মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন, তবে ৭০(খ) সংস্কারের পর এমন নির্বাচন হলে আরও আনন্দিত হতাম — অ্যাডভোকেট এ. এন. এম. ঈসা
বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন সংবিধানের ৭০(খ) ধারা বাতিল আন্দোলনের উদ্যোক্তা ও প্রবক্তা দার্শনিক দেশবন্ধু অ্যাডভোকেট এ. এন. এম. ঈসা।
২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। এটি প্রায় ৩৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।
অ্যাডভোকেট এ. এন. এম. ঈসা বলেন,
“রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, এটি অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ঘটনা। আমি নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন জানাই। কিন্তু সংবিধানের ৭০(খ) ধারার বাধ্যবাধকতা সংস্কার বা প্রত্যাহার করে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে আমি আরও বেশি আনন্দিত হতাম।”
গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে: ভোটার হিসেবে একজন সংসদ সদস্য তাঁর নিজের বিবেক ও বিবেচনা অনুযায়ী ভোট দেওয়ার সাংবিধানিক স্বাধীনতা কতটুকু পাচ্ছেন?
তিনি বলেন,
“রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যালট যদি একজন এমপির হাতে দেওয়া হয়, তাহলে সেই ব্যালটের সঙ্গে তাঁর স্বাধীন সিদ্ধান্তের অধিকারও থাকা উচিত। তিনি সরকারদলীয়, বিরোধীদলীয় বা অন্য কোনো দলের এমপি হোন না কেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে কাকে উপযুক্ত মনে করেন সেই সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।”
ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন নয়, ব্যবস্থাটি নিয়ে প্রশ্ন
অ্যাডভোকেট ঈসা স্পষ্ট করেন যে তাঁর বক্তব্য নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত যোগ্যতা বা নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফলের বিরুদ্ধে নয়।
বরং প্রশ্নটি সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে।
নির্বাচনের আগেই ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে মির্জা ফখরুলের জয় কার্যত নিশ্চিত বলে সংবাদমাধ্যমে বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছিল।
অ্যাডভোকেট ঈসা বলেন,
“যদি দল ঠিক করে দেয় কাকে ভোট দিতে হবে এবং সংসদ সদস্যের সামনে সেই সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার বাস্তব সাংবিধানিক সুযোগ না থাকে, তাহলে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও স্বাধীন নির্বাচনের মৌলিক প্রশ্নটি থেকেই যায়।”
রাষ্ট্রপতি দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার নন, সমগ্র দেশের
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি শুধু কোনো একটি রাজনৈতিক দলের রাষ্ট্রপতি নন; তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান। তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি যোগ্যতা, নিরপেক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সততা এবং রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনা করার স্বাধীনতা থাকা উচিত বলে মনে করেন অ্যাডভোকেট ঈসা।
তিনি বলেন,
“রাষ্ট্রপতি যখন সমগ্র বাংলাদেশের, তখন তাঁকে নির্বাচনের সময়ও সংসদ সদস্যের বিবেককে যতটা সম্ভব স্বাধীন রাখা উচিত। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দলীয় হুইপের শক্তি প্রদর্শনের বিষয় না হয়ে সংসদের স্বাধীন সিদ্ধান্তের প্রতিফলন হওয়া উচিত।”
৭০(খ) নিয়ে নতুন করে জাতীয় আলোচনা প্রয়োজন
অ্যাডভোকেট ঈসার মতে, দলত্যাগ রোধ এবং সরকারের স্থিতিশীলতা রক্ষার ঐতিহাসিক যুক্তি থাকলেও ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগের পরিধি কতটা হওয়া উচিত, সেটি পুনর্বিবেচনা করা দরকার।
সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় সরকার টিকিয়ে রাখার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত অনাস্থা প্রস্তাব বা অর্থবিলের মতো সীমিত কিছু বিষয়ে দলীয় শৃঙ্খলা রাখার যুক্তি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, সাধারণ আইন, নীতিগত প্রস্তাব এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মত ও ভোটের সুযোগ দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে জাতীয় সংলাপ হওয়া উচিত।
অ্যাডভোকেট ঈসা বলেন,
“আমাদের উদ্দেশ্য দল ভাঙা নয়, সরকারকে অস্থিতিশীল করা নয়। আমাদের উদ্দেশ্য সংসদকে কার্যকর করা। সরকার শক্তিশালী থাকবে, কিন্তু সংসদও স্বাধীন থাকবে—এই ভারসাম্যই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।”
বিরোধী দলেরও দায়িত্ব রয়েছে
তিনি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিও আহ্বান জানিয়ে বলেন, শুধু নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়া যথেষ্ট নয়। সংসদ সদস্যদের স্বাধীন ভোটের প্রশ্নটিও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে আনতে হবে।
“আজ যে দল বিরোধী দলে আছে, আগামীকাল সে দল সরকারে যেতে পারে। আবার আজ যে দল সরকারে আছে, ভবিষ্যতে সে দল বিরোধী দলে যেতে পারে। তাই ৭০(খ)-এর প্রশ্ন কোনো একটি দলের প্রশ্ন নয়। এটি সংসদ, গণতন্ত্র এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রশ্ন।”
“অভিনন্দন জানাই, কিন্তু আরও আনন্দিত হতাম”
অ্যাডভোকেট এ. এন. এম. ঈসা বলেন,
“মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন—তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভকামনা জানাই। তিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন নেতা। আমি তাঁর সফলতা কামনা করি। কিন্তু ৭০(খ) ধারার বাধ্যবাধকতা পরিবর্তন করে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যকে সম্পূর্ণ স্বাধীন বিবেচনায় ভোট দেওয়ার সুযোগ দিয়ে তিনি নির্বাচিত হলে আমি আরও বেশি আনন্দিত হতাম। তখন আমরা বলতে পারতাম, শুধু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনই হয়নি—সংসদের স্বাধীন মতামতেরও বিজয় হয়েছে।”
তিনি নতুন রাষ্ট্রপতির কাছে সংসদের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সহনশীলতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের পক্ষে ভূমিকা রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় অভিনন্দন।
এবার সংসদের ভোটকেও স্বাধীন করার উদ্যোগ নেওয়া হোক।
সংসদ স্বাধীন হলে প্রতিনিধির কণ্ঠ স্বাধীন হবে, আর প্রতিনিধির কণ্ঠ স্বাধীন হলে জনগণের কণ্ঠ আরও শক্তিশালী হবে।
দার্শনিক দেশবন্ধু অ্যাডভোকেট এ. এন. এম. ঈসা
উদ্যোক্তা ও প্রবক্তা
সংবিধানের ৭০(খ) ধারা বাতিল আন্দোলন