কে দায়ী করা হয়। জাতিসংঘের সমর্থনে পরিচালিত ক্ষুধা নিরীক্ষক সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেস ক্লাসিফিকেশন ইনিশিয়েটিভ (আইপিসি) জানিয়েছে, গাজা গভর্নরেটে পাঁচ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। আইপিসির পূর্বাভাষ, আগামী মাসের (সেপ্টেম্বর) শেষ নাগাদ গাজার দুই-তৃতীয়াংশ অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়বে।
দুর্ভিক্ষে বিভিন্ন দেশের উদ্বেগ-ক্ষোভ
গাজায় দুর্ভিক্ষ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদ্বেগ-ক্ষোভ বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করার পাশাপাশি সরকারগুলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। গতকাল শুক্রবার সিএনএন জানায়, ব্রিটিশ সরকার লন্ডনে আগামী মাসে অনুষ্ঠিতব্য এক অস্ত্র প্রদর্শনীতে ইসরায়েলের কর্মকর্তাদের উপস্থিতির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসন বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশটি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ পদক্ষেপের মাধ্যমে পশ্চিমের প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের দূরত্ব এখন অনেকটাই স্পষ্ট। এর আগে গত বুধবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের পর ১৪ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বাকি ১৩টি দুর্ভিক্ষের ঘোষণায় ‘উদ্বেগ ও ক্ষোভ’ প্রকাশ করে।
নিহতের সংখ্যা ৬৩ হাজার ছাড়াল
চলমান পরিস্থিতি গাজার ক্ষুধার্ত মানুষের ওপর অব্যাহতভাবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এতে এক দিনে ২৩ ত্রাণপ্রত্যাশীসহ অন্তত ৫৯ জন নিহত হয়েছেন। আলজাজিরা জানায়, গাজায় এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৬৩ হাজার ২৫ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন এক লাখ ৫৯ হাজার ৪৯০ জন। গত ২৭ মে থেকে দুই হাজার ২০৩ ত্রাণপ্রত্যাশী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ২২৮ জন।
গাজা সিটিতে ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ ঘোষণা ইসরায়েলের
ইসরায়েল বলেছে, গাজা সিটি এখন ভয়ংকর যুদ্ধক্ষেত্র। তারা দুর্ভিক্ষকবলিত এলাকাটিতে আক্রমণের প্রাথমিক ধাপ শুরু করেছে। গতকাল শুক্রবার ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, বর্তমানে গাজা সিটির উপকণ্ঠে অভিযান পরিচালনা করছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী।
এনবিসি নিউজ বলছে, এ অভিযানের কারণে আবারও হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হবেন। গাজা সিটির জইতুন ও সাবরা এলাকায় ব্যাপক হামলা শুরু হয়েছে।