প্রধানমন্ত্রীর সফর সামনে রেখে জাপানের প্রভাবশালী পত্রিকা নিক্কেই এশিয়া তার বিশেষ সাক্ষাৎকার নিয়েছে। গত ১৮ এপ্রিল সরকারি বাসভবন গণভবনে দেওয়া এ সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী দুদেশের সম্পর্কের পাশাপাশি সমকালীন বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন।
আগামী ২৫ এপ্রিল জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সফরে তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার সঙ্গে একান্ত বৈঠক করবেন। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়ন ও অংশীদারত্ব বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) গুরুত্ব পাবে তাদের আলোচনায়। জাপান ইতিমধ্যে চীনের বিআরআই মোকাবেলায় বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতিসংঘ ঘোষিত দরিদ্র ও স্বল্পোন্নত দেশগুলো উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে রপ্তানি শুল্ক অব্যাহতি পায়। স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ আর সে সুবিধা পাবে না। ফলে আমাদেরকে একটি ভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। আর তাই বিশ^বাণিজ্যে নতুন কৌশল নির্ধারণ করে বাংলাদেশকে এগোতে হবে। এ কারণে বিভিন্ন বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তি করতে চাই। বর্তমানে ১১টি দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আমাদের আলোচনা চলছে।
বেশ কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমিত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, কিন্তু কোনো দেশের সঙ্গে এফটিএ নেই। প্রধানমন্ত্রী সম্ভাব্য দেশগুলোর নাম উল্লেখ না করলেও ধারণা করা হচ্ছে, ১১টি দেশের মধ্যে ভারত, চীন ও জাপান রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, চীনের পর বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। বাংলাদেশের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও আইসিটি খাত এখন খুবই সম্ভাবনাময়। মৎস্য সম্পদেও রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা। আর বঙ্গোপসাগরের হিস্যা পাওয়ার পর নীল অর্থনীতি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করেছে।
নিক্কেইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীন চায় বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তার করতে। কিন্তু শেখ হাসিনা নিরপেক্ষ কূটনীতির প্রতি তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, কীভাবে দেশকে উন্নত করা যায়, সেটিই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। আমাদের উন্নয়নের জন্য প্রতিটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে আমরা বদ্ধ পরিকর।
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে জাপান অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ৪৪০ কোটি ডলার (৬০০ বিলিয়ন ইয়েন) সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরবর্তী সাত বছরে জাপানি ঋণ সহায়তা আরো বেড়ে ১ দশমিক ৬৫ ট্রিলিয়ন ইয়েনে পৌঁছেছে।
জাপানের সহায়তায় দেশে প্রথম মেট্রোরেল, প্রথম শিল্প পার্ক, হযরত শাহ জালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি নতুন টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করা হচ্ছে।
নিক্কেইয়ের প্রতিবেদনে জাপানের সহযোগিতার পাশাপাশি চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ ও ঋণ বেড়েছে। এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা সতর্ক রয়েছেন, এ মন্তব্য করে বলা হয়, এ কারণেই মাতারবাড়ি সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে চীনা সহায়তা না নিয়ে জাপানি সহায়তা নিয়েছেন তিনি।
নিক্কেই বলছে, জাপান তার নতুন অফিশিয়াল সিকিউরিটি অ্যাসিসটেন্স (ওএসএ) প্রোগ্রামের প্রথম বছরে বাংলাদেশকে চারটি সম্ভাব্য দেশের একটি হিসেবে পরিকল্পনায় রেখেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ জাপানের কাছ থেকে বিনা মূল্যে সামরিক সরঞ্জাম পেতে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটের কথাও তুলে ধরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যে অর্থনৈতিক সমস্যায় নেই, তা নয়। রিজার্ভ-সংকট মোকাবিলা করতে চলতি বছরের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা নিয়েছে।
নিক্কেই বলেছে, গণতন্ত্র নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে বাংলাদেশে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গত মাসে অনুষ্ঠিত গণতন্ত্র সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানায়নি যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই উদ্বেগ কিংবা কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিযোগ মানতে রাজি নন শেখ হাসিনা, বরং তিনি বলেছেন, গণতন্ত্র রক্ষা করতেই আমি এখানে আছি।
নিক্কেই বলছে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় একাধিকবার সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের নজির রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পিতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেনাবাহিনীর বিপথগামী সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে বর্তমান সরকারের আস্থা তৈরির বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, আমার সময়ে সেনাবাহিনীর যে অগ্রগতি হয়েছে, তা তারা স্বীকার করে।
নিক্কেই এশিয়ার সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশকে চাপে ফেলেছে। এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা বলেন, এটি এমন একটি বোঝা, যা আমাদের একার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। আমরা বাইরের বিশ্ব থেকে যেসব সমর্থন পেতাম, তাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। আমি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ এবং দ্রুত প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ তৈরিতে সহযোগিতার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানাই।
আমাদের সময় ডটকম