অন্য ভাষায় :
শুক্রবার, ১০:৫৩ পূর্বাহ্ন, ২১ জুন ২০২৪, ৭ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

‘সুখী দেশের’ মানুষেরা কি আসলেই সুখী?

নিজস্ব প্রতিবেদক:
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৩
  • ৩০ বার পঠিত

পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ কারা? ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট অনুযায়ী, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড, ইসরাইল এবং নেদারল্যান্ডসের বাসিন্দারাই সবচেয়ে সুখী মানুষ। এদিকে, কয়েক দশক ধরে ইসরাইলি সামরিক দখলের অধীনে বসবাস করা ফিলিস্তিনিদের অবস্থান তালিকায় ৯৯তম।

প্রতি বছর, জাতিসংঘ-সমর্থিত একটি সংস্থা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা ‘সুখের’ ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীর দেশগুলোর একটি তালিকা তৈরি করে। এই র‌্যাঙ্কিং প্রতিটি দেশের কয়েক হাজার অংশগ্রহণকারীর সমীক্ষার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়, যাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে তাদের জীবনকে শূন্য থেকে দশের স্কেলে রেটিং করতে বলা হয়।

এই ‘জীবন মূল্যায়ন’ বা অন্য কথায়, ওই মানুষগুলো ওই সময়ে নিজের জীবন নিয়ে কতটা সন্তুষ্ট তার সাথে অন্য কিছু তথ্য মিলিয়ে এই বার্ষিক বিশ্ব সুখী প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়।

তবে অনেকেই এই তালিকায় বিদ্যমান বৈষম্যের সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে তালিকায় সেইসব উন্নত দেশের নাগরিকদের প্রাধান্য নিয়ে আপত্তি রয়েছে, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উপনিবেশগুলোর কাছ থেকে ধন-সম্পদ সংগ্রহ করে ধনী দেশে পরিণত হয়েছে।

বিষণ্ণ কিন্তু খুশি?

২০২৩ সালের তালিকায় বেশিরভাগ ‘সুখী দেশ’ ইউরোপে। উদাহরণস্বরূপ, গত ছয় বছর ধরে ফিনল্যান্ড বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশ হিসেবে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে।

তবে ইউরোপের দেশটিতে বিষণ্ণতার ওষুধ খাওয়া মানুষের হারও সর্বোচ। তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে থাকা সুইডেন এবং দ্বিতীয় স্থানে থাকা আইসল্যান্ডের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

অন্যদিকে, সুখী দেশের তালিকায় ভারতের অবস্থান ১২৬তম। তবে কর্ম ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য বিবেচনা করা আরেকটি জরিপে দেশটির অবস্থান অনেক ওপরে। গ্লোবাল হ্যাপিনেস রিপোর্ট নামে পরিচিত আরেকটি প্রতিবেদন চীনকে বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশ হিসেবে স্থান দিয়েছে।

ধনী কিন্তু অসম?

যদিও সুখের র‍্যাঙ্কিং একটি একক প্রশ্নের উত্তরের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়, প্রকৃতপক্ষে ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে তথ্যের গভীর বিশ্লেষণ করা হয়, যা বিভিন্ন ডেটা পয়েন্টের সাহায্যে র‍্যাঙ্কিংয়ের ব্যাখ্যা করে৷ এই ডেটা পয়েন্টগুলোর মধ্যে একটি হলো মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি)।

গবেষকরা এখানে একটি সম্পর্ক লক্ষ্য করেছেন: মাথাপিছু উচ্চ জিডিপিসহ দেশগুলো প্রায়শই সুখের র‌্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ অবস্থানে থাকে। তালিকার শীর্ষ ২০টি দেশই উচ্চ অর্থনৈতিক সূচকযুক্ত পশ্চিমা দেশ, যার ফলে অনেকেই এই উপসংহারে পৌঁছেছেন যে একটি দেশের সামগ্রিক সুখ নির্ধারণের জন্য মাথাপিছু জিডিপি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।

তবে মাথাপিছু জিডিপি আয়বৈষম্য বিবেচনা করে না। একটি দেশে প্রতি বছর উৎপন্ন পণ্য ও পরিষেবার মোট মূল্যকে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে জিডিপি পাওয়া যায়। কে দেশের সম্পদ পায় এবং কে পায় না, বা কতটা সম্পদ কিছু লোকের হাতে কেন্দ্রীভূত হয় সে সম্পর্কে এটি কিছুই বলে না।

সুচকে ১৫তম অবস্থানে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আয় বৈষম্যের হার অন্য যেকোনো উন্নত দেশের তুলনায় বেশি। এটি এমন একটি দেশ যেখানে সরকারি হিসাবে প্রায় চার কোটি মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে এবং জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ দিন আনি দিন খাই অবস্থায় জীবনযাপন করে।

কার সুখ?

মার্কিন জরিপ সংস্থা গ্যালাপ-এর ওয়েবসাইট বলছে, তারা ‘দেশের বেসামরিক ও অ-প্রাতিষ্ঠানিক প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার’ তথ্য নিয়ে তাদের হ্যাপিনেস রিপোর্ট তৈরি করে।

তবে এটি কারাগার, নার্সিং হোম এবং সিনিয়র সেন্টারের মতো প্রতিষ্ঠানে বসবাসকারী লোকজনকে বিবেচনা করে না। এছাড়াও গবেষকরা অনিরাপদ বলে বিবেচিত এলাকার লোকজনের ওপর জরিপ করেন না।

এছাড়াও রয়েছে সাংস্কৃতিক পক্ষপাতের মতো সমস্যা, যা প্রায়শই সমালোচিত হয়। ২০২৩ সালের একটি সমীক্ষায় বেশ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: ‘কীভাবে এই উপসংহারে পৌঁছানো পারে যে দেশ ‘এ’-তে দেশ ‘বি’-এর চেয়ে সুস্থতা বেশি, যখন ‘এ’ দেশের লোকের কল্যাণ সম্পর্কে চিন্তা করে সেই অনুসারে সুস্থতা পরিমাপ করা হচ্ছে?’

গবেষকরা বলছেন, সুখের প্রতিবেদনের সমস্যাটি হলো, অংশগ্রহণকারীদের সুখ বা সন্তুষ্টি মূল্যায়ন করতে বলা হয় একটি পশ্চিমা, শিক্ষিত, শিল্পায়িত, ধনী এবং গণতান্ত্রিক লেন্সের ভেতর দিয়ে, যেটি অনেক বেশি ব্যক্তিবাদী।

সহজভাবে বলতে গেলে,কাউকে তার জীবনের সন্তুষ্টি নিয়ে জিজ্ঞেস করার মানে হলো তার ব্যক্তিগত অর্জনের প্রেক্ষিতে সন্তুষ্টির কথা বলা। এক্ষেত্রে অন্যদের সাথে তার সম্পর্ক এবং সামাজিক সম্প্রীতির মতো বিষয়গুলো উপেক্ষিত হয়।

একটি জরিপে দেখা গেছে, জাপান, নাইজেরিয়া এবং পোল্যান্ডে ‘সুখ’ নির্ধারণে একটি শক্তিশালী ফ্যাক্টর হলো পরিবার এবং সমবয়সীদের সাথে একজনের সম্পর্ক। বিশ্ব সুখের র‍্যাঙ্কিং কতটা ভিন্ন হতে পারে যদি মূল প্রশ্নটি হয়, ‘আপনি কি ভালোবাসেন এবং যত্ন করেন?’ অথবা ‘আপনি কি নিজেকে নিজের স্থানের উপযোগী মনে করেন?’

চুরি করা সুখ?

কীভাবে এক গোষ্ঠীর সুখ বাস্তবে অন্যের অসুখের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত হতে পারে, তা নিয়ে সুখের প্রতিবেদনে দৃষ্টিভঙ্গির অভাব রয়েছে। যুক্তরাজ্য বিশ্বের ১৭তম সুখী দেশ, তবে দেশটির সমৃদ্ধি গড়ে উঠেছে ক্যারিবিয়ান চিনির বাণিজ্যে ক্রীতদাস আফ্রিকানদের দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শোষণ এবং ভারতে লুটপাটের সাহায্যে।

বেলজিয়াম হলো ১৯তম সুখী দেশ, কিন্তু এটি তার সাবেক উপনিবেশ কঙ্গোকে অবিশ্বাস্য কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে প্রচুর সম্পদ আহরণ করেছে।

এদিকে, সুখের প্রতিবেদনে ভারত এবং ক্যারিবীয় ও আফ্রিকান দেশগুলো বেশ নিচের অবস্থানে রয়েছে।

এই বছর ইসরাইল তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে, যেখানে ফিলিস্তিনিদের অবস্থান ইসরাইলিদের ৯৫ ধাপ নিচে। ১৯৪৮ সালের আগে ও পরে ফিলিস্তিনিদের মাতৃভূমি থেকে জোরপূর্বক সরিয়ে দিয়েছে বসতি স্থাপনকারী-উপনিবেশবাদীরা। এ দিনটিকে ফিলিস্তিনিরা ‘নাকবা’ বা বিপর্যয় হিসেবে স্মরণ করে।

তারা তখন থেকে সামরিক দখলে এবং এমন একটি শাসনের অধীনে বসবাস করে আসছে, যাকে একাধিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠী ইসরাইলি সরকার দ্বারা পরিচালিত বর্ণবাদের ব্যবস্থা হিসাবে চিহ্নিত করে।

তাহলে ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টের র‌্যাঙ্কিং আসলে কী বলে? এটি কি এমন লোকদের একটি শ্রেণিবিন্যাস যারা প্রকাশ্যে ঘোষণা করে যে তারা ‘পশ্চিমা ধারণায়’ তাদের জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট? এটি কি মাথাপিছু উচ্চ জিডিপিসহ দেশগুলোর একটি র‌্যাঙ্কিং? নাকি এটি ধনী দেশগুলোর র‌্যাঙ্কিং, যারা অন্যকে শোষণ করে ধনী হয়েছে?

তথ্যসূত্র: আলজাজিরা

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com