ইরানের ওপর আগ্রাসনের পর পাল্টা হামলার জেরে দেশে আমদানিনির্ভর জ¦ালানি সংকটে অস্থিরতা বাড়ছে। অব্যবস্থাপনা ও গুজবে মানুষের মধ্যে জ¦ালানি অনিশ্চয়তার আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে অসাধু ব্যবসায়ীদের অধিক মুনাফার লোভে তেলের পাচার, কালোবাজারি ও মজুদদারিতে গ্রাহকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। টানা প্রায় এক মাস ধরে চলমান এ সংকটের কারণে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পেট্রলপাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। তেল না পেয়ে প্রতিনিয়ত হতাশ হয়ে ফিরছেন চালক, গ্রাহক ও কৃষকরা। সরকার বলছে, তেলের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হার্ডলাইনে যাচ্ছে তারা। ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট, বিজিবি ও পুলিশসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা একযোগে কাজ করছে। অসাধু মজুদদারির বিরুদ্ধে জেল-জরিমানা করা হচ্ছে। দ্রুতই জ¦ালানি নিয়ে এই বিশৃঙ্খলা কেটে যাবে বলে আশ্বস্ত করা হচ্ছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রলপাম্প ঘুরে দেখা যায়, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকেই প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছেন না। রাজধানীর আসাদ গেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা শিক্ষার্থী শিহাব শিকদার বলেন, ক্লাস বাদ দিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র ৫০০ টাকার তেল নিতে পেরেছি। সর্বোচ্চ তিন দিন যাবে। এরপর আবার একই ভোগান্তিতে পড়তে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ ফিলিং স্টেশন তেলের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে অকটেন ও পেট্রোলের সংকট পরিবহন খাতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে, যদিও ডিজেলের সরবরাহ তুলনামূলক কিছুটা স্বাভাবিক রয়েছে। এতে গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত যানবাহনের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, দুর্ভোগে পড়ছেন অফিসগামী মানুষসহ সাধারণ যাত্রীরা।
গতকাল শাহবাগ মেঘনা পাম্পে গিয়ে দেখা যায় দীর্ঘ লাইন। একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানিতে কর্মরত হামিদ সরকার জানান, প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার মোটরসাইকেল চালাতে হয়। তেল শেষ হলে পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে। খিলগাঁওয়ের একটি ব্যস্ত পেট্রোলপাম্পে লাইনের দৈর্ঘ্য আশপাশের সড়ক ছাড়িয়ে গেছে। সেখানে লাইনে দাঁড়ানো রাইড শেয়ার চালক আব্দুল গণি মিয়া বলেন, এটাই আমার উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম। দিনের অনেকটা সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা খুবই কষ্টকর।
সরকারের জ¦ালানিসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এ সংকট কোনো সাময়িক সমস্যা নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং একমুখী জ¦ালানি নির্ভরতার ফল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি শুরু হয়েছে। জ¦ালানি ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখতে সরকার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিচ্ছে। মজুদদার ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
শরীয়তপুরে ফিলিং স্টেশন ঘেরাও : জ¦ালানি তেলের তীব্র সংকটের কারণে তেল না পেয়ে ফিলিং স্টেশন ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন জেলার কৃষকরা। শনিবার রাত ৯টার দিকে শহরের মনোহর মোড়ে অবস্থিত একটি ফিলিং স্টেশনে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে ঘেরাও ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন তারা। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে প্রত্যেককে সর্বোচ্চ ৫ লিটার করে তেল সরবরাহ করা হয়। কৃষকরা জানিয়েছে, কোথাও নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম দেওয়া হচ্ছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে একেবারেই তেল মিলছে না। ফলে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং আসন্ন ফসল নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।
বৈধ কাগজপত্র ছাড়া তেল বিক্রি নয় : গাড়ির বৈধ কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া পাম্প থেকে তেল বিক্রিতে নিষেধ করেছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। পাম্প মালিকরা বলছেন, তেল নিতে আসা গাড়ির মালিক বা চালকের কাছে কাগজ চাওয়া বিব্রতকর। চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (জনসংযোগ) মো. রাসেল জানান, হেলমেট, বৈধ কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে তেল বিক্রি করতে নিষেধ করা হয়েছে পাম্প মালিকদের। এদিকে, তেল মজুদ রেখে বিক্রি বন্ধ রাখার অভিযোগে চট্টগ্রামে হাটাহাজারি উপজেলার নাজিরহাট নতুন ব্রিজসংলগ্ন লতিফ অ্যান্ড ব্রাদার্স ফিলিং স্টেশনকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানে পাম্পটির রিজার্ভারে প্রায় ছয় হাজার লিটার অকটেনের মজুদ পাওয়া যায়।
গাজীপুরে ডিজেল মজুদদারকে জরিমানা : গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ৩ হাজার লিটার ডিজেল মজুদের দায়ে আবুল হোসেন নামে এক তেল ব্যবসায়ীকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফাহিম শাহরিয়ার জানান, শনিবার রাত সাড়ে বারোটার দিকে দুই হাজার ৮৭০ লিটার ডিজেল মজুদের সত্যতা পাওয়ায় আবুল হোসেনকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া জব্দ করা তেল নায্যমূল্যে বিক্রি করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
মিয়ানমারে পাচারকালে ডিজেল-আলকাতরাসহ আটক ৭ : মিয়ানমারে পাচারের সময় ৪৮ লাখ টাকা মূল্যের ১ হাজার ৬০০ লিটার ডিজেল, ৩ হাজার ৩০০ কেজি আলকাতরা ও ৪টি ডিজেল ইঞ্জিন জব্দ করা হয়। অভিযানের সময় বোটে থাকা ৭ জন পাচারকারীকে আটক করা হয় বলে জানিয়েছে কোস্টগার্ড।
খুলনায় তেল সোনার হরিণ : খুলনা বিভাগজুড়ে পেট্রলপাম্পগুলোতে তেলের জন্য হাহাকার দেখা যাচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় অনেক পাম্পে বিক্রি বন্ধ করে ‘তেল নাই’ লেখা সাইনবোর্ড টানিয়ে রাখা হয়েছে। নগরীর পাওয়ার হাউস মোড়ের কেসিসি পেট্রোলিয়াম লিমিটেডে তেল নিতে আসা শাহ নেওয়াজ জানান, মঙ্গলবার দিন ও রাতে কোনো পাম্পে তেল পাইনি। শনিবার
সকালে বিভিন্ন পাম্পে ঘুরে শেষ পর্যন্ত একটি পাম্পে প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র ৩০০ টাকার তেল নিতে পেরেছি। এ বিষয়ে খুলনা জেলা পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির কোষাধ্যক্ষ এস এম মুরাদ হোসেন বলেন, ডিপোগুলো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। এ ছাড়া কেউ কেউ একাধিকবার তেল নেওয়ায় দ্রুত মজুদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। একজন যদি একাধিকবার তেল নেয় তাহলে অন্য গ্রাহকরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় কর্মবিরতি প্রত্যাহার : জেলহাজতে আটক শ্রমিকদের আজ সোমবারের মধ্যে মুক্তি দেওয়ার আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে ১০ ঘণ্টা পর রংপুর বিভাগীয় ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়ন অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যা ৬টার দিকে তারা কর্মবিরতি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। জ¦ালানি তেল পরিবহনের কাজে নিয়োজিত ট্যাংকলরির চালকসহ তিন শ্রমিককে ভ্রাম্যমাণ আদালত জেল-জরিমানা করেছিল। পরে রংপুর বিভাগীয় ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়ন অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করে। এদিকে, জ¦ালানি তেলের তীব্র সংকটের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন রংপুরের কাউনিয়ার যানবাহনের চালক ও সাধারণ মানুষ। উপজেলার মা সুফিয়া ফিলিং স্টেশনে অল্প পরিমাণে ডিজেল ও পাওয়া গেলেও চার দিন থেকে পেট্রল ও অকটেন একেবারেই মিলছে না।
চাঁদপুরে জ¦ালানি সংকট চরমে : জেলার কচুয়ায় সুলতানা ফিলিং স্টেশনে জ¦ালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা গেছে। গতকাল রবিবার মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে মজুদ ২ হাজার লিটার অকটেন শেষ হয়ে যাওয়ায় তেল না পেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন কয়েক শ মোটরসাইকেল চালক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অনেকে অভিযোগ করেন, ৩-৪ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তারা তেল পাননি।