মঙ্গলবার, ০১:২৯ অপরাহ্ন, ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ২৪শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

দাম বেড়েছে নিত্যপণ্যের, চাপে মানুষ

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬
  • ২ বার পঠিত

ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আগ্রাসনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারে। যুদ্ধের কারণে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিশ্বের নৌবাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকায় দেশে দেশে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম, যার বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে খাদ্যমূল্যেও। সংকটের কারণে দামের চেয়ে জ¦ালানি তেলের দুষ্প্রাপ্যতা বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার কারণে পাইকারি বাজারে পণ্যের দাম ও আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারে। অন্যদিকে সরকার এখনও জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ালেও পরিবহন খরচ বাড়তে শুরু করেছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, খরচ এরই মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে, যা উৎপাদন ব্যয়ের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করছে। এতে সরবরাহ শৃঙ্খলে অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এক প্রতিবেদনে বলেছে, জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় মার্চ মাসে বিশ্বজুড়ে খাদ্যের দাম আগের মাসের তুলনায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য সূচক মার্চে ১২৮ দশমিক ৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, যা ফেব্রুয়ারির সংশোধিত স্তরের তুলনায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। দাম বাড়ার এই ধারা চলছে টানা দুই মাস ধরে। শস্য, মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য, ভোজ্যতেল, চিনিসহ সব প্রধান পণ্যের দামই এ সময় বেড়েছে।

বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য সূচক অনুযায়ী, মার্চে খাদ্যশস্যের মূল্যসূচক মাসিক ভিত্তিতে ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ১১০ দশমিক ৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে এবং বার্ষিক ভিত্তিতে বেড়েছে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। ভোজ্যতেলের দাম টানা তৃতীয় মাসের মতো বেড়েছে। এই পণ্যের মূল্য সূচক পৌঁছেছে ১৮৩ দশমিক ১ পয়েন্টে, যা গত ফেব্রুয়ারির তুলনায় ৫ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। পাম তেলের দাম এখন সয়াবিন তেলকেও ছাড়িয়ে গেছে, যার পেছনে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি মূল ভূমিকা রেখেছে।

অন্যদিকে মাংসের মূল্যসূচক মার্চে গড়ে ১২৭ দশমিক ৭ পয়েন্ট হয়েছে, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় ১ শতাংশ এবং এক বছর আগের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি। দুগ্ধজাত পণ্যের মূল্যসূচক মাসে ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ১২০ দশমিক ৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, তবে এটি ২০২৫ সালের মার্চের স্তরের চেয়ে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশের নিচে রয়েছে।

এফএওর প্রতিবেদনে বলা হয়, চিনি বা খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার পেছনে প্রধান কারণ ছিল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, বিশ্বের শীর্ষ চিনি রপ্তানিকারক দেশ ব্রাজিল হয়তো আখ থেকে চিনি তৈরির বদলে ইথানল উৎপাদনের দিকে ঝুঁকবে। সংস্থাটি বলছে, চিনির দামের ওপর বাড়তি চাপের আরেকটি কারণ হলো মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ফলে বাণিজ্যপ্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা।

এনবিআর ও ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সয়াবিন তেল ও কাঁচা তেলবীজ আসে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে। দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পাম অয়েল মূলত আসে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে। আমদানিকারকেরা জানান, এসব পণ্যের কোনো চালানই হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে না। তবে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়ছে, যার প্রভাব এখানেও দেখা যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘পিংক শিট’ অনুযায়ী, মার্চে পাম অয়েলের গড় দাম ছিল প্রতি টনে ১ হাজার ১০৩ ডলার, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১ হাজার ০৩৯ ডলার এবং জানুয়ারিতে ১ হাজার ০০৫ ডলার। সয়াবিন তেলের দাম আরও বেশি বেড়েছে। সয়াবিন তেলের দাম ফেব্রুয়ারির ১ হাজার ২৮২ ডলার থেকে বেড়ে মার্চে ১ হাজার ৪৮২ ডলারে পৌঁছেছে, অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ। সয়াবিন মিলের দামও বেড়ে মার্চে হয়েছে ৪৭৩ ডলার, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৪২৫ ডলার।

অন্যদিকে আলোচ্য সময়ে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে মসলা ও শুকনা ফলের। পেস্তাবাদামের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়ে কেজিতে ৪ হাজার ১০০ টাকায় পৌঁছেছে। শুকনা আলুবোখারার দাম ১৬০ শতাংশের বেশি বেড়ে ১ হাজার ৩২০ টাকা হয়েছে। এই দুই পণ্য মূলত ইরান ও আফগানিস্তান থেকে আসে। কিশমিশ, জিরা, জায়ফল ও জয়ত্রী- এসবের দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।

জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্য, জাহাজ ভাড়া এবং কাঁচামালের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদন তীব্র ‘কস্ট-পুশ’ সংকটে পড়েছে। শিল্প খাতের নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে প্রতিফলিত হবে।

বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিকারকরা ইতোমধ্যে আর্থিক চাপে পড়েছেন। আগে থেকেই নিশ্চিত হওয়া রপ্তানি আদেশে তারা বাড়তি কাঁচামাল ব্যয় বহন করতে বাধ্য হচ্ছেন। বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ায় এই অতিরিক্ত খরচ ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগও কমে গেছে, ফলে মুনাফার মার্জিন কমে যাচ্ছে এবং লোকসানের ঝুঁকি বাড়ছে।

জানা গেছে, বিভিন্ন কাঁচামাল ও রাসায়নিকের আমদানি ব্যয় ১০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৮৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এর মধ্যে নন-কটন ফেব্রিকের দাম প্রায় ১৯ শতাংশ, পলিয়েস্টার ফিলামেন্ট সুতা ৭৯ শতাংশ, কটন সুতা ১৮ শতাংশ, রাসায়নিক ৫০ থেকে ১৮৩ শতাংশ, ইস্পাত কাঁচামাল ১৭ শতাংশ, ক্লিংকার ৩৪ শতাংশ, প্লাস্টিক রজন ৬৭ শতাংশ এবং ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল বা অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই)-এর দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।

কাঁচামালের দাম বাড়তে থাকায় আগেই নেওয়া অর্ডারগুলো নিয়ে রপ্তানিকারক ও উৎপাদকরা বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা করছেন। তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা সতর্ক করেছেন, বৈশ্বিক বাজারে পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ের পুরোটা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ওপর চাপানো সম্ভব না। ফলে অস্থির বাজার পরিস্থিতির মধ্যেই পোশাক রপ্তানিকারকদের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’র মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে। শুধু জ্বালানি নয়, এর প্রভাব পড়ছে সব ধরনের পণ্য, খাদ্যদ্রব্য ও পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর। ফলে আগামী দিনে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

অর্থমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকট শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়, বরং একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। বর্তমান জ্বালানি সংকট ইতোমধ্যে জাতীয় অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। অন্যান্য দেশ জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ালেও বাংলাদেশ এখনও তা করেনি, যা রাষ্ট্রীয় তহবিলের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com