রবিবার, ০৪:২০ অপরাহ্ন, ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ২২শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।
শিরোনাম :

জ্বালানি সংকটে বদলে যাচ্ছে জীবনযাত্রা

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৩ বার পঠিত

সাত্তার হোসেন পেশায় গাড়িচালক। গ্রামের বাড়ি বরিশালের গৌরনদীর সরিকল এলাকায়।  ঢাকায় গণপূর্তের এক ঠিকাদারের মাইক্রোবাস চালান তিনি। গতকাল শনিবার বেলা ১১টার দিকে তিনি রাজধানীর পরীবাগের মেঘনা ফিলিং স্টেশন থেকে অকটেন নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ান। শাহবাগ মোড় ঘুরে মেট্রোরেল স্টেশনের সামনে যখন তাঁর গাড়ি পৌঁছে, তখন বিকেল সাড়ে ৪টা পেরিয়ে গেছে। হতাশা আর ক্লান্তি নিয়ে তিনি বললেন, পাম্প পর্যন্ত পৌঁছতে আরও এক ঘণ্টা লেগে যাবে। এভাবে তেল নিতে গেলে আর জীবন থাকে না।

শুধু সাত্তার হোসেনই নন, সেখানে যারা জ্বালানি তেল নিতে এসেছিলেন সবার কমবেশি একই পরিস্থিতি। একেকজনের তেল নিতে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা পর্যন্ত লাগছে। কর্মদিবসের প্রায় পুরো সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে জ্বালানি নিতে। এ কারণে অনেকের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করে দিয়েছেন গাড়ির মালিক। আবার তেল নিতে বাড়তি সময় খরচ হওয়ায় ঘুম ও বিশ্রামের সময় কমে গেছে অনেকের। আর যারা রাইড শেয়ার করেন, তাদের সংকট আরও বেশি। আর্থিক ক্ষতি পোষাতে বাড়তি সময় রাইড শেয়ার করতে হচ্ছে। অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বলে জানালেন কয়েকজন চালক।

রাজধানীর আরও কয়েকটি পেট্রোল পাম্পে লাইনে থাকা চালকদের সঙ্গে কথা বলে প্রায় একই রকম বর্ণনা পাওয়া গেল। জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন খাতের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বদলে যাচ্ছে। কোনো কিছুর সময়সূচি ঠিক থাকছে না।

মেঘনা ফিলিং স্টেশনের লাইনে থাকা রামপুরার মোহাম্মদ সোহেল বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক চিকিৎসকের গাড়ি চালান। তিনি বলেন, লাইনে দাঁড়ানোর পর গাড়ি রেখে কোথাও যেতে পারিনি। কারণ, এক মিনিট পরপর সামনের দিকে দু-তিন গজ এগোতে হয়। পাশের ফুটপাতের দোকানের কলা-রুটি দিয়ে দুপুরের খাবার সেরেছি। স্যার নেমে যাওয়ার পর বলে দিয়েছেন ‘তেল নিয়ে আসো’। স্যারের ছুটির সময় হয়ে গেছে। এখনও পাম্প পর্যন্ত পৌঁছাতে পারিনি।

তিনি অভিযোগ করেন, কয়েক দিন আগে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের গোপালদী বাজারের পাশে একটি দোকানে ২০০ টাকা লিটার অকটেন বিক্রি করতে দেখেছেন। তাঁর ধারণা, পাম্পের সঙ্গে আঁতাত করে এই তেল বাইরে পাঠিয়ে কিছু অসাধু লোক ফায়দা লুটছে।

প্রাইভেটকারচালক জাকির হোসেন বলেন, লাইনে দাঁড়ানোর পর থেকে পাম্প পর্যন্ত পৌঁছাতে অন্তত ৩০০ বার স্টার্ট দেওয়া লাগে। কারণ, একটু এগিয়ে বারবার স্টার্ট বন্ধ করতে হয়। এতেই তেল আরও চলে যায়। আর কতদিন এ রকম জ্বালানি সংকট থাকবে– সে প্রশ্ন করেন তিনি।

জিপচালক মো. নুরুদ্দিন বলেন, তেল সংকটের কারণে মালিক আমার সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করেছেন। আবার তাঁর গাড়ি সিএনজি গ্যাসেও চলে না। তেল নিতে গেলে পাম্পে দুই হাজার টাকার বেশি তেল দেয় না। অথচ এক দিন পরেই ওই তেল শেষ হয়ে যায়। যখন তেল থাকে না, তখন পাম্পে লাইনে দাঁড়াতে বলে মালিক সিএনজি অটোরিকশায় বাসায় চলে যান।

মেঘনা ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি নিতে ব্যক্তিগত গাড়ির লাইনই বেশি। আর কিছু আছে বাইকের লাইন। বাস-পিকআপ তেমন দেখা যায়নি। যারাই লাইনে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়েছেন, সবারই একই অভিজ্ঞতা।

সাত ফিলিং স্টেশন ঘুরে সিটিতে
মিরপুর-২ নম্বরে থাকেন মোবাইল ফোনে সংযোগদাতা একটি প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালক নূর আলম। গতকাল অনেক অফিস বন্ধ থাকায় ফিলিং স্টেশনে ভিড় কম হবে ভেবে বের হয়েছিলেন। তবে বাস্তব চিত্র ছিল একেবারে আলাদা। গাবতলী ও মতিঝিল এলাকার সাতটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দীর্ঘ লাইন দেখে দাঁড়াননি। শেষে বিকেল ৪টার দিকে তিনি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের সিটি ফিলিং স্টেশনে আসেন। এখানে দেড় ঘণ্টা অপেক্ষার পর মেলে জ্বালানি তেল।

নূর আলম জানান, সপ্তাহে অন্তত দুই দিন তেল নিতে হয়। যেদিন তেল নেন, সেদিন নির্ধারিত ডিউটির বাইরে অতিরিক্ত দুই-তিন ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয় তাঁকে। ফলে বাসায় ফিরতেও দেরি হয়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার ভোগান্তি তো আছেই।

সরেজমিন দেখা যায়, মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার যাদের পেশা, তাদের সমস্যা আরও বেশি। প্রতিদিনই তাদের তেলের প্রয়োজন পড়ে। তেমনই একজন রাজধানীর ডেমরার বাসিন্দা মো. নিজাম। তিনি বলেন, প্রতিদিন তেল নিতে গড়ে দুই ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে। এই সময় কোনো আয়ও হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে বাড়তি সময় বাইক চালাতে হচ্ছে। কম ঘুমিয়ে বেশি সময় রাস্তায় থাকায় শরীরের ওপর প্রভাব পড়ছে।

মগবাজারের মধুবাগ এলাকার বাসিন্দা মো. জুবায়েরও রাইড শেয়ার করেন। তিনি জানান, দুই বা এক দিন পরপর তেল লাগে তাঁর। দেড়-দুই ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়াতে হয়। যদিও গতকাল তিনি ৪৫ মিনিটের মাথায় তেল পেয়েছেন।

সিটি ফিলিং স্টেশনে তুলনামূলক কম সময় অপেক্ষা করে তেল পাওয়া যাচ্ছে– এমন খবরে দূর থেকে অনেকে এসেছেন। তাদের একজন পুরান ঢাকার লালবাগের বাসিন্দা রিফাত হোসেন। তিনি বলেন, আমার এলাকার পাম্পগুলোয় তেল পাচ্ছিলাম না। ফেসবুকে খোঁজ নিয়ে দেখলাম, এই পাম্পে কম সময়ে তেল পাওয়া যাচ্ছে। তাই এখানে এসেছি।

সিটি গ্রুপের কর্মকর্তা খালেদুজ্জামান বলেন, আমি থাকি মিরপুরে, আর অফিস গুলশানে। কিন্তু ওইসব এলাকার পাম্পে আরও লম্বা লাইন। তাই বাইক নিয়ে এখানে এসেছি। তাও সোয়া ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে।

সিদ্ধেশ্বরী এলাকার এক ব্যক্তির গাড়ি চালান সুলতান রাঢ়ী। তিনি সিটি ফিলিং স্টেশনে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তেল নিচ্ছিলেন। জানালেন, বিকেল সাড়ে ৩টায় তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড রেলগেটের কাছে। অন্যদিন চার ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এ জন্য রাত ৮টায় ছুটি হলেও তেল নেওয়া শেষে রাত ১১টা-১২টার দিকে বাসায় যেতে হয়।

সেই তুলনায় লাইনে কিছুটা কম সময় অপেক্ষা করতে হয় প্রাইভেটকার চালক মো. সজীব ও রহিম হাওলাদারকে। তারা সোয়া ঘণ্টায় তেল পেয়েছেন।

মো. হানিফ থাকেন ঢাকার আশুলিয়া এলাকায়। তবে ওই এলাকায় তেল পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়। তাছাড়া প্রায়ই লাইনে দাঁড়িয়ে শুনতে হয়, তেল শেষ। তাই গতকাল তিনি আসেন সিটি ফিলিং স্টেশনে। এখানেও দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে।

প্রভাব পরিবহনে
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। রাজধানীর সড়কে ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচল কমেছে। গণপরিবহনেও প্রভাব পড়েছে। কর্মদিবসেও ঢাকার রাস্তায় বাস চলাচল আগের চেয়ে কমেছে।

গুলিস্তান থেকে গাজীপুরের চন্দ্রা রুটে চলাচলকারী আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের একটি বাস বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সিটি ফিলিং স্টেশনে তেল নেওয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল। বাসটির চালক জাবেদ হোসেন ও হেলপার জসীম উদ্দিন জানান, বিকেল ৪টায় লাইনে দাঁড়িয়েছেন। তেল পেতে দুই ঘণ্টা পেরিয়ে যাবে। তেল সংকটের প্রভাব পড়ছে তাদের রোজগারেও। আগে দিনে চারবার চন্দ্রা-গুলিস্তান ট্রিপ দিতেন। এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে।

একাধিক বাস কোম্পানির চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি সংকটের কারণে তাদের বাস ও ট্রিপের সংখ্যা কমাতে হয়েছে। চট্টগ্রামসহ বিভাগীয় শহরগুলো এবং জেলা পর্যায় থেকে একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com