গত মাসে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণার পর থেকে তাকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। তবে তেহরানের ব্যস্ততম এক মোড়ে ঝোলানো একটি বিশাল ব্যানার তার পক্ষ থেকে কঠোর বার্তার জানান দিচ্ছিল। ব্যানারে লেখা ছিল— ‘হরমুজ প্রণালী বন্ধই থাকবে।’
কিন্তু নাটকীয়ভাবে সেই ব্যানারটি এখন নামিয়ে ফেলার সময় এসেছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিতে রাজি হয়েছে ইরান। অথচ এর আগে তেহরান বারবার বলে আসছিল যে, তারা কোনো অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি মানবে না; বরং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের স্থায়ী অবসান চায়।
ইরানের এই পিছু হটা দেশটির কট্টরপন্থীদের ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। তাদের দাবি, ড্রোন ও মিসাইল হামলার মাধ্যমে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে ত্রাস সৃষ্টি এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার সক্ষমতা অর্জন করে ইরান সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। ফলে এই মুহূর্তে যুদ্ধ বন্ধ করা উচিত হয়নি।
গত মঙ্গলবার যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর তেহরান থেকে পাওয়া খবরে জানা যায়, বিক্ষুব্ধ জনতা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পতাকায় অগ্নিসংযোগ করেছে। ইরানের প্রভাবশালী আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’-এর একদল সদস্য মাঝরাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায়।
কট্টরপন্থী সংবাদপত্র ‘কায়হান’-এর সম্পাদক এক নিবন্ধে এই যুদ্ধবিরতিকে শত্রুর জন্য উপহার হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এর ফলে শত্রু পক্ষ পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করে আক্রমণ করার সুযোগ পাবে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং দেশটির সেনাপ্রধানের করা যুদ্ধবিরতির অনুরোধটি গ্রহণ করেছে ইরানের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম ‘সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’ (এসএনএসসি)। মধ্যপন্থী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বাধীন এই কাউন্সিল ঘোষণা করেছে যে, দুই সপ্তাহের জন্য হোরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকবে এবং এই সময়ে ওয়াশিংটন ও তেহরান আলোচনায় বসবে। জানা গেছে, ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরানকে এই প্রস্তাবে রাজি করাতে পর্দার আড়ালে বড় ভূমিকা রেখেছে চীন।
৪০ দিনের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইরান ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এ পর্যন্ত তিন হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের হুমকি দিয়ে আসছিলেন। ইরানের কট্টরপন্থীদের একটি অংশও বুঝতে পারছিল যে, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস হওয়ার আগেই একটি সম্মানজনক প্রস্থানের পথ খোঁজা দরকার।
এমনকি কট্টরপন্থী প্রধান বিচারপতি গোলাম হোসেইন মোহসেনি এযেই রাষ্ট্রীয় টিভিতে বলেছেন, ইরান সুবিধাজনক অবস্থানে থেকেই যুদ্ধের অবসান চায়। তার এই সুর অনেকটা মধ্যপন্থী নেতা ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফের মতোই।
সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে দেখা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার বিষয়টি। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ইসলামাবাদে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সাথে সরাসরি বৈঠকে বসবেন।
উল্লেখ্য, যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েলি হামলায় নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি আলোচনার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন। তবে তার ছেলে ও বর্তমান উত্তরসূরি মোজতবা খামেনি সেই নীতি থেকে সরে এসে সরাসরি আলোচনার অনুমতি দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এসএনএসসি এই যুদ্ধবিরতিকে ইরানের ‘বিজয়’ হিসেবে প্রচার করলেও শান্তি এখনো সুদূরপরাহত। যদি আলোচনা ব্যর্থ হয়, তবে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হতে পারে। ইরানের অভ্যন্তরে যারা বর্তমান শাসনের অবসান চান, তারা হয়তো যুদ্ধের ধারাবাহিকতা চেয়েছিলেন। তবে সাধারণ মানুষের জন্য এই যুদ্ধবিরতি মৃত্যু আর ধ্বংসের বিভীষিকা থেকে সাময়িক স্বস্তি নিয়ে এসেছে।