সোমবার, ১২:৩৬ অপরাহ্ন, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, [bangla_date] , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।
শিরোনাম :
শিক্ষক থেকে রাষ্ট্রপতি গিনিতে আবর্জনার স্তূপ ধসে নিহত ৩০ ইমরান খানের সুচিকিৎসার দাবিতে সাবেক ২১ অধিনায়কের চিঠি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব বণ্টন বাংলাদেশের বিপক্ষে অক্টোবরে ম্যাচ খেলতে পারে ব্রাজিল নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার হুমকি, তেল রপ্তানি বন্ধের হুঁশিয়ারি ইরানের কলকাতায় নিরাপত্তাবিধি না মানায় ৯ গেস্টহাউস ও ৪ রেস্তোরাঁ বন্ধের নোটিশ নিউইয়র্কে রেস্তোরাঁয় গুলিতে বাংলাদেশি প্রবাসী নিহত, আহত ১ প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দিলেন জহির উদ্দিন স্বপন গৌরনদীতে নাগরিক উদ্যোগ’র মানবাধিকার সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে মতবিনিময়

শিক্ষক থেকে রাষ্ট্রপতি

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার পঠিত

মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে শিক্ষকের ভূমিকা মানবসভ্যতার ইতিহাসে চিরকালই অনন্য এক মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের ভেতর চক, ডাস্টার আর ব্ল্যাকবোর্ডের আশ্রয়ে যারা শিক্ষার্থীদের মানসজগৎ তৈরি করেন, তাদের ভাবনার পরিধি কেবল পাঠ্যপুস্তকের বাঁধাধরা সিলেবাসেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সমাজ বিনির্মাণ, নীতিদর্শন এবং সামগ্রিক জাতি গঠনের যে অদৃশ্য অথচ গভীর দায়িত্ব শিক্ষকরা পালন করেন, তা ক্ষেত্রবিশেষে ভৌগোলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমানা ছাড়িয়ে প্রবেশ করে জাতীয় রাজনীতির কঠিন ও জটিল ময়দানে। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে এমন বহু বিরল ও অনুপ্রেরণাদায়ী দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে, যেখানে রাষ্ট্র ও সরকারের সর্বোচ্চ পদে এমন সব ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব আসীন হয়েছেন, যাদের মূল পরিচয় ও পেশাগত জীবনের সূতিকাগার ছিল শ্রেণিকক্ষ। ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার এই মেলবন্ধন কীভাবে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল, তা বুঝতে হলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের এই শিক্ষক-রাষ্ট্রনায়কদের জীবন, দর্শন ও রাজনৈতিক উত্থানের দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। বিস্তারিত জানাচ্ছেন শামস বিশ্বাস

সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন

প্লেটোর দার্শনিক রাজা

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তার কালজয়ী গ্রন্থ ‘দ্য রিপাবলিক’-এ একটি আদর্শ রাষ্ট্রের রূপরেখা দিতে গিয়ে ‘দার্শনিক রাজা’র (Philosopher King) ধারণা তুলে ধরেছিলেন। প্লেটোর মতে, যিনি দর্শনের মর্ম বোঝেন এবং জাগতিক লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে সত্যের সন্ধান করেন, তিনিই রাষ্ট্রের সবচেয়ে উপযুক্ত শাসক। বিংশ শতাব্দীতে স্বাধীন ভারতে ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হওয়া যেন সেই প্রাচীন দর্শনেরই এক আধুনিক ও বাস্তব রূপায়ণ ছিল।

দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর তিরুত্তানি নামের এক অতি সাধারণ ও দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে ১৮৮৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন রাধাকৃষ্ণন। অর্থাভাব তার শৈশবকে তাড়া করলেও মেধা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি দর্শনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজ থেকে দর্শনশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর শেষ করে তিনি শিক্ষকতাকেই জীবনের একমাত্র ব্রত হিসেবে বেছে নেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজে দর্শনের জুনিয়র লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পর ১৯২১ সালে তিনি তৎকালীন ভারতবর্ষের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কিং জর্জ পঞ্চম দর্শনের অধ্যাপক’ হিসেবে মনোনীত হন।

রাধাকৃষ্ণনের পাণ্ডিত্য ও প্রাচ্য দর্শনের গভীর ব্যাখ্যা কেবল ভারতের মাটিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯৩৬ সালে তিনি যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইস্টার্ন রিলিজিয়নস অ্যান্ড এথিকস’ বিভাগের স্প্যাল্ডিং অধ্যাপক (Spalding Professor) হিসেবে নিযুক্ত হন। প্রাচ্যের বেদান্ত দর্শন এবং পাশ্চাত্যের আধুনিক চিন্তাধারার মধ্যে এক চমৎকার বুদ্ধিবৃত্তিক সেতু গড়ে তুলেছিলেন তিনি।

১৯৬২ সালে তিনি যখন স্বাধীন ভারতের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন, তখন দেশ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছিল। কিন্তু ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেও তিনি এক মুহূর্তের জন্য শিক্ষক পরিচয় ভুলে যাননি। রাষ্ট্রপতি ভবনের আড়ম্বর তার সরল জীবনযাপনকে স্পর্শ করতে পারেনি। তার রাষ্ট্রপতিত্বের সূচনালগ্নে যখন একদল ছাত্র ও অনুরাগী তার জন্মদিন মহা-আড়ম্বরে উদযাপনের অনুমতি চাইতে আসেন, তখন এই মহান শিক্ষক নির্দ্বিধায় বলেছিলেন :

“আমার জন্মদিন ব্যক্তিগতভাবে উদযাপন না করে যদি দিনটিকে সমগ্র দেশের শিক্ষকদের প্রতি উৎসর্গ করা হয় এবং ‘শিক্ষক দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়, তবে আমি সবচেয়ে বেশি গর্বিত ও সম্মানিত হব।”

সেই থেকে আজ অবধি প্রতিবছর ৫ সেপ্টেম্বর দিনটি ভারতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ‘শিক্ষক দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। রাষ্ট্রনায়ক রাধাকৃষ্ণন তার প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নৈতিক দর্শনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

রাজপথ থেকে বঙ্গভবন

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর জাতীয় সংসদের সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রধানমন্ত্রী গত ১৩ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে তাকেই বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন। তার এই মনোনয়ন ছিল দলের চরম সংকটকালে এক রাজপথের সৈনিকের প্রতি ইতিহাস ও গণমানুষের ভালোবাসার এক পরম স্বীকৃতি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে পড়ার সময় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে তার রাজনীতির হাতেখড়ি। ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনে তিনি ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি শাখার সভাপতি।

পড়াশোনা শেষে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করার পর সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন রাজনীতিবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য।

১৯৭৯ সালে তিনি তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এসএ বারির ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং ধাপে ধাপে দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসেন। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। পরে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৯ সালে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ৭৮তম বছরে দাঁড়িয়ে, তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই প্রবীণ রাজনীতিক এখন বঙ্গভবনের মানুষ।

এপিজে আবদুল কালাম

চিরকালীন শিক্ষক

বিজ্ঞান, মানবতা এবং শিক্ষকতার এক অনুপম ও বিরল সমন্বয় ছিলেন ভারতের একাদশ রাষ্ট্রপতি ড. এপিজে আবদুল কালাম। তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমের এক সাধারণ নৌকার মাঝির ঘরে জন্ম নেওয়া আবুল পাকির জয়নুল-আবেদিন আবদুল কালামের জীবন ছিল এক জীবন্ত মহাকাব্য। সংবাদপত্র বিক্রি করে যার পড়াশোনার খরচ চালাতে হয়েছিল, তিনিই পরবর্তীতে ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ISRO) এবং প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার (DRDO) নেতৃত্ব দিয়ে ভারতকে পরমাণু ও মহাকাশ প্রযুক্তির এলিট ক্লাবে প্রবেশ করান। তাকে ভূষিত করা হয় ‘মিসাইল ম্যান অব ইন্ডিয়া’ উপাধিতে।

কিন্তু এই সুবিশাল বৈজ্ঞানিক সাফল্যের চেয়েও কালামের হৃদয়ের গভীরতম টান ছিল শ্রেণিকক্ষ, গবেষণা এবং দেশের তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে ভাব বিনিময়ের প্রতি। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগেই তিনি আন্না বিশ্ববিদ্যালয়ের টেকনোলজি অ্যান্ড সোসাইটাল ট্রান্সফরমেশন বিভাগের প্রফেসর হিসেবে তরুণদের মাঝে প্রযুক্তির মানবিক ব্যবহার নিয়ে পাঠদান করতেন। ২০০২ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর রাইসিনা হিলসের রাষ্ট্রপতি ভবনটি পরিণত হয়েছিল এক উন্মুক্ত শিক্ষাঙ্গনে। প্রোটোকলের বেড়াজাল ভেঙে তিনি হাজার হাজার স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করতেন। তার মূল লক্ষ্য ছিল তরুণদের মনে আত্মবিশ্বাস ও বড় স্বপ্ন দেখার সাহস বুনে দেওয়া। ২০০৭ সালে রাষ্ট্রপতির পাঁচ বছরের সফল মেয়াদ শেষ হওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলো তাকে আরও এক মেয়াদে রাখার আগ্রহ দেখালেও তিনি সরাসরি রাজনীতি বা ক্ষমতার মোহে না জড়িয়ে আবার ফিরে যান তার প্রিয় শ্রেণিকক্ষে। রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়ার পরদিনই তিনি শিক্ষক হিসেবে কাজে যোগ দেন :

আইআইএম আহমেদাবাদ, ইন্দোর ও শিলং : নিয়মিত ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে নেতৃত্ব ও সামাজিক রূপান্তরবিষয়ক পাঠদান।

ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব স্পেস সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (IIST), তিরুবনন্তপুরম : চ্যান্সেলর ও শিক্ষক হিসেবে মহাকাশ বিজ্ঞানের গবেষণা পরিচালনা।

আন্না বিশ্ববিদ্যালয় : মহাকাশ প্রযুক্তি ও অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সক্রিয় অধ্যাপক।

মৃত্যুও তাকে শিক্ষকতার ময়দান থেকেই বরণ করে নেয়। ২০১৫ সালের ২৭ জুলাই মেঘালয়ের আইআইএম শিলংয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ‘লাইভেবল প্ল্যানেট আর্থ’ বিষয়ে ভাষণ দেওয়ার সময় ডায়াসেই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে লুটিয়ে পড়েন এবং শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বারাক ওবামা

প্রভাষক থেকে বিশ্বরাজনীতিতে

একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী বৈশ্বিক নেতা বারাক ওবামার বাগ্মিতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কাজ করেছে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ১২ বছরের শিক্ষকতার সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা।

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও ঐতিহ্যবাহী হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে আইন ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি ওবামা ছিলেন হার্ভার্ড ল রিভিউয়ের ইতিহাসের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ সভাপতি। এই অভাবনীয় সাফল্যের পর আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় বড় বড় করপোরেট আইনি প্রতিষ্ঠান থেকে লোভনীয় চাকরির প্রস্তাব পেলেও ওবামা শিকাগোতে নাগরিক অধিকার আদায়ে কাজ শুরু করেন এবং ১৯৯২ সালে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো ল স্কুলে সাংবিধানিক আইনের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।

১৯৯২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এক যুগ তিনি সেখানে লেকচারার ও সিনিয়র লেকচারার হিসেবে শিক্ষকতা করেন। তার পাঠদানের মূল বিষয়গুলো ছিল :

১. মার্কিন সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্য

২. মার্কিন গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী চতুর্দশ সংশোধনীর আলোকে নাগরিক অধিকার ও সমতা

৩. বর্ণবৈষম্যবিরোধী আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া

শিকাগোর শিক্ষার্থীদের কাছে ওবামা ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন শিক্ষক। তিনি কোনো ধরাবাঁধা মতবাদ চাপিয়ে না দিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে এবং বিপক্ষ মতের আইনি যুক্তিগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে উৎসাহিত করতেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪তম প্রেসিডেন্ট এবং প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তার প্রতিটি নীতিতে সেই আইনের অধ্যাপকের ছাপ স্পষ্ট ছিল। স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার, ইরান পরমাণু চুক্তি এবং অভিবাসননীতি প্রণয়নের সময় তার আইনি সূক্ষ্মতা ও সংবিধানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ কাজ করেছিল।

উড্রো উইলসন

উপাচার্য থেকে হোয়াইট হাউস

আমেরিকার ইতিহাসে একমাত্র পিএইচডি ডিগ্রিধারী প্রেসিডেন্ট টমাস উড্রো উইলসন ছিলেন জাত শিক্ষাবিদ। ১৮৫৬ সালে ভার্জিনিয়ায় জন্ম নেওয়া উইলসন জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডক্টরেট সম্পন্ন করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল আমেরিকার কংগ্রেসীয় সরকার ব্যবস্থা।

ব্রিন মার কলেজ ও ওয়েসলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পর ১৮৯০ সালে তিনি তার প্রিয় বিদ্যাপীঠ প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। অধ্যাপনা চলাকালীন তার রচিত পাঠ্যবইগুলো মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞান চর্চায় নতুন যুগের সূচনা করে।

১৯০২ সালে তিনি সর্বসম্মতিক্রমে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি (প্রেসিডেন্ট/উপাচার্য) নির্বাচিত হন। ১৯১০ সাল পর্যন্ত টানা আট বছর বিশ্ববিদ্যালয়টির নেতৃত্ব দিয়ে তিনি এর শিক্ষাব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। ঐতিহ্যবাহী মুখস্থনির্ভর লেকচার পদ্ধতির পরিবর্তে তিনি প্রবর্তন করেন ছোট ছোট গ্রুপে শিক্ষার্থীদের সরাসরি অধ্যাপকদের সঙ্গে বিতর্ক ও আলোচনার ‘টিউটোরিয়াল সিস্টেম’।

বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার এই প্রশাসনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতাই তাকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। নিউ জার্সির গভর্নর নির্বাচিত হওয়ার পর ১৯১২ সালে তিনি ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৮তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি এমন এক সময়ে দায়িত্ব নেন যখন সমগ্র বিশ্ব প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ আগুনে রূপ নিচ্ছিল।

যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে উইলসনের শিক্ষকসুলভ ও তাত্ত্বিক মনস্তত্ত্ব সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে :

চৌদ্দ দফা নীতি (Fourteen Points) : বিশ্বশান্তি নিশ্চিত করতে এবং উপনিবেশবাদের অবসানে তিনি ১৯১৮ সালে মার্কিন কংগ্রেসে তার বিখ্যাত ১৪ দফা রূপরেখা ঘোষণা করেন।

লীগ অব নেশনসের ভিত্তি : আধুনিক জাতিসংঘের পূর্বসূরি ‘লীগ অব নেশনস’ (জাতিসংঘের আদি রূপ) প্রতিষ্ঠার মূল রূপকার ছিলেন উইলসন। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নৈতিকতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার এই তাত্ত্বিক রূপায়ণের জন্য তাকে ১৯১৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

প্রণব মুখোপাধ্যায়

রাজনীতির মহীরুহ

পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার কীর্ণাহার গ্রামের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান প্রণব মুখোপাধ্যায় কীভাবে ভারতের রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং পরবর্তীতে ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি হলেন, তার নেপথ্যে ছিল এক গভীর প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং পরবর্তীতে আইনের ডিগ্রি অর্জনের পর প্রণব মুখোপাধ্যায় ১৯৬৩ সালে কলকাতার অদূরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিদ্যাসুন্দর কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক (তৎকালীন লেকচারার) হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন। একই সঙ্গে তিনি কিছুকাল সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

শ্রেণিকক্ষে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জটিল কাঠামো, সংবিধানের ধারা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের যে পাঠ তিনি ছাত্রদের দিতেন, সেই গভীর তাত্ত্বিক জ্ঞানই পরবর্তীকালে রাজনীতির মাঠে তার সবচেয়ে বড় অস্ত্রে পরিণত হয়। ১৯৬৯ সালে ইন্দিরা গান্ধীর হাত ধরে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করার পর পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি অর্থ, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্রের মতো ভারতের সবকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে সামলেছেন।

রাজনীতিতে তিনি পরিচিত ছিলেন এক জীবন্ত ‘সংবিধান ও তথ্যের এনসাইক্লোপিডিয়া’ হিসেবে। যেকোনো জটিল জাতীয় সংকটে তার শিক্ষকসুলভ প্রজ্ঞা ও তথ্যনিষ্ঠ যুক্তির কাছে প্রতিপক্ষ দলগুলোও নতি স্বীকার করত। ২০১২ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর শিক্ষক দিবসে তিনি দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনের ভেতরের রাজেন্দ্র প্রসাদ সর্বোদয় বিদ্যালয়ের ১১শ ও ১২শ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়মিত সংবিধান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্লাস নিতেন। রাষ্ট্রপতি হয়েও দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সরাসরি পাঠদানের এই দৃশ্য বিরল।

পেদ্রো কাস্তিলো

আন্দিজ পর্বতের সাধারণ শিক্ষক

সমকালীন বৈশ্বিক রাজনীতিতে পেদ্রো কাস্তিলোর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া ছিল এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক রূপকথা। পেরুর আন্দিজ পর্বতমালার চরম দরিদ্র এলাকা চোটায় জন্মগ্রহণ করা কাস্তিলো ছিলেন এক কৃষক পরিবারের সন্তান। নিজের চেষ্টায় শিক্ষকতার ডিগ্রি নিয়ে তিনি নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘ ২৫ বছর শিক্ষকতা করেন।

কাস্তিলো এমন এক অঞ্চলে শিক্ষকতা করতেন, যেখানে স্কুলে যাওয়ার মতো পাকা রাস্তা ছিল না, বিদ্যুৎ ছিল না, এমনকি শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত দুপুরের খাবারের ব্যবস্থাও ছিল না। শ্রেণিকক্ষে শিশুদের প্রতিদিনের অভাব ও বঞ্চনা দেখতে দেখতে কাস্তিলো শিক্ষকদের অধিকার এবং গ্রামীণ শিক্ষার উন্নয়নে দেশব্যাপী শিক্ষক ইউনিয়ন গড়ে তোলেন।

২০১৭ সালে তার নেতৃত্বে পেরুর ইতিহাসের বৃহত্তম জাতীয় শিক্ষক ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানী লিমার রাজপথে নেমে আসা হাজার হাজার শিক্ষকের দাবি আদায়ে কাস্তিলোর দৃঢ় নেতৃত্ব তাকে জাতীয় নায়কে পরিণত করে। ২০২১ সালের নির্বাচনে কোনো বড় করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই তিনি ‘ফ্রি পেরু’ দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার নির্বাচনী প্রতীক ছিল একটি বিশাল আকারের কাঠের ‘পেন্সিল’। তিনি স্লোগান তুলেছিলেনÑ ‘ধনী দেশে আর কোনো দরিদ্র মানুষ থাকবে না’; এবং পেরুর দীর্ঘদিনের কোটিপতি ও অভিজাত রাজনীতিকদের পরাজিত করে তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

আফ্রিকান জাতীয়তাবাদ, সংস্কৃতি ও মাটির টান : আফ্রিকা মহাদেশের উপনিবেশবিরোধী মুক্তিসংগ্রাম এবং স্বাধীনতা-উত্তর জাতি গঠনের কঠিন প্রক্রিয়ায় শিক্ষকদের ভূমিকা ছিল অনন্য। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ভাঙতে গিয়ে যে বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের প্রয়োজন হয়েছিল, তার পুরোভাগে ছিলেন স্থানীয় শিক্ষকরা। তারা শ্রেণিকক্ষে জাতীয় চেতনার বীজ বুনেছিলেন এবং পরবর্তীকালে দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন।

কায়েস সাইদ

প্রাসাদে সংবিধানের অধ্যাপক

২০১৯ সালে আরব বসন্তের সূতিকাগার তিউনিশিয়ায় সংঘটিত হয় আধুনিক গণতন্ত্রের এক অনন্য ঘটনা। কোনো চিরাচরিত রাজনৈতিক দল, করপোরেট ফান্ডের প্রাচুর্য কিংবা বড় বড় ব্যানার-ফেস্টুন ছাড়াই কেবল একজন সাবেক আইন অধ্যাপক সাধারণ মানুষের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি হলেন কায়েস সাইদ।

তিউনিস বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনুষদে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবিধানিক আইনের অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেছিলেন কায়েস সাইদ। সারাজীবন সাদামাটা জীবন যাপন করা এই অধ্যাপক তার শিক্ষার্থীদের কাছে ছিলেন অত্যন্ত নীতিবান ও আপসহীন।

তিউনিশিয়ার দুর্নীতিগ্রস্ত ও সুবিধাবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে দেশের তরুণ প্রজন্ম ও তার সাবেক শিক্ষার্থীরা সোশ্যাল মিডিয়া এবং পাড়া-মহল্লায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার পক্ষে প্রচারণা চালান। কফি শপে বসে মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তিনি যে আস্থা অর্জন করেন, তা তাকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করে প্রেসিডেন্টের মসনদে বসায়। একজন শিক্ষকের সততা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দিতে পারে, সাইদের উত্থান তারই প্রমাণ।

লেপোল্ড সেদার সেংঘর

কবি থেকে সেনেগালের স্থপতি

সেনেগালের প্রথম প্রেসিডেন্ট লেপোল্ড সেদার সেংঘর ছিলেন একাধারে বিশ্ববরেণ্য কবি, সাহিত্যিক, তাত্ত্বিক এবং পেশাদার শিক্ষক। প্যারিসের বিখ্যাত সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফরাসি সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা শেষ করে তিনিই ছিলেন প্রথম কোনো আফ্রিকান নাগরিক, যিনি ফরাসি ব্যাকরণ ও ভাষার সর্বোচ্চ শিক্ষকতার ডিগ্রি ‘আগ্রেগাসিওঁ’ অর্জন করেন। ফ্রান্সের বিভিন্ন খ্যাতনামা উচ্চ বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি দীর্ঘকাল ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপনা করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি আফ্রিকান সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় পুনর্জাগরণের বিখ্যাত বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন নেগ্রিচিউড এর অন্যতম পুরোধা ছিলেন।

১৯৬০ সালে সেনেগাল স্বাধীন হলে সেংঘর দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং টানা বিশ বছর অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করেন। রাষ্ট্রপ্রধানের গুরুতর দায়িত্ব পালনের ফাঁকেও তিনি কবিতার বই লিখতেন। তিনিই প্রথম আফ্রিকান যিনি ফরাসি সাহিত্যের সর্বোচ্চ সম্মানজনক প্রতিষ্ঠান ‘একাডেমি ফ্রঁসেজ’-এর সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ক্ষমতার লোভ ত্যাগ করে ১৯৮০ সালে তিনি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করে আবারও সাহিত্যচর্চা ও লেখালেখিতে ফিরে যান।

খাতামি ও আহমাদিনেজাদ

ইরানি নেতৃত্বের একাডেমিক ভিত্তি

ইরানের আধুনিক রাজনীতিতে ইসলামী ধর্মতত্ত্বের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অধ্যাপনার এক দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। সাবেক সংস্কারবাদী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি ছিলেন দর্শনের অধ্যাপক, যার মেয়াদে ‘সভ্যতার সংলাপ’ (Dialogue Among Civilizations) তত্ত্ব আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়।

অন্যদিকে, সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ইরানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (IUST) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। এমনকি দেশটির প্রয়াত প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রইসিও বিচার বিভাগীয় দায়িত্বের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় তেহরানের ইমাম সাদেক বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে আইনের অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেছেন।

জুলিয়াস নায়ারারে

গোটা জাতির শ্রদ্ধেয় মুয়ালিমু

তানজানিয়ার জাতির জনক ও প্রথম প্রেসিডেন্ট জুলিয়াস কাম্বারাগে নায়ারারের নাম আফ্রিকার রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরভাস্বর। ১৯২২ সালে তাঙ্গানিকার এক সাধারণ উপজাতিপ্রধানের পরিবারে জন্ম নেওয়া নায়ারারে ছিলেন প্রখর মেধার অধিকারী। উগান্ডার মাকেরেরে কলেজ থেকে শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি তৎকালীন তাঙ্গানিকার সেন্ট ফ্রান্সিস কলেজে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনকারী প্রথম তাঙ্গানিকান নাগরিক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

বিলেত থেকে ফিরে এসে তিনি আবারও সেন্ট ফ্রান্সিস কলেজে শিক্ষকতায় ফিরে যান। কিন্তু পরাধীন দেশের মুক্তির তাড়নায় তিনি বেশিদিন শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ থাকতে পারেননি। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাকে রাজনীতি ও শিক্ষকতার মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার চূড়ান্ত সময়সীমা দিলে তিনি নির্দ্বিধায় দেশমাতৃকার মুক্তির স্বার্থে শিক্ষকতার চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন এবং গঠিত হয় তার নেতৃত্বে ‘তাঙ্গানিকা আফ্রিকান ন্যাশনাল ইউনিয়ন’ (TANU)। ১৯৬১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর তিনি দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং পরবর্তীকালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতার চূড়ায় পৌঁছলেও দেশের মানুষ তাকে কোনো সামরিক বা রাষ্ট্রীয় গালভরা উপাধিতে ডাকত না; পুরো জাতি তাকে ভালোবেসে ডাকত ‘মুয়ালিমু’Ñ সোয়াহিলি ভাষায় যার অর্থ ‘শিক্ষক’। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নায়ারারের গৃহীত নীতিগুলোর মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল শ্রেণিকক্ষের মানবিক দর্শণ।

উপজাতিভিত্তিক রক্তক্ষয়ী সংঘাত দূর করতে তিন একটি একক ভাষার মাধ্যমে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেন।

১৯৮৫ সালে তিনি স্বেচ্ছায় ক্ষমতা থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিজ গ্রামে কৃষকের মতো জীবন যাপন করে গেছেন।

দিমিত্রি মেদভেদেভ

সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে ক্রেমলিনে

রাশিয়ার আধুনিক ক্ষমতার ভারসাম্য ও ক্রেমলিনের নীতিনির্ধারণে দিমিত্রি মেদভেদেভ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক নাম। ভ¬াদিমির পুতিনের দীর্ঘদিনের এই রাজনৈতিক সহযোগীর ক্যারিয়ারের সূচনা হয়েছিল খাঁটি আইনের শিক্ষক হিসেবে।

সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৯০ সালে আইনে ডক্টরেট (ক্যান্ডিডেট অব সায়েন্স) ডিগ্রি লাভের পর তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ানি আইন বিভাগে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ বছর সহকারী অধ্যাপক ও লেকচারার হিসেবে শিক্ষকতা করেন। সিভিল ও রোমান আইনের জটিল ধারাগুলো পড়ানোর পাশাপাশি তিনি দেওয়ানি আইনের একটি প্রামাণ্য পাঠ্যপুস্তকের সহলেখকও ছিলেন।

১৯৯৯ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গের তৎকালীন নগর প্রশাসনের কাজে যুক্ত হয়ে তিনি সরাসরি জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং পরে ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। মেদভেদেভ প্রমাণ করেন যে, একাডেমিক আইনের নিখুঁত অনুশাসনকে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির কঠিন দাবা খেলায় কীভাবে রূপান্তর করা সম্ভব।

সারমিয়ন্তো, কার্দোসো ও কাস্তিলো ল্যাতিনের তিন কীর্তিমান শিক্ষক

ডমিঙ্গো ফাউস্টিনো সারমিয়েন্তো, ছিলেন গ্রামীণ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সেখান থেকে হয়েছেন আর্জেন্টিনা প্রেসিডেন্ট। তিনি আর্জেন্টিনার শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও ‘শিক্ষক-প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে পরিচিতি।

ফার্নান্দো হেনরিক কার্দোসো, ছিলেন সাও পাওলো ও প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। সেখান থেকে হয়েছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট। তিনি সমাজবিজ্ঞানের গভীর জ্ঞান কাজে লাগিয়ে ব্রাজিলের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন করেছেন।

শ্রেণিকক্ষের মূল্যবোধ ও রাজনীতি

শিক্ষকতা থেকে রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার এই দীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে কিছু মৌলিক সত্য উন্মোচিত হয়

দূরদর্শী পরিকল্পনা ও ধৈর্য : শিক্ষকের বৈশিষ্ট্য হলো তাৎক্ষণিক ফলাফলের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রজন্ম তৈরির ধৈর্য রাখা। রাষ্ট্র পরিচালনায় উড্রো উইলসন, জুলিয়াস নায়ারারে মতো নেতারা সেই দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।

যোগাযোগের অসাধারণ দক্ষতা : শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের বোঝানোর নিয়মিত চর্চা রাজনীতির জটিল মঞ্চে সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ স্থাপনে সাহায্য করে। বারাক ওবামার বাগ্মিতা কিংবা পেদ্রো কাস্তিলোর তৃণমূলকে জাগিয়ে তোলার পেছনে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা কাজ করেছে।

নৈতিকতার মানদণ্ড : ড. কালাম কিংবা ড. রাধাকৃষ্ণনের মতো রাষ্ট্রপ্রধানরা দেখিয়েছেন যে, ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে গিয়েও কীভাবে নির্মোহ ও সৎ থাকা যায়। তবে এই যাত্রা সব সময় কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। রাজনীতির কূটকৌশল, আমলাতন্ত্র ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক দ্বন্দ্বের বাস্তবতায় অনেক সময় তাত্ত্বিক শিক্ষাবিদরা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। পেরুর পেদ্রো কাস্তিলোর রাজনৈতিক টানাপড়েন তার একটি বাস্তব উদাহরণ।

শেষ কথা

চক ও ডাস্টারের ধূলিময় শ্রেণিকক্ষ আর রাষ্ট্রপতির সুরম্য প্রাসাদের মধ্যে ভৌগোলিক ও ক্ষমতার দূরত্ব আকাশপাতাল হলেও এই ব্যক্তিত্বরা দেখিয়েছেন যে আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে জ্ঞানে। একজন শিক্ষক যখন রাষ্ট্রপ্রধান হন, তখন রাষ্ট্র কেবল একজন প্রশাসক পায় না; রাষ্ট্র পায় এমন একজন অভিভাবক, যিনি জানেন সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো জ্ঞান ও মানবিক মূল্যবোধ। ইতিহাসের পাতায় তাদের এই পদচিহ্ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার এক চিরন্তন উৎস হয়ে থাকবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com