সোমবার, ০১:২৭ অপরাহ্ন, ০২ নভেম্বর ২০২৬, [bangla_date] , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

দীপের পর দিশা নতুন সমীকরণ

আব্দুল হামিদ
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার পঠিত

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কেএম তাহসিফ সাউরি হত্যা মামলায় এবার গ্রেপ্তার হলেন তার বান্ধবী জেরিকা তাসনিম দিশা। ঘটনার দিন রাতে তাহসিফের সঙ্গে তাকে উত্তরার বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে সিসিটিভি ফুটেজে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পাওয়া যোগাযোগের তথ্য এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দিশাকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করেছে তদন্তকারী সংস্থা। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় দীপ জানিয়েছে তাহসিফের সঙ্গে বান্ধবী দিশাকে নিয়ে তার মনোমালিন্য চলছিল। ঘটনার দিনও তারা একসঙ্গে ছিলেন।

গত শনিবার রাত ২টার দিকে রাজধানীর কাফরুলে নিজ বাসা থেকে দিশাকে গ্রেপ্তার করে নৌপুলিশ।

গতকাল রবিবার তাকে ঢাকার আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট রিপন হোসেন তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এর আগে এ মামলায় তাহসিফের বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে গ্রেপ্তার করা হয়। শনিবার তারও চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। ফলে তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় এখন দুই সন্দেহভাজনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে নৌপুলিশ। তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ঘটনার দিন রাতে তাহসিফ, দীপ ও দিশার একসঙ্গে অবস্থান এবং পরবর্তী সময়ে তাদের গতিবিধি।

তাহসিফের বাবা কেএম এনায়েতুল করিমের করা হত্যা মামলায় প্রথমে বন্ধুস্থানীয় ছোটভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ৩১ অক্টোবর আদালত তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে দীপের বক্তব্য এবং বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজে পাওয়া তথ্যের মধ্যে মিল-অমিল খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। এবার দিশাকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে তাহসিফের সঙ্গে দীপ ও দিশার পৃথক ও যৌথ যোগাযোগ, তাদের যাতায়াত এবং শেষ রাতে কে কোথায় ছিলেন, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সিসিটিভিতে একসঙ্গে তিনজন : পুলিশের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং উত্তরার বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে গত ২৭ অক্টোবর তাহসিফের সঙ্গে দিশার একাধিক স্থানে যাতায়াতের তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন সন্ধ্যায় তারা একাধিকবার উত্তরার সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকসে যান। পরে একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজেও তাদের একসঙ্গে দেখা যায়। রাত ১০টা ১৭ মিনিটে তাহসিফ ও দিশাকে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর দীপও সেখানে যান। পরে তিনজনকে একসঙ্গে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতে দেখা যায় রাত ১১টা ৫১ মিনিটে।

তদন্তকারীরা এখন জানতে চাইছেন, রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পর তারা আর কোথায় গিয়েছিলেন এবং কে কার সঙ্গে ছিলেন। বিশেষ করে রাত ১১টা ৫১ মিনিটের পর থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের আগ পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। এ ছাড়া দীপের দাবি পুলিশের পোশাক পরিহিত কয়েকজন তাদের ধাওয়া দেন। একটি সিসিটিভি ফুটেজে পুলিশ পোশাক পরিহিত কয়েকজনকে সেখানে দেখাও গেছে।

ফোনকলেও একাধিকবার যোগাযোগ : পুলিশের রিমান্ড আবেদনে আরও বলা হয়েছে, তাহসিফের মুঠোফোনের কললিস্ট পর্যালোচনা করে দিশার সঙ্গে একাধিকবার ফোনে কথা বলার তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনার আগে তাদের মধ্যে কী ধরনের যোগাযোগ হয়েছিল, তা যাচাই করছেন তদন্তকারীরা। এ ছাড়া আগে গ্রেপ্তার হওয়া দীপের সঙ্গে দিশার বক্তব্য মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের বক্তব্যের মধ্যে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, ঘটনার দিন কার ভূমিকা কী ছিল এবং অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কি না এসব বিষয় জানতে চান তদন্তকারীরা।

পুলিশের দাবি, প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকান্ডের সঙ্গে দীপ ও দিশার সংশ্লিষ্টতার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন।

দিশাকে ছয় কারণে রিমান্ড আবেদন : দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেন টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ফিরোজ উদ্দিন। আবেদনে ছয়টি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। যেমন তাহসিফ হত্যার মূল রহস্য ও হত্যার উদ্দেশ্য উদ্ঘাটন; হত্যাকান্ডে জড়িত অন্য অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ ও গ্রেপ্তার;  হত্যাকান্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় আলামত উদ্ধার; তাহসিফকে কোথায় হত্যা করা হয়েছে, সেই স্থান শনাক্ত করা; আগে গ্রেপ্তার হওয়া দীপের বক্তব্যের সঙ্গে দিশার বক্তব্য মিলিয়ে দেখা ও দিশার দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং ঘটনার আগে ও পরে তার ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা

যেভাবে রহস্যের সূত্রপাত : গত ২৭অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার পর দীপের ডাকে বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। রাত গভীর হলেও তিনি বাসায় না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা যোগাযোগের চেষ্টা করেন। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মেসেঞ্জারে মায়ের কাছে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠান তিনি। সেখানে বাসায় ফেরার কথা জানান। কিন্তু এরপর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।  পরের দিন ২৮ অক্টোবর বিকেলে উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে নৌপুলিশ। পরে তাহসিফের বাবা কেএম এনায়েতুল করিম অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে উত্তরখান থানায় হত্যা মামলা করেন।

পরিবারের অভিযোগ, তাদের ছেলেকে হত্যা করে মরদেহ নদে ফেলে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে দীপের আগের বক্তব্যে ধাওয়ার মুখে তাহসিফের নদে ঝাঁপ দেওয়ার বিষয়টি দাবি  করা হয়েছিল। তবে সেই বক্তব্যের সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। এবার দীপের পাশাপাশি দিশাকেও রিমান্ডে নেওয়ায় তদন্তকারীরা ঘটনার আগের ও পরের সময়ের যোগসূত্র খুঁজছেন।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাহসিফের মৃত্যুর রাতে আসলে কী ঘটেছিল? দীপ ও দিশার মধ্যে কী ধরনের যোগাযোগ ছিল? তাদের সঙ্গে অন্য কেউ যুক্ত ছিলেন কি না? দুই সন্দেহভাজনের বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, কল রেকর্ড এবং উদ্ধার হওয়া আলামত বিশ্লেষণ করে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com